বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় এক দশকের বেশি সময় ধরে তদন্তের পর খসড়া অভিযোগপত্র প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। দেড়শ পৃষ্ঠার এই অভিযোগপত্র সম্প্রতি অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করে আইনি পরামর্শ চেয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় করা অভিযোগপত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ বাংলাদেশের ১০ জনের নাম রয়েছে। সবমিলিয়ে ভারত, শ্রীলংকা ও চীনের নাগরিকসহ দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে। বুধবার সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে। তিনি এখন পলাতক।
গত বছরের ডিসেম্বর থেকে মামলার তদন্ত করছেন সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন। তিনি বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে আইনি পরামর্শ পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ১০১ মিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ চুরির এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান, উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদার নাম রয়েছে। অভিযুক্তের তালিকায় আরও তিন বাংলাদেশির নাম উঠে এসেছে। তারা হচ্ছেন-কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, রেজাউল করিম ও মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ। শেষ তিনজনের পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
এই কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত ভারতীয়দের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন আইটি উপদেষ্টা রাকেশ আস্থানার নাম আছে। প্রসঙ্গত রিজার্ভ চুরির ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর মূল হোতা এই রাকেশ আস্থানাকে প্রধান করে একটি ফরেনসিক অডিট হয়। অভিযোগ রয়েছে-ওই অডিটের সময় বেশির ভাগ আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। এছাড়া হ্যাকিংয়ে সহায়তা, মানি লন্ডারিং ও চুরির অভিযোগ আনা হয়েছে ভারতীয় নাগরিক প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্রআথ্রেশ, নীলভান্নান ও মাদুক্কুর আনন্দনের বিরুদ্ধে। খসড়া অভিযোগপত্রে চিহ্নিত উত্তর কোরিয়ার অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন-ল্যাজারাস গ্রুপ, পার্ক জিন হিয়োক। অভিযোগপত্রে গাও শুহুয়াসহ দুজন চীনা নাগরিকের নামও উঠে এসেছে। জাপানের সাসাকি নামের এক ব্যক্তি এই তালিকায় রয়েছে। রিজার্ভ চুরির একটি অংশ শ্রীলংকায় নেওয়া হয়েছিল। ওই ঘটনায় দেশটির হেগোডা গামাগে শ্যালিকা পেরেরাসহ ৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে। ১১ বছর আগের এই আর্থিক কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্তের মধ্যে আরও রয়েছে- সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো ও কাম সিন অংসহ ৩৬ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। এছাড়া নর্থ কোরিয়ার দুই ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে চুরির ঘটনায় দায়ী করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে তখন ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি হয় এবং পরে ৩৪.৬ মিলিয়ন ডলার ফেরত আনা হয়। জড়িত হ্যাকাররা সুইফট পেমেন্ট পদ্ধতিতে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে এই বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। চুরির ঘটনার ৩৯ দিন পর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিআইডি শুরু থেকেই মামলাটি তদন্ত করছে। গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি করেছিল অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকার। সেই কমিটির তত্ত্বাবধানে রিজার্ভ চুরির মামলা তদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে গত ১ মার্চ খসড়া অভিযোগপত্র অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। তিনি যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকা মামলাটি নিয়ে কাজ শুরুর পর দেখতে পাই প্রথম তদন্তকারী কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খান সঠিকভাবে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছিল। কিন্তু তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়েছে। তদন্তে উঠে আসা ১০ বাংলাদেশির নাম বাদ দিতে বলা হয়েছিল। পরে উনাকে সরিয়ে দিয়ে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি করে দেওয়ার পর সব অপরাধী চিহ্নিত করে খসড়া অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়। বর্তমান সরকার এই অভিযোগপত্র ধরে বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন বলে প্রত্যাশা করছি।
জানা গেছে, আলোচিত এই মামলার ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তদন্ত করেছেন পুলিশ সদর দপ্তররের বর্তমান অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান। তিনি যখন তদন্ত করছিলেন তখন ১০১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৩৪.৬ মিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর আর কোনো অর্থ ফেরত আসেনি। ফলে উদ্ধার না হওয়া অর্থের পরিমাণ ৬৬.৪ মিলিয়ন ডলার। কথা হয় অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, চুরির ৪১ দিন পর মামলা হওয়ায় আমরা প্রকৃত ক্রাইম সিনে প্রবেশ করতে পারিনি। আগেই একটি আন-অথোরাইজড বিদেশি আইটি ফার্ম ও দেশি আন-অথোরাইজড ব্যক্তি ক্রাইম সিনে প্রবেশ করেছিলেন। এরপরও আমরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সব আলামত সংগ্রহ করে ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য সিআইডির আইটি ফরেনসিক ল্যাবে পাঠিয়েছি। ২০২৩ সালে ফরেনসিক রিপোর্ট পেয়েছি। মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টের (এমএলএআর) মাধ্যমে ফিলিপাইন থেকে ৪ হাজার ৫০০ পৃষ্ঠা, ভারত ও জাপান থেকে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছি। এরপর ফিলিপাইনের আরসিবিসির ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মায়া দিগুতির স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করেছি, যেখানে তিনি অনেক আসামির (বিদেশি) জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
ওই কর্মকর্তা বলেন, তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রায় ৭০ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তবে ২০২০ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ ঘটনায় আন্তঃমন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠক হয়। সেখানে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্র সচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, গভর্নর, হেড অব বিএফআইইউ, সিআইডির প্রধান ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তারা বাংলাদেশের অপরাধীদের নাম বাদ দিয়ে চার্জশিট দিতে নির্দেশ দেন। এতে রাজি না হওয়ায় একপর্যায়ে ওই সভা থেকে আমাকে ও মামলা তদারককারী কর্মকর্তা বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামালকে বের করে দেওয়া হয়।
রায়হান উদ্দিন বলেন, পরে ২০২২ সালে সিআইডি প্রধান মোহাম্মাদ আলী একইভাবে বাংলাদেশের অপরাধীদের নাম বাদ দিতে বলেন। এরপর ২০২৩ সালের এপ্রিলে ফরেনসিক রিপোর্ট আসার পর তখন তিনি ফরেনসিক রিপোর্ট বিদেশি একটি ল’ফার্মকে দিতে বলেন। এরপর ২০২৩ সালে ফের বাংলাদেশিদের বাদ দিয়ে চার্জশিট করতে বলেন।
তখন আমি তাকে বলি এত তথ্য-প্রমাণ থাকার পর কোনোভাবেই কারও নাম বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। এরপর আমাকে মামলা থেকে সরিয়ে বদলি করা হয় সিআইডির জয়পুরহাট জেলায়। পরে আবার বদলি করা হয় এন্টি টেরোরিজম ইউনিটে (এটিইউ), আমি সেখানে যোগ দিই। এরপর মামলার পরবর্তী আইও ডকেট ও অন্যান্য কাগজপত্র বুঝে নেন। পরে জানতে পারি যে, ফরেনসিক রিপোর্ট পরবর্তী সময়ে বিদেশি ল’ফার্মকে সরবরাহ করা হয়। এরপর মার্চ ২০২৫ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত আমি তদারক কর্মকর্তা হিসাবে ছিলাম।