তীব্র গরম আর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির কারণে দেশজুড়ে চলছে ঘন ঘন লোডশেডিং। তবে জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কমলেও বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল এবং মফস্বল জেলাগুলোতে দিনে-রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে বিঘ্নিত হচ্ছে স্বাভাবিক জনজীবন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। অসহ্য গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন।
বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীলরা বলছেন, গরম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়েনি। উল্টো বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি আরও বেড়েছে। এর প্রায় পুরো চাপ পড়ছে গ্রামাঞ্চলে। কোনও কোনও এলাকায় দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা, কোথাও আরও বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। টিভিতে ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দেখতে না পেরে ক্ষুব্ধ হচ্ছেন অনেকে।
বুধবার (২৪ জুন) সকাল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কম ছিল। তবে গ্রামাঞ্চলে সাত-আট ঘণ্টার বেশি লোডশেডিং ছিল। সেখানে একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় ভোগান্তি বেড়েছে সাধারণ মানুষের।
চট্টগ্রামে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা লোডশেডিং
চট্টগ্রামে গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে নগরবাসী যেমন দুর্ভোগে পড়েছেন তেমনি শিল্প-কারখনায়ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তবে নগরের চেয়েও লোডশেডিং বেশি হচ্ছে গ্রামে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা। যদিও চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের খাতাপত্রে লোডশেডিং ছিল অতি সামান্য। বাস্তবে আজও দিনের বেশিরভাগ সময় লোডশেডিং ছিল।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে জানা গেছে, চট্টগ্রামে ২৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে অফ-পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৫৫৫ দশমিক ০৬ মেগাওয়াট এবং পিক-আওয়ারে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ২ হাজার ৭৯৪.৫০ মেগাওয়াট। মঙ্গলভার অফ-পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৫৮.৯২ মেগাওয়াট এবং পিক-আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪৬৯.৪৩ মেগাওয়াট।
রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই দিন অফ-পিক আওয়ারে লোডশেডিং ছিল মাত্র ২৮ মেগাওয়াট এবং পিক-আওয়ারে লোডশেডিং ছিল ৫১.৫০ মেগাওয়াট। অথচ এই হিসাবের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলছেন গ্রাহকরা।
নগরের পাঁচলাইশ থানার সংগীত আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মুনতাসির উদ্দিন রাফি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরে প্রতিদিন গড়ে ছয়-সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করে। দিনে পাঁচ ঘণ্টা করে লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের মধ্যে অসহনীয় লোডশেডিং আমাদের অতিষ্ঠ করে তুলেছে। এটি দ্রুত নিরসন জরুরি।’
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকবর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগ্রাবাদ কার্যালয় থেকে চট্টগ্রামসহ তিন পার্বত্য জেলা এবং কক্সবাজারে বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম চলে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) চট্টগ্রামে অফ-পিক আওয়ারে বিদ্যুতের লোডশেডিং ছিল মাত্র ২৮ মেগাওয়াট এবং পিক আওয়ারে লোডশেডিং ছিল ৫১.৫০ মেগাওয়াট।’
বিউবো সূত্রে জানা গেছে, বিউবোর বিদ্যুতের ক্ষেত্রে পিক-আওয়ার সাধারণত বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত, যখন চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। অন্যদিকে অফ-পিক আওয়ার হলো রাত ১১টা থেকে পরদিন বিকাল ৫টা পর্যন্ত, তখন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে।
রাজশাহীতে সাত-আট ঘণ্টা লোডশেডিং
নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) জিয়াউল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বুধবার রাত ৮টা পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৩১ মেগাওয়াট। সরবরাহ করা হয়েছে ১২২ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল ৯ মেগাওয়াট। এজন্য কিছু কিছু এলাকায় লোডশেডিং দিতে হয়েছে। সরবরাহ অনুযায়ী আমরা বিতরণ করছি।’
রাজশাহী নগরীর কাদিরগঞ্জ এলাকার সেলিনা বেগম বলেন, ‘ঘনঘন লোডশেডিংয়ে রান্নাবান্নাসহ দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র গরমে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পানির সংকটও দেখা দিচ্ছে। রাতের ঘুম নষ্ট হওয়ায় পরিবারের সবাই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। প্রতিদিন সাত-আট ঘণ্টা লোডশেডিং থাকছে। আমরা দ্রুত এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চাই।’
নগরীর লক্ষীপুর ভাটাপাড়া এলাকার শিক্ষক আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটছে। বিশেষ করে সন্ধ্যা ও রাতে বিদ্যুৎ না থাকায় নিয়মিত লেখাপড়া করতে পারছে না। তীব্র গরমে শ্রেণিকক্ষেও পাঠদান কঠিন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্ভোগ কমাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি।’
খুলনায় লোডশেডিং অনেক কম
ওজোপাডিকো খুলনার কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে জানা যায়, ওজোপাডিকোতে আজ বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭৭৬ মেগাওয়াট। পুরোটাই সরবরাহ পাওয়া গেছে। খুলনা জোনে চাহিদার ৬০২ মেগাওয়াট ও বরিশাল জোনে চাহিদার ১৭৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ রয়েছে। ফলে কোনও ধরনের লোডশেডিং দেওয়া হয়নি।
মহানগরী ও জেলার কোনও এলাকায় লোডশেডিংয়ের তথ্য জানা যায়নি। টুটপাড়ার সুজন এলাহী বলেন, আজই হঠাৎ করেই দেখছি সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও লোডশেডিং নেই। বাকি সময়টা এমন কাটলে ভালো।
কয়রার বাসিন্দা কবিতা মুন্ডা বলেন, ‘আজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লোডশেডিং একবারও হয়নি। আগে দিনে এক ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং হয়েছিল। যা গতকাল পর্যন্ত ছিল।’
কয়রার বাসিন্দা তরিকুল ইসলাম জানান, কয়রায় সন্ধ্যার পর এক ঘণ্টা করে দুবার লোডশেডিং হয়েছে। সারাদিনে কোনও লোডশেডিং ছিল না।
বাগেরহাটের তাসফিয়া জাহান বলেন, আজ সারাদিন বাগেরহাটে কোনও লোডশেডিং হয়নি। কিন্তু সন্ধ্যার পর দুবার হয়েছে।
বরিশালেও লোডশেডিং কমেছে
বরিশাল নগরীল রূপাতলী গ্রিড কন্ট্রোল রুম সূত্র জানিয়েছে, ৯০ মেগাওয়াট চাহিদা ছি আজ। জাতীয় গ্রিড থেকে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। ফলে বুধবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনও এলাকায় লোডশেডিং দেওয়া হয়নি।
নগরীর জর্ডান রোডের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমার এলাকায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং ছিল। আজ দিনে দুবার লোডশেডিং হয়েছে। যা আগের চেয়ে কমেছে।
নগরীর দক্ষিণ আলেকান্দা সিকদার পাড়া প্রথম লেনের বাসিন্দা মনি বেগম জানিয়েছেন, গতকাল আমাদের এলাকায় কোনও লোডশেডিং হয়নি। আজ একবার হয়েছিল। পুরো দিন স্বাভাবিক ছিল।
রংপুরে এক ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং
রংপুরে নগরীতে এক ঘণ্টা পর পর আজও লোডশেডিং ছিল। গ্রামাঞ্চল এবং মফস্বল জেলাগুলোতে বিদ্যুৎ ছিল না দিনের বেশিরভাগ সময়। নগরীর জিলা পরিষদ সুপার মাকেটের ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে লোডশেডিং চলছে। ব্যবসা লাটে ওঠার অবস্থা।’
রংপুর নেসকোর বিতরণ বিভাগ-১-এর সহকারী প্রকোশলী রহমান মোস্তাফিজ বলেন, ‘জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম পাওয়ায় বিতরণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এজন্য বেশিরভাগ এলাকায় ঘণ্টা ধরে লোডশেডিং দিতে হয়।’