Image description

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জনসংখ্যার চাপ এবং ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত উত্তোলনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট দিনদিন তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও সুন্দরবনসংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় নিরাপদ পানির জন্য প্রতিদিনই সংগ্রাম করতে হয় লাখো মানুষকে। অগভীর নলকূপে লবণাক্ততা, পুকুরের পানিতে দূষণ এবং শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানি সংকটের বাস্তবতায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে সম্প্রতি পরিচালিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার কমিউনিকেশনসে ২০২৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূগর্ভে দুটি বড় সুপেয় পানির ভান্ডারের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউ মেক্সিকো ইনস্টিটিউট অব মাইনিং অ্যান্ড টেকনোলজির যৌথ গবেষণার নেতৃত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন ভূঁঞা।

গবেষণায় খুলনা থেকে সুন্দরবনের পশুর নদী অববাহিকা হয়ে উপকূল পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিশ্লেষণ করা হয়। খুলনা থেকে সুন্দরবনের দক্ষিণপ্রান্ত পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার এলাকায় ২৫টি স্থানে পরীক্ষা চালিয়ে গবেষকরা ভূগর্ভের যে চিত্র পেয়েছেন, তা উপকূলীয় পানি ব্যবস্থাপনায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। গবেষণায় শনাক্ত হওয়া প্রথম সুপেয় পানির স্তরটি খুলনা অঞ্চলের দিকে মাটির প্রায় ৮০০ মিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। ৪০ কিলোমিটারজুড়ে থাকা এই স্তরের বিস্তার আরও উত্তরে থাকতে পারে বলে ধারণা গবেষকদের। দ্বিতীয় স্তরটি পাওয়া গেছে সুন্দরবনের মধ্যভাগের নিচে, ২৫ থেকে ২৫০ মিটার গভীরতায়। এটিও প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যদিও এর পানিতে প্রথম স্তরের তুলনায় কিছুটা বেশি লবণাক্ততার উপস্থিতি থাকতে পারে। আবার এ দুটি মিঠাপানির ভান্ডারের মাঝখানে প্রায় ২০ কিলোমিটার বিস্তৃত লবণাক্ত অঞ্চল রয়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, বরফ যুগে যখন সমুদ্রপৃষ্ঠ বর্তমানের তুলনায় অনেক নিচে ছিল, তখন গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের মিঠাপানি এবং বৃষ্টির পানি ভূগর্ভের বালুময় স্তরগুলো পূর্ণ করে দেয়। পরে সমুদ্রপৃষ্ঠ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলে লবণাক্ত পানি উত্তরদিকে অগ্রসর হয়। কিন্তু মাটির নিচে গড়ে ওঠা শক্ত কাদার স্তর অনেক জায়গায় সুরক্ষাবলয় হিসাবে কাজ করে মিঠাপানিকে রক্ষা করে।

গবেষক ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, সঠিক পরিকল্পনায় ব্যবহার করা গেলে গভীর নলকূপ স্থাপন, নিরাপদ পানির সরবরাহ এবং জরুরি সময়ের জন্য কৌশলগত পানি সংরক্ষণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই পানির বয়স ১০ থেকে ২৫ হাজার বছর। অর্থাৎ এটি দ্রুত নবায়নযোগ্য কোনো সম্পদ নয়। অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ চাপের ভারসাম্য নষ্ট হলে পাশের লবণাক্ত পানি মিঠাপানির স্তরে ঢুকে পড়তে পারে।

এ প্রেক্ষাপটে গবেষকরা বিজ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ওপর জোর দিয়েছেন। গভীর এই সুপেয় পানিকে উপকূলীয় মানুষের জন্য ‘কৌশলগত পানির রিজার্ভ’ হিসাবে ঘোষণা করা উচিত বলে মত তাদের।

তারা জানান, বাণিজ্যিক ব্যবহার বা কৃষি সেচের জন্য এটি উন্মুক্ত করা যাবে না। একই সঙ্গে পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম উপকূলেও একই ধরনের জরিপ চালানোর সুপারিশ করা হয়েছে।