খাবার সামনে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সে মুখ তুলেও তাকাচ্ছে না। খাঁচার ভেতরে হাঁটছে, কখনো পানিতে ডুব দিচ্ছে, আবার কখনো গেটের কাছে এসে ধাক্কা মারছে। যেন চেনা পরিবেশে ফেরার আকুতি জানাচ্ছে। বাগেরহাটের ঐতিহ্যবাহী খানজাহান আলী (রহ.) মাজারের দিঘি থেকে সরিয়ে আনার পর গত ১৯ দিন ধরে এমনই আচরণ করছে আলোচিত সেই কুমিরটি।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, খুলনায় আনার পর থেকে কুমিরটি একেবারেই খাবার গ্রহণ করেনি। তবে শারীরিকভাবে এখনো সুস্থ রয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা এবং কুমিরটির সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে আবারও তাকে মাজারের দিঘিতে ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
চলতি মাসের ১ জুন সন্ধ্যায় বাগেরহাটের খানজাহান আলী মাজারের দিঘিতে ফাতেমা নামে এক শিশুকে কুমির টেনে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনে মাজার কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসনের অনুরোধে ৩ জুন কুমিরটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়।
কিন্তু প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে পরিবেশে বসবাস করেছে, সেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর প্রাণীটির আচরণে স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের খুলনার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, কুমিরটি এখনো কোনো খাবার খায়নি। তাকে মুরগি দেওয়া হয়েছে, পানিতে হাঁস বেঁধেও রাখা হয়েছে। এমনকি একটি মুরগি শিকার করে মেরে ফেললেও সেটি খায়নি। সরীসৃপ প্রাণী হওয়ায় দীর্ঘদিন না খেয়ে থাকতে পারে, তবে আমরা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।

তিনি জানান, কুমিরটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৭ থেকে ৮ ফুট এবং ওজন আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি। বয়স প্রায় ৫০ বছর। অতিরিক্ত মোটা হওয়ায় ডাঙায় চলাফেরায় কিছুটা অসুবিধা হলেও পানিতে এটি স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছে।
বন বিভাগের ভাষ্য, কুমিরটি মাঝেমধ্যে খাঁচার গেটের কাছে গিয়ে ধাক্কা দেয়। অনেকটা মুক্ত পরিবেশে ফিরে যাওয়ার চেষ্টার মতোই মনে হয় তার আচরণ। তবে মানুষের নিরাপত্তা বিবেচনায় বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
নির্মল কুমার পাল বলেন, মানুষ এবং কুমির—উভয়ের নিরাপত্তাই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে কুমিরটি দিঘি থেকে বের হয়ে লোকালয়ে চলে যেত। এতে মানুষের ক্ষতির ঝুঁকি যেমন ছিল, তেমনি জনরোষে প্রাণীটিরও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল। মাজার কর্তৃপক্ষ যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুনরায় দিঘিতে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
বর্তমানে কুমিরটির দেখভালে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের অ্যানিমেল কিপার ও ওয়াইল্ড লাইফ স্কাউটরা সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছেন প্রাণীটিকে। প্রতিদিন পানি পরিবর্তন, শরীরে ঠান্ডা পানি স্প্রে এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
খানজাহান আলী মাজারের দিঘির কুমিরকে ঘিরে রয়েছে দীর্ঘদিনের ইতিহাস ও লোকবিশ্বাস। একসময় সেখানে ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’ নামে দুটি বিখ্যাত কুমির ছিল। সেগুলো মারা যাওয়ার পর ভারতের চেন্নাই থেকে কয়েকটি মিঠা পানির কুমির এনে দিঘিতে ছাড়া হয়। পরে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে একে একে মারা যায় অন্য কুমিরগুলো। শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল এই একটিই।
তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, কুমিরটিকে ঘিরে প্রচলিত নানা অলৌকিক বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সুন্দরবন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও বন ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, এগুলো সাধারণ মাগার কুমির। নিয়মিত খাদ্য দেওয়ার কারণে নির্দিষ্ট সংকেত পেলে পানির ওপরে ভেসে ওঠে। এটি প্রাণীর স্বাভাবিক শেখা আচরণ, এর মধ্যে অলৌকিকতার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।