দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় ৯০ হাজার বন্দির মধ্যে প্রতি তিনজনের একজন মাদকদ্রব্য-সংক্রান্ত মামলার আসামি। তাদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ।
দেশের কারাগারগুলোর বন্দি ধারণক্ষমতা অনেক আগেই পার হয়েছে। গত রবিবার পর্যন্ত দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দির সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ৫৯২। কারা অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই বিপুলসংখ্যক বন্দির একটি বড় অংশ বিচারাধীন মামলার আসামি।
এই ৮৯ হাজার ৫৯২ জন বন্দির মধ্যে ৩১ হাজার ১৫০ জন মাদক-সংক্রান্ত মামলার আসামি। অর্থাৎ কারাবন্দিদের ৩৫ শতাংশ মাদকের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে জড়িত।
কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজনস) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, মাদক মামলার বন্দিদের নিয়ে অনেক ঝমেলা পোহাতে হচ্ছে।
আমরা দুটি স্পেশাল কারাগারকে এক ধরনের নিরাময় কেন্দ্রের মতো করে গড়ে তুলছি। এই কারাগারে শুধু মাদকসেবী আসামিদের রাখা হবে। তাদের সুস্থ করে তোলাও আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
কারা সূত্র জানায়, মাদকসেবী বন্দিরা কারাগারে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। কারো কোনো কথা তারা শুনতে চায় না। এমনকি অনেকে মাদক না পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। এর মধ্যে অন্তত দুজন অসুস্থ হয়ে মারাও গেছে। তাদের অনেকে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেতে কারারক্ষীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তারা চিৎকার করে কারাগারের পরিবেশ নষ্ট করে এবং অন্য মামলার আসামিদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি, উন্নয়ন ও গণমাধ্যম) মো. জান্নাত-উল ফরহাদ জানান, কারাগারে মাদক-সংক্রান্ত মামলার আসামি ৩৫ শতাংশ।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বর্তমানে ১১ হাজার ৫০০ জন বন্দি রয়েছে। তাদের মধ্যে মাদক মামলার আসামি চার হাজারের বেশি। চট্টগ্রামের কারাগারে ছয় হাজার ৫০০ বন্দির মধ্যে দুই হাজারের বেশি মাদক মামলার আসামি। কাশিমপুর মহিলা কারাগারে ৬৫০ জন বন্দির মধ্যেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাদক মামলার আসামি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা এখন ব্যাপক বেড়েছে। মাদক দ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা মানস-এর গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই-তিন বছর আগেও দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা ছিল ৫০ থেকে ৬০ লাখ। সাম্প্রতিক সময়ে এই সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে এক কোটি ছাড়িয়েছে। এর বেশির ভাগই তরুণ-তরুণী। অর্থাৎ দেশের শ্রমশক্তি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই সর্বনাশা নেশার শিকার।
মানস-এর প্রতিষ্ঠাতা ডা. অরূপ রতন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় থেকে মাদক সেবনের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। ওই সময় থেকেই মূলত অনলাইনে মাদক কেনাবেচা ও সরবরাহের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। বর্তমানে মাদক সংগ্রহ করা এতটাই সহজ হয়ে গেছে, যে কেউ চাইলেই বিভিন্ন উৎস থেকে নেশার দ্রব্য হাতে পাচ্ছে। এটি কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যর্থতা নয়; বরং একটি সামাজিক বিপর্যয়।’
পুলিশ সদর দপ্তরের বার্ষিক ও মাসিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে মাদকের ভয়াবহতার এক স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা দেশে এক লাখ ৮১ হাজার ৬৯৭টি অপরাধের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মাদক-সংক্রান্ত মামলাই ৫২ হাজার ৬২৬টি। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ওই এক বছরে দেশে মোট এক লাখ ৭২ হাজার পাঁচটি অপরাধের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মাদক-সংক্রান্ত মামলা ৫২ হাজার ৭১৭টি। অর্থাৎ বছরের মোট মামলার প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল মাদক-সংক্রান্ত। ওই বছর নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছিল ১৭ হাজার ৫৭১টি এবং খুনের মামলা হয়েছিল তিন হাজার ৪৩২টি।
চলতি বছর মে মাসের মাসিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাত্র এক মাসেই সারা দেশে ১৮ হাজার ১৪৯টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে রেকর্ড পরিমাণ সাত হাজার ৯২টি মামলা হয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে বড় প্রতিবন্ধকতা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) সক্ষমতার অভাব। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ সরাসরি মাদকাসক্ত। সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের (যেমন ইয়াবা, আইস) সহজলভ্যতাই এই সংখ্যা বাড়ার মূল কারণ।’
তিনি বলেন, মাদক কারবারিরা এখন অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে, অথচ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে কোনো অস্ত্র নেই। ফলে তাদের অবস্থা এখন ‘ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার’-এর মতো। এই সংকট কাটাতে কর্মকর্তাদের অস্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। পাশাপাশি মাদকদ্যব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত সংসদে উত্থাপন করা হতে পারে।
মাদকবিরোধী অভিযান চলমান থাকলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, দেশে মাদকসংক্রান্ত প্রায় ৮০ হাজার মামলা বিচারাধীন থাকায় বিচারপ্রক্রিয়ায় জট লেগেছে। তিনি বলেন, এই জট কমাতে মাদক মামলার জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।