রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসককে মারধরের ঘটনায় মায়ের লাশ আটকে রেখে অভিযুক্ত ছেলেকে কান ধরিয়ে ওঠবস করিয়ে ক্ষমা চাওয়ানোর পরেও কর্মবিরতিতে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
চিকিৎসককে মারধরের ঘটনার প্রতিবাদে এবং কয়েক দফা দাবিতে রোববার (১৪ জুন) সকাল থেকে কর্মবিরতি শুরু করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। একই সঙ্গে মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরাও ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের কর্মসূচি পালন করছেন।
এর আগে, শনিবার (১৩ জুন) ভোরে নগরীর জুম্মাপাড়া এলাকার নূরনাহার বেগমকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়। ভর্তির কিছুক্ষণ পর তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসকদের অবহেলার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নূরনাহার বেগমের ছোট ছেলে রিফাত হোসেন। একপর্যায়ে কর্তব্যরত ইন্টার্ন চিকিৎসক নাইম বকশী ও ইনডোর অফিসার ডা. রাকিব হাসানকে মারধর করেন বলে অভিযোগ।
ঘটনার প্রতিবাদে লাশ আটকে রেখে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামেন। তারা শনিবার বেলা ১১টা থেকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর ১টার দিকে জরুরি বিভাগের কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়। দুপুরে লাশ অ্যাম্বুলেন্সে তুলে বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলাকালে আন্দোলনকারী ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা বাধা দেন। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্স থেকে লাশ নামিয়ে হাসপাতালের মর্গে নিয়ে রাখা হয়। পরে তারা সেখানে অবস্থান নিয়ে অভিযুক্ত রিফাতকে হাসপাতালে এসে ক্ষমা না চাইলে তার মায়ের লাশ দেওয়া হবে না বলে মাইকে ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভ করেন।
পরে চিকিৎসক মারধরের ঘটনায় অভিযুক্ত রিফাত হোসেনকে হাসপাতালে ডেকে আনা হয়। তিনি পরিচালকের কার্যালয়ে অবস্থান করছেন- এমন খবরে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা সেখানে গিয়ে অবস্থান নেন। এ সময় অভিযুক্ত রিফাত হোসেনকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানোর শাস্তির দাবিতে তারা পরিচালক কার্যালয়ের সামনে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে পরিচালকের কার্যালয়ের ভেতরে রিফাতকে কান ধরে ওঠবস করানোর পর তার মায়ের লাশ ফেরত দেওয়া হয়।
কান ধরে ওঠবস করানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, অভিযুক্ত রিফাত কান ধরে ওঠবস করছেন। এ সময় তার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদের সভাপতি সাদমান মিরাজ।
এ বিষয়ে সাদমান মিরাজ বলেন, চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার পর চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, হাসপাতালে নিরাপত্তা জোরদারসহ কয়েক দফা দাবিতে তাদের কর্মসূচি চলছে।
মায়ের লাশ আটকে রেখে অভিযুক্ত ছেলেকে কান ধরিয়ে ওঠবস করানোর পরও কেন কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তার মায়ের জানাজা ছিল। তাই তাৎক্ষণিকভাবে মামলা বা অভিযোগ দেওয়া হয়নি। যেন লঘু দোষে গুরু শাস্তি না হয়, সে কারণে তাকে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছে। আমরা অতটা অমানবিক নই।
সাদমান মিরাজ দাবি করেন, কান ধরে ওঠবস করানোর সময় পরিচালকের কার্যালয়ে পুলিশ ও হাসপাতাল প্রশাসনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। তার অভিযোগ, চিকিৎসকদের মারধরের ঘটনায় পুলিশকে জানানো হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ‘মব’ তৈরি করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। শিক্ষার্থীদের ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতির কারণে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও বহির্বিভাগের সেবায় প্রভাব পড়েছে। তবে জরুরি সেবা চালু রাখার চেষ্টা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে ভর্তি এক রোগীর স্বজন মশিউর রহমান বলেন, ওয়ার্ডে সবসময় চিকিৎসকরা থাকেন না। বেশির ভাগ সময় ইন্টার্ন চিকিৎসকরাই রোগীদের দেখভাল করেন। এখন তারাও আসছেন না। তারা না এলে রোগীদের কী হবে?
ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা বলেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের কর্মসূচি চলবে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, আমরা ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সঙ্গে বসব, দাবিগুলো শুনব। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হবে বলে আশা করছি।