Image description

ঋণের বোঝায় জর্জরিত রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ১২২টি প্রতিষ্ঠান। অল্পস্বল্প নয়, এ বোঝার ওজন প্রায় সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকা। বিশাল চাপের প্রতিক্রিয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান যেন অর্থনীতির জন্য নীরব আর্থিক ঝুঁকির বোমায় পরিণত হয়েছে।

বিপুল অঙ্কের এই অর্থ চলতি (২০২৫-২৬) বাজেটের চেয়েও বেশি। অর্থনীতির চালিকাশক্তি হওয়ার বদলে এগুলো এখন ‘উচ্চঝুঁকি’ ও ‘ঝুঁকি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঋণের বড় অংশই আসছে ব্যাংক খাত থেকে। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসানের দায় শেষ পর্যন্ত পড়ছে জনগণের ঘাড়ে। তাদের করের টাকার অনেকটাই চলে যাচ্ছে এই বাবদে। অর্থ বিভাগের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে (২০২৬-২৭ থেকে ২০২৮-২৯) তুলে ধরা হয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দুরবস্থার এমন চিত্র।

জাতীয় সংসদে গত বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণার সময় অর্থমন্ত্রী এই নীতি বিবৃতি উপস্থাপন করেন। বিবৃতি থেকে জানা যায়, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে তিনটি খাত শনাক্ত করেছে। তার অন্যতম রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো (এসওই)। বাকি দুটি হচ্ছে বৈশ্বিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

১২২টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে ১৯টি, ঝুঁকিতে ৩০টি, মাঝারি ঝুঁকিতে ৫০টি, স্বল্প ঝুঁকিতে ১৮টি এবং খুব স্বল্প ঝুঁকিতে চারটি প্রতিষ্ঠান।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ঋণ-দায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জিডিপির ১৬ দশমিক ৬৪ শতাংশের সমান, যা মধ্যমেয়াদে উচ্চমাত্রার আর্থিক ঝুঁকি নির্দেশ করছে। ১২২টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উচ্চমাত্রার ঝুঁকিতে রয়েছে ১৯টি, ঝুঁকিতে ৩০টি, মাঝারি ঝুঁকিতে ৫০টি, স্বল্প ঝুঁকিতে ১৮টি এবং খুব স্বল্প ঝুঁকিতে চারটি প্রতিষ্ঠান। এ ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাঠামো অনুসরণে। সেখানে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের মুনাফা সক্ষমতা, তারল্য এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতাকে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, উচ্চঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১০টিই রাষ্ট্রায়ত্ত চিনিকল। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, ব্যাংক ঋণের সুদ তাদের উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ দখল করে নিচ্ছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান ঋণ ও লোকসানকে অর্থনীতির জন্য বিরাট বোঝা এবং রক্তক্ষরণ বলে মন্তব্য করেন সাবেক সিনিয়র অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ। তিনি গতকাল শনিবার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, এ দায় শুধু হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নয়; প্রতি বছর সরকারি বাজেট থেকে করদাতাদের অর্থ ব্যয় করে বহন করতে হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের লোকসান। তবে সমস্যাটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত রাজনৈতিক অর্থনীতির বাস্তবতা। অনেক প্রতিষ্ঠান অর্থনৈতিক বিচারে টেকসই না হলেও শ্রমিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ এবং কৌশলগত প্রয়োজনের কারণে সেগুলো এক ধাক্কায় বন্ধ করা বা বেসরকারীকরণ সম্ভব হচ্ছে না।

‘পাটকল ও চিনিকলের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব ধরে রাখার অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নেই এবং সেগুলো নিয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক প্রভাব ও রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় ধাপে ধাপে সংস্কার কৌশল গ্রহণ করতে হবে’— বললেন আর্থিক খাতের সাবেক এই কর্মকর্তা।

জানতে চাইলে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আর্থিক দুর্বলতা শুধু ঝুঁকির বিষয় নয়, এটি বাজেট ও করদাতাদের অর্থ ব্যবহারের দক্ষতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বছরের পর বছর লোকসান ও ঋণের বোঝা বহনকারী এসব প্রতিষ্ঠানের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারকেই নিতে হচ্ছে। ফলে বাজেটে সৃষ্টি হচ্ছে বড় ধরনের চাপ। তার মতে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা যাবে; কোনটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় পরিচালিত হবে, কোনটির শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার সুযোগ রয়েছে এবং সরকারি মালিকানা রেখেই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দেওয়া যায়— এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন।

পণ্য ও সেবা সরবরাহ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পোন্নয়নে অবদান রাখলেও এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা এখন সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি করেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, জ্বালানি, পরিবহন, নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ, পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষিসহ বিভিন্ন কৌশলগত খাতে ভূমিকা পালন করে আসছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো। তবে পণ্য ও সেবা সরবরাহ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পোন্নয়নে অবদান রাখলেও এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুর্বলতা এখন সরকারের জন্য বড় ধরনের রাজস্ব ঝুঁকি তৈরি করেছে। এটি শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংকট নয়। ভবিষ্যতে এটি দেশের রাজস্ব স্থিতিশীলতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য রূপ নিতে পারে বড় ধরনের হুমকিতে।

জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়েছে মূলত তিনভাবে। এগুলো হলো—প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ গ্যারান্টি থেকে উদ্ভূত আকস্মিক দায়, লোকসানি প্রতিষ্ঠানের মূলধন পুনঃসংস্থানের প্রয়োজনীয়তা থেকে সৃষ্ট পরোক্ষ দায় এবং সরকারি ইক্যুইটি বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়া। ঝুঁকিতে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তা চিহ্নিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য এ মূল্যায়ন করেছে সরকার। ঝুঁকি কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে নীতি বিবৃতিতে। একই সঙ্গে দেওয়া হয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে সুশাসন, স্বচ্ছতা, আর্থিক শৃঙ্খলা ও পরিচালন দক্ষতা জোরদারের পথনির্দেশ।

দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১২২টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার মোট দায় দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকা। এটিকে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, এ দায়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ ৩ লাখ ৫০ হাজার ৬৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা বা ৪২ দশমিক ০১ শতাংশ সরকারের কাছ থেকে সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট (এসএলএ) এবং লোন অ্যাগ্রিমেন্টের (এলএ) আওতায় নেওয়া ঋণ। এসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ পূর্বানুমানযোগ্য। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার কারণে তা সরকারের জন্য আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ ধরনের দায়কে বলা যায় ‘গোপন আর্থিক ঝুঁকি’।