Image description

সংবাদকর্মী মেরিনা মিতুর জীবনে গতি আর স্বাচ্ছন্দ্য এনেছে মেট্রোরেল। মিরপুরের মাটিকাটা থেকে মতিঝিলের অফিস যাত্রা এখন আর সমস্যা মনে হয় না তার কাছে।

মাটিকাটা থেকে পল্লবী পর্যন্ত তিনি চলে আসেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায়। এরপর চড়েন মেট্রোরেলে। আগে মোটরসাইকেলেও এই পথে যেখানে কখনো কখনো দুই ঘণ্টা লেগে যেত, সেখানে এখন আধা ঘণ্টার ব্যাপার।

টাইমস অব বাংলাদেশকে মিতু বলেন, ‘গরমে যানজটে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে না। মেট্রোতে এসি থাকায় তেমন কোনো কষ্ট নেই। এখন মোটরসাইকেলও খুব একটা চালাই না।’

বাড্ডার বাসিন্দা তায়েব মিল্লাত হোসেনও এমন স্বস্তিতে থাকার আশা করেছিলেন। কারণ, সেখান দিয়ে পাতাল পথে মেট্রোরেলের আরও একটি লাইন চলতি বছরেই চালু হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর এই কাজ আটকে যায়।

মিল্লাত বলেন, ‘বাড্ডার প্রগতি সরণি লোকমুখে বিশ্বরোড নামে পরিচিত। আন্তঃজেলা বাস চলে, পণ্যবাহী ট্রাকও চলে। চলে অজস্র রিকশাও। এ কারণে দিনভর তো বটেই গভীর রাত পর্যন্তও যানজট থাকে। মেট্রোরেলের এই রুটের কাজ বন্ধ হয়ে থাকা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আমরা চাই এই জট খুলে কাজ আবার শুরু হোক।’

অন্তর্বর্তী সরকার এই মেট্রোর কাজ এগিয়ে নেয়নি। বর্তমান বিএনপি সরকারের ভূমিকাও স্পষ্ট না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অবশ্য দেশে ফিরেই মেট্রোরেলের বদলে মনোরেলের কথা বলেছেন। তার দৃষ্টিতে মনোরেলই ঢাকায় বেশি উপযুক্ত, যদিও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মনোরেল কখনো জনবহুল একটি শহরে মেট্রোর বিকল্প হতে পারে না। মেট্রোর পাশাপাশি মনোরেল চলতে পারে, বলছেন তারা।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘ঢাকার যানজট নিরসনে ছয়টি মেট্রোরেল লাইনের সমন্বয়ে আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। মেট্রোরেলের সঙ্গে সংযুক্ত মনোরেলভিত্তিক ফিডার নেটওয়ার্ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পুরোনো বাস পর্যায়ক্রমে বৈদ্যুতিক বাস দিয়ে প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

জটের শুরু অন্তর্বর্তী আমলে

তীব্র যানজটের ভোগান্তির এই ঢাকা শহরে ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রো রুট চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করেছিল বাস্তবায়নকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড।

উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত এমআরটি-৬ চালুর পর এর উপযোগিতা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি-১ এর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। ২০২৬ সালের মধ্যে আনুমানিক ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকায় এটি চালুর কথা ছিল।

সে সময় এর দুটি অংশ থাকার কথা জানানো হয়। একটি বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার অংশ। এটি হবে ভূগর্ভস্থ এবং এতে ১২টি স্টেশন থাকবে। অপর অংশটি নতুন বাজার থেকে প্রায় ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার এলিভেটেড লাইনসহ পূর্বাচল পর্যন্ত। এমআরটি-১ এর জন্য নারায়ণগঞ্জের পিতলগঞ্জে ১ হাজার ২১৯ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে ডিপো।

ওই বছরেরই ৪ নভেম্বর এমআরটি-৫ (উত্তর) এর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। সাভারের হেমায়েতপুর থেকে রাজধানীর ভাটারা পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার পাতাল এবং ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার উড়ালসহ মোট ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ লাইনটি ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মেট্রো নির্মাণ পরিকল্পনায় ছেদ পড়ে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গাবতলী থেকে আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) এর কাজ স্থগিত করে। আর এমআরটি-১ ও এমআরটি-৫ এর নির্মাণ কাজ এগিয়ে নেওয়ার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো সময়ক্ষেপণে এখন তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

এর মধ্যে এমআরটি-১ এর নির্মাণ ব্যয় ৯৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা বলাবলি হচ্ছে। তবে জাপানি সহযোগিতা প্রতিষ্ঠান জাইকার সঙ্গে ব্যয় কমানোর আলোচনা করে সময় শেষ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।

জাইকার সঙ্গে সবশেষ সমঝোতা অনুযায়ী, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে জাপানের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ‍নির্মাণ ব্যয় নিয়ে এখনো সমঝোতায় আসতে পারেনি বিএনপি সরকার।

এমআরটি-৫ (উত্তর) এর কাজও পুরোপুরি থমকে আছে। এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেই।

গাবতলী থেকে নারায়ণগঞ্জের চিটাগং রুট পর্যন্ত এমআরটি-২ এবং কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত এমআরটি-৪ নিয়ে ডিএমটিসিএল বা সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। যদিও ২০১৭ সালেই সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে এই লাইন তৈরিতে জাপানের সঙ্গে সরকারের চুক্তি সই হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার সব মিলিয়ে ১৩৫টি নতুন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে, যার ব্যয় ২ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার মতো। নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে চট্টগ্রামকে। বিপরীতে ২১টি জেলার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি।

ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-১) উপ-প্রকল্প পরিচালক (গণসংযোগ) নাজমুল ইসলাম ভূইয়া টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘২০২৪ সালের আগস্টে এই প্রকল্পের ১২টি প্যাকেজের মধ্যে একটি প্যাকেজের কাজ শেষ হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর প্যাকেজগুলোর টেন্ডার দেওয়ার পর একেকটি প্যাকেজ পরিস্থিতি ছিল একেক রকম। কোনোটা মূল্যায়ন শুরু হচ্ছিল, কোনোটা শেষ পর্যায়ে ছিল। তবে এই সরকার কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি।’

প্রকল্পটির কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমানে দরপত্র প্রক্রিয়াটি সক্রিয় পর্যায়ে আছে। বিভিন্ন ধাপে আলোচনা চলছে। দ্রুত একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে যাচ্ছে। তবে, দরপত্র চুড়ান্ত করতে হলে দরকার প্রকল্পটি পাস করা।

নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান টাইমসকে বলেন, ‘এই ১৮ মাস প্রকল্প বাস্তবায়ন পিছিয়ে গেল। ফলে মানুষ সেবা পেতেও পিছিয়ে গেল।’

বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশলের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান বলছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার দফায় দফায় জাইকার সঙ্গে দরকষাকষির করে ব্যয় কমাতে কিন্তু পারেনি কারণ জাইকা তা মানতে নারাজ ছিল। এতে সরকারের উচিত ছিল নকশার পরিবর্তন বা বিকল্প চিন্তা করা। সেটাও তারা করেনি।’

এমআরটি-৫ এর প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে কি না, তা সরকারের নীতি সিদ্ধান্তের বিষয়। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকারকে তো সময় দিতে হবে।’

পরিবহন বিশেষজ্ঞ সামসুল হক বলছেন, ‘আমাদের মেট্রো দরকার। জাইকার সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী, মেট্রোরেলের খরচ অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তাই বর্তমান সরকারের উচিত প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ে বাকি মেট্রোরেলগুলো দ্রুত শেষ করে ফেলা।’

বিএনপি চায় মনোরেল

নতুন বছরের বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপিতে এমআরটি-১ এর (পাতাল) বরাদ্দ ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা আর এমআরটি-৫ এর জন্য ৩ হাজার ৯০৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে রুট দুটির জটিলতা নিরসন এবং জাইকার সঙ্গে চুক্তি করার বিষয়ে কোনো কিছু বলছে না সরকার। বরং বিএনপি মনোরেলের কথা বলছে, বাজেটেও এর উল্লেখ আছে।

মনোরেল হচ্ছে একটি মাত্র লাইনের ওপর দিয়ে চলাচলকারী পরিবহন। একটি মাত্র বিমের ওপর ট্রেন চলাচল করে। এর জন্য আলাদা দুটি লাইন দরকার হয় না।

মনোরেল চলাচল এবং এর অবকাঠামো নির্মাণে তুলনামূলকভাবে কম জায়গার প্রয়োজন হয়। সরু পথ ও ঘন শহর এলাকায় সহজেই নির্মাণ করা যায়। মেট্রোরেলের চেয়ে এর নির্মাণে ব্যয়ও তুলনামূলক কম।

চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অনেক দেশেই মেট্রোরেলের পাশাপাশি মনোরেল চলাচল করছে।

অবশ্য ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনায় মনোরেলের কথা উল্লেখ নেই। তবে সরকার নতুন করে আরবান ট্রান্সপোর্ট পলিসি তৈরি করছে সেখানে মনোরেল থাকবে। তবে মনোরেলের বিষয়েও সরকার বিস্তারিত কোনো পরিকল্পনা ঘোষণা করেনি।

ঢাকার গণপরিবহন পরিকল্পনায় বড় ঘাটতি হিসেবে ফিডার নেটওয়ার্কের অভাবের কথা তুলে ধরেছেন শামসুল হক। তার মতে, মেট্রোরেল পরিকল্পনা প্রকৃত অর্থে সমন্বিত গণপরিবহন মাস্টারপ্ল্যান হয়ে ওঠেনি; বরং যেখানে প্রশস্ত সড়ক পাওয়া গেছে, সেখানেই মেট্রোরেলের রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ঘনবসতিপূর্ণ অনেক এলাকা এখনো কার্যকর গণপরিবহন কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।

তিনি বলেন, ‘একটি আধুনিক নগরের গণপরিবহন ব্যবস্থা শুধু মেট্রোরেলের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না। এর সঙ্গে মনোরেল, এলআরটি, বিআরটি, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং স্থানীয় ফিডার সার্ভিসের সমন্বিত নেটওয়ার্ক থাকতে হয়।’

বুয়েটের পুরাকৌশল বিভাগের আরেক অধ্যাপক মো. হাবিবুর জামান টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের সড়ক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। তারপর হালকা অবকাঠামো যেমন, মনোরেল, তারপর মেট্রোরেলে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের এসব নীতি হয়ে গেছে উল্টো।’