Image description

তার বয়স ১৬। পড়ে নবম শ্রেণিতে। ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলে। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক সব মিলিয়ে তার ফলোয়ারের সংখ্যা ৫৫ লাখ! সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও আপলোড করা শুরু করেছিল তখন তার বয়স ৯ বছর। ভাবা যায় এতটুকুন একটা মেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে ইংরেজির শিক্ষক হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করেছে! তার আপলোড করা ভিডিও’র অধিকাংশই ইংরেজি বলা ও শেখা নিয়ে। এত অর্জন যার সে হলো চট্টগ্রামের লাভলেইনের আবেদীন কলোনির বাসিন্দা উম্মে মাইসুন।

এই পাড়াটি এমনিতেই জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর বেড়ে ওঠার কারণে বিখ্যাত। এখন খুদে ইংরেজি শিক্ষক মাইসুনেও আলোকিত এ কলোনি।

মাইসুনের সঙ্গে যোগ দিয়েছে তার ছোট ভাই জুবরান। তাও তিনবছর আগে যখন তার বয়স চার। এখন ভাই-বোনের যুগল উপস্থাপনা চলে সমানে। নিজেদের আগ্রহ প্রবল। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে বাবা প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের হেড অব নিউজ আশরাফ উল্লাহ রুবেল ও গৃহিনী মা উম্মে সালমার প্রেরণা ও উৎসাহ।

লাখ লাখ ফলোয়ার, কোটি কোটি ভিউ এসবই শেষ কথা নয়। পরিচিতি, নাম, যশ, খ্যাতি সঙ্গে অর্থেরও যোগান। এ খাত থেকে আয়ের ব্যাপারে কথা বলতে চায় না। বলতে লজ্জাও পায়। শোনা যাক মাইসুনের মুখে এবার তার নিজের গল্প।

‘একবার একটি মেলায় গেলাম চট্টগ্রামে। অনেক মানুষের ভিড়। আমার মাথায় হিজাব, মুখে মাস্ক, চোখে কালো চশমা। হঠাৎ চোখ থেকে চশমা খুলতেই একজন জানতে চাইলেন, আপনি মাইসুন না! আমি অবাক হলাম। চোখ দেখেই তিনি আমাকে চিনে ফেললেন। পরে বললেন, তারা নিয়মিত আমার ভিডিও দেখেন। এই ধরনের ঘটনা অনেক ঘটে। যেখানে যাই, কেউ না কেউ চিনে ফেলেন। সেলফি তোলেন, অটোগ্রাফ নেন। ভালোই লাগে।’

উম্মে মাইসুন কতটা পরিচিত ও জনপ্রিয় তা তার ওপরের কথা থেকে বোঝা যায়। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্ট্রগ্রাম, টিকটকে মাইসুন ছোট ও বড়দের ইংরেজির শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। তার ইংরেজির বিভিন্ন ভিডিও আপলোড করলেই মুহুর্তেই ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে সব মাধ্যম মিলিয়ে তার ফলোয়ার সংখ্যা ৫৫ লাখ। শুধু ফেসবুকে ফলোয়ার ৩৭ লাখ।

বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বিদ্যালয়ের (বাওয়া) ছাত্রী মাইসুনের এই পথচলার শুরু একেবারে শিশু বয়স থেকে। বাংলা ভাষাভাষিদের ‘ইংরেজিভীতি’ বহুদিনের। ছোটবেলা থেকে সে ভয় মাইসুনের নেই। এই কিশোরী সে ভয়কে জয় করেছে আপন চেষ্টায়।

মাইসুন তার ভিডিওর মাধ্যমে সবার এই ভীতি দূর করতে ৯ বছর বয়সে কাজ শুরু করে। ২০১৯ সালে তার প্রথম ইংরেজির ভিডিও আপলোড করা হয় সামাজিক মাধ্যমে। এরপর কোভিড-১৯ এর সময় তা ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

শুরুর গল্পটা শোনা যাক মাইসুনের মুখে। ‘আমি ছোটবেলায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে কথা বলতাম। আমার দুই কাজিন ইংল্যান্ডে থাকে। তারা এলে তাদের সঙ্গে টুকটাক ইংরেজি বলতাম। বিষয়টা বাবা খেয়াল করেছেন। পরে তিনি আমাকে নানা বই এনে দেন। তারপর খাওয়ার সময় কার্টুন দেখতে দিতেন মা। এভাবে একসময় আমি যেসব শব্দ বলি তা নিয়ে ছোট ছোট ভিডিও তৈরি করি।’
সে নিজেকে তৈরি করার জন্য নানা বই পড়েছে। কার্টুন দেখেছে। কার্টুনের মধ্যে ছিল ‘বেন অ্যান্ড হোলি’ আর ‘পেপাপিগ’। এছাড়াও ছোটবেলা থেকে ‘হ্যারি পটার’সহ নানা ইংরেজি বই পড়ে নিজেকে সাবলীল করেছেন নিজে নিজে। কোভিড-১৯ এর সময় স্কুল বন্ধ। বাবা আশরাফ উল্লাহ রুবেল গণমাধ্যমকর্মী। তারও হোম অফিস শুরু। ওই সময় ঘরে বসে মাইসুনের করা একটা ভিডিও হঠাৎ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

মাইসুন বলে, ‘ঘরে বসে বারবিডল নিয়ে একটা ভিডিও তৈরি করি। আমি ভেবেছি যেহেতু বাচ্চারা পুতুল পছন্দ করে, তাই পুতুল নিয়ে ভিডিও তৈরি করলে তা সবার জন্য অনেক সহজ হবে। ইউটিইউবের ওই ভিডিও আইমান সাদিকসহ অনেকের চোখে পড়ে।’

তার পেজের নাম ‘মাইসুনস ওয়ার্ল্ড’। মানুষের নিত্য ব্যবহার্য ইংরেজি যেমন কোথাও বেড়াতে গেলে, খেতে গেলে, মেলায় গেলে, বাজারে জিনিসপত্রের দরদাম, বন্ধু বা অতিথিদের সঙ্গে সম্ভাষণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে ভিডিও তৈরি করে সে। শুধু নিজে নয়, তার ছোট ভাই জুবরানও কয়েকবছর আগে থেকে যোগ দিয়েছে তার সঙ্গে ভিডিওতে।

‘জুবরানস ওয়ার্ল্ড’ নামে নিজস্ব একটা পেজ ও ইউটিউব রয়েছে। প্রথম শ্রেণির ছাত্র জুবরানের ফলোয়ারও ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। তাকে যুক্ত করার ঘটনা বেশ মজার। বাবা আশরাফ উল্লাহ বললেন, ‘যখন মাইসুনের ভিডিও করতাম তখন জুবরান খুব দুষ্টুমি করতো। সে কারণে জুবরান রাতে ঘুমিয়ে পড়লে ভিডিও রেকর্ড করতাম। দিনে করতে গেলেই জুবরানের কারণে সম্ভব হতো না। একসময় আমি আর মাইসুন সিদ্ধান্ত নিলাম জুবরানকেও ভিডিওতে রাখি। এভাবে ৪ বছর বয়সে জুবরানের ভিডিও তৈরি করা শুরু।’

ভাইবোনের খুনসুটি কিংবা মজার মজার ইংরেজি শব্দের বাংলা অর্থ ও বাক্য নিয়ে করা ভিডিও বেশ সমাদৃত সামাজিক মাধ্যমে। জুবরানের ‘পা নাড়ানো ইংরেজি কি’ নামে একটি ভিডিও দেখেছে ৬ কোটি বার। মাইসুনের ‘ইংরেজিতে কথা বলার শুরুর ৩৮টি বাক্য’ শিরোনামের ভিডিওটি ফেসবুকে দেখেছে ৩ কোটি ২০ লাখ আর ইউটিউবে দেখেছে ১ কোটি ২০ লাখ। শেয়ার হয়েছে ২ লাখ ৩৮ হাজার। মাসে গড়ে ইউটিউব ও সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রায় ৩ কোটিবার ভিউ হয় তার ভিডিও।

কয়েকবছর আগে রবি টেন মিনিটস স্কুলের সঙ্গে কাজ করেছিল মাইসুন। তখন সে ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে কনিষ্ঠ অনলাইন শিক্ষক। তার ঝুলিতে রয়েছে অনেক স্বীকৃতিও। ২০২৩ সালে মার্ভেল অ্যাওয়ার্ড পায় ইন্সপায়ারিং চিলড্রেন হিসেবে। এ ছাড়া সে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেডএক্স অনুষ্ঠানে বক্তা হিসেবে অংশগ্রহণ করে।

বিভিন্ন সামাজিক কাজের সঙ্গেও এই বয়সে নিজেকে জড়িয়েছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের গড়া অনগ্রসর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এক টাকার শিক্ষা প্রোগ্রামে মাইসুন নানাভাবে সহযোগিতা করে। সে এই প্রোগ্রামের শুভেচ্ছা দূত। অ্যাওয়ারনেস ৩৬০ নামের একটি বৈশ্বিক সংগঠনের সহায়তায় সে কিশোরীদের মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতন করার জন্য একটি সামাজিক সচেতনতা প্রকল্প পরিচালনা করছে। সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ৭৬টি দেশের ২১৬ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে মাইসুন অ্যাওয়ারনেস ৩৬০-এর ‘ফেলো অব দ্য ইয়ার’ সম্মাননা অর্জন করে।

তার লেখা ‘ছোটদের স্পোকেন ইংলিশ’-এর চারটি বই বের হয়েছে। আদর্শ থেকে বের হওয়া এই বইয়ের প্রথম সংখ্যা চলেছে ১০ হাজার কপি। এ ছাড়া ইংরেজিতে দুটি উপন্যাসও লিখেছে মাইসুন। মাত্র ১১ বছর বয়সে মাইসুনের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য এমারেলেন্ড স্টোন’ প্রকাশিত হয়। ১৩ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় থ্রিলার উপন্যাস ‘আনওয়ান্টেড রিভেঞ্জ’। প্রথমটি বিক্রি হয়েছে চার হাজার কপি।

এত জনপ্রিয়তার পরও মাইসুনের পা মাটিতেই আছে। সে বলে, ‘বাবা ও মায়ের (মা উম্মে সালমা) যথেষ্ট সহযোগিতা পাই সব কাজে। আমি পড়ালেখা করে বড় হতে চাই। পাশাপাশি সামাজিক নানা কাজে সম্পৃক্ত রাখব নিজেকে। ইংরেজি শিক্ষার জন্য ভিডিও তৈরি করে যাবো। তা মানুষের কাজে লাগলে ভালো লাগবে।’

মাইসুনের মতে ইংরেজিতে কথা বলা এবং লেখায় কোনো ভয় পেলে চলবে না। বাংলা যেভাবে শিখেছে সেভাবে ইংরেজিও শেখা যায়। মাইসুন বলে, ‘গ্রামারের চিন্তা মাথা থেকে প্রথমে বাদ দিতে হবে। বাংলা শব্দ যেভাবে শিখেছি সেভাবে দৈনন্দিন কাজের ছোট ছোট ইংরেজি শব্দ বলতে বলতে কথা শেখা হয়ে যাবে।’