Image description

২০২৬ সালের ১৯ জুন, আষাঢ়ের ঝড় ঝড় বাদল দিনে বাংলার সাহিত্য-সাংবাদিকতার আকাশ নেমে এলো শোকের ঘনকৃষ্ণ মেঘে। একুশে পদকপ্রাপ্ত অসামান্য এই সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা ও ধ্রুপদী সাহিত্যের কবি আল মুজাহিদী চিরতরে বন্ধ করে দিলেন তার চোখের দুটি তারা, চলে গেলেন মহাজাগতিক সফরে। তার বিদায় শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়; এটি একটি যুগের অবসান, একটি সংগ্রামী চেতনার নীরবতা, একটি কলমের থমকে যাওয়া।

ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে সাহিত্যের গভীর সমুদ্রে নিমজ্জিত হওয়া কবি আল মুজাহিদী ছিলেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। ছাত্রলীগ থেকে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘বাংলা ছাত্রলীগ’ প্রতিষ্ঠার যে সাহসী উদ্যোগ, তা ছিল এক অসাম্প্রদায়িক ও স্বাধীনতাকামী জাতির অন্যতম প্রেরণা। মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ সময়ে তিনি বুঝেছিলেন, ভাষা আন্দোলনের চেতনা শুধু সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না, তা রূপ নেবে রাজপথের সংগ্রামে। ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতার ডাক আসে, তখন তিনি আর কলমের যোদ্ধা ছিলেন না; তিনি হয়ে ওঠেন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক—একই সঙ্গে যুদ্ধের মাঠ ও মনের মাঠে সমান তেজী। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তৎকালীন প্রভাবশালী দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তিনি যেমন নতুন কবি-সাহিত্যিক তৈরি করেছেন, তেমনি তার নিজের কবিতায় উঠে এসেছে মাটি, মানুষ ও প্রতিবাদের কঠিন বাস্তবতা। ‘মৃত্তিকা’ কবিতাটি আজও পাঠকের হৃদয়ে কাঁপুনি দেয়, কারণ তিনি কখনো অলীক কল্পনায় বাস করেননি; তার সাহিত্য ছিল জীবন-ঘনিষ্ঠ, রক্তাক্ত এক ইতিহাসের দলিল।

আমার সঙ্গে কবি আল মুজাহিদীর প্রথম পরিচয় ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন—টিকাটুলির সেই পুরোনো ইত্তেফাক ভবনের সাহিত্য সম্পাদকের ঘরটিতে। আমাদের পারস্পরিক সূত্র ছিল টাঙ্গাইল জেলা; দুই টাঙ্গাইলবাসী হিসেবে সেই বন্ধনটি ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। প্রতিবারই ইত্তেফাক ভবনে যাওয়ার সময় মনে হতো যেন কোনো জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশ করছি—সেখানে তখন দেশের বরেণ্য কবি, লেখক, সাংবাদিকদের সমাগম। নিজের চোখে দেখতাম তাদের আড্ডা, বিতর্ক, আলোচনা; আর মৃদু হাসিতে কবি আল মুজাহিদী আমাকে সেই জগতে স্বাগত জানাতেন। কবিকে কখনো টাঙ্গাইলের বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য , কখনো স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে পরামর্শ করতে, আবার অনেক সময় শুধুই ঘরোয়া গল্প-আড্ডায় অংশ নিতে প্রায়ই ইত্তেফাক ভবনে যেতাম—সেসব মুহূর্ত আজও আমার চোখে ভাসে। তার কণ্ঠে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ছাত্র রাজনীতির কৌশল, ‘বাংলা ছাত্রলীগ’ গঠনের প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধের মাঠের অভিজ্ঞতা—শুনতে শুনতে সময় যেন থেমে যেত। তার মধ্যে আমি দেখেছি এক চিরবিদ্রোহী সত্তা, যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা, যা ছিল স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন।

দীর্ঘদিন পরে করোনাকালে আবার ঘনিষ্ঠ হই তার সঙ্গে। রাজধানীর উত্তরায় তার বাসস্থান আমার কাছেই ছিল। একদিন অসুস্থতার খবর পেয়ে ছুটে গেলাম দেখতে—বয়সের ভার তার কাঁধে নেমে এসেছে, একাকীত্ব যেন তাকে ঘিরে ফেলেছে। কিন্তু তিনি তো আল মুজাহিদী! অসহায়ত্বের মধ্যেও তার চোখে জ্বলছিল সৃষ্টির আগুন। এরপর থেকে তিনি প্রায়ই ফোন করতেন—হাসপাতালে যেতে হবে, প্রেসক্লাবের কোনো আড্ডায়, কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে। আমার গাড়িটা যেন তার কাছে হয়ে উঠেছিল চলার একমাত্র অবলম্বন। সেসময় আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে; তিনি মাঝে মাঝে আমার বাসায় আসতেন। সবচেয়ে আনন্দ পেতাম তার কাঁঠালপ্রীতি দেখে। প্রতি মৌসুমে তার বাসায় কাঁঠাল পৌঁছে দেওয়া আমার নিত্যকর্মে পরিণত হয়েছিল; কাঁঠালের বিচি দিয়ে তিনি এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে সেটা দেখে আমি হাসি চেপে রাখতে পারতাম না। একবার বিদেশ সফরে যাওয়ার সময় তাকে জিজ্ঞেস করলাম পছন্দের একটা কিছু আনতে চাই সেটা কী হতে পারে? তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে একটি ইংরেজী বইয়ের নাম বললেন। ফিরে এসে তার হাতে তিনটি বই তুলে দিলাম—সেই খুশি, সেই উজ্জ্বল দৃষ্টি, আমি কোনদিন ভুলব না।

ছয় মাস আগে শেষ দেখা হয় উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় তিনি তখন সেখানে ভর্তি। তার অসুস্থতার খবর পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলাম; খবরটি দেখে অনেকেই ছুটে এসেছিলেন তার সেবায়। কয়েকদিন পর তিনি বাড়ি ফিরলেও আগের প্রাণচাঞ্চল্য আর ছিল না। আমার সঙ্গে কথাও বললেন অনেক কম। হয়তো তিনি জানতেন, সময় এসে গেছে—তাই নীরবতা বেছে নিয়েছিলেন।

প্রায় তিন দশক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক থাকাকালে তিনি গড়ে তুলেছেন সাহিত্যের এক অনন্য সেতু। তার সম্পাদনায় পত্রিকাটি হয়ে উঠেছিল নবীন-প্রবীণ কবি-লেখকদের মিলনমেলা। তিনি যেমন লেখা ছাপাতেন, তেমনি উৎসাহ দিতেন নতুনদের, সৃষ্টি করতেন সাহিত্যানুরাগী এক বিশাল জনপদ। ইত্তেফাকের তৎকালীন সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের সাথে তার গভীর সম্পর্ক ছিল; এমনকি ইত্তেফাকের মালিকানাজনিত বিরোধেও তিনি ছিলেন অন্যতম মধ্যস্থতাকারী—এই দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন নির্মোহ ও সততার সঙ্গে। টাঙ্গাইলের ছেলেবেলার বন্ধু, বিশেষ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম, কবি বুলবুল খান মাহবুব, সাংবাদিক সাজ্জাদ কাদির এদের সঙ্গে তার কথা বলার ভঙ্গি, সে সময়ের যুদ্ধ-কাহিনি—শুনতে শুনতে আমার নিজের মনে হতো যেন আমি সে যুদ্ধের সাক্ষী। মাঝে মাঝে উনার সহোদর বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ শামীম আল মামুন (জাতীয় পার্টির এক সময়ের মহাসচিব) ভাইকে দেখতাম।

তিনি শুধু কবি ছিলেন না, ছিলেন ইতিহাসের জীবন্ত পাঠশালা।

আজ তিনি নেই। কিন্তু তার কলম, তার কণ্ঠ, তার প্রতিবাদী সত্তা আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবে। ‘মৃত্তিকার’ কবি হয়তো এখন মৃত্তিকারই অংশ হয়েছেন, কিন্তু তার রচিত প্রতিটি শব্দ হয়ে থাকবে অম্লান। দেশ হারালো এক অকুতোভয় সূর্য সন্তানকে—যিনি যেমন দেশকে ভালোবেসেছেন, তেমনি সাহিত্যকে দিয়েছেন নিজের জীবনবোধ। আমি গর্বিত যে তার সান্নিধ্য পেয়েছি, তার হাসি দেখেছি, তার কণ্ঠে স্বাধীনতার গান শুনেছি। তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। তিনি চলে গেলেও তার স্মৃতি আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতিটি প্রহরে জ্বলতে থাকবে অক্ষয় প্রদীপের মতো। বিদায়, কবি। বিদায়, বীর।

 

লেখক: নাহিদ হোসেন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ।