ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন পার করার পরপরই ২০২৬-২৭ সালের বাজেট ঘোষণা এলো। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে আসা অন্তর্বর্তী সরকারের পর প্রতীক্ষিত নির্বাচিত সরকারের প্রতি নানা কারণেই আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাও বেশি। এ প্রেক্ষাপটে দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মুখোমুখি হয়েছিল আগামীর সময়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাঈদ জুবেরী
আগামীর সময়: একটি বড় গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচিত নতুন সরকার তাদের প্রথম বাজেট পেশ করল। এই সরকারের ‘বাজেট দর্শনে’ কি কোনো বড় পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছেন?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: প্রথাগত দর্শনে হঠাৎ বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। কারণ, যেকোনো নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, নানা প্রতিবন্ধকতা এবং সম্ভাবনাগুলোকে আগে আত্মস্থ করতে হয়। পাশাপাশি, বর্তমান বিশ্বের বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করার চাপ তো আছেই। এর বাইরেও সরকারকে কয়েকটি নির্দিষ্ট বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বাজেট দর্শনের আসল প্রকাশ ঘটে তার বরাদ্দ এবং প্রয়োগের মধ্য দিয়ে। দর্শনের দিক থেকে ওনারা একটি মানবিক সমাজ ও কল্যাণরাষ্ট্র গড়ার কথা বলছেন। দেখতে হবে, এই মানবিক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে বাজেটে প্রকৃত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ কী আসছে। উদারীকরণ ও বিনিয়ন্ত্রণ, অর্থমন্ত্রী বারবার এ দুটি শব্দ ব্যবহার করছেন। আমরা দেখার চেষ্টা করব ওনারা কী ধরনের বিনিয়ন্ত্রণ করছেন, যার মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের খরচ কমবে এবং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। অর্থমন্ত্রী বলছেন, এটি সবার জন্য বাজেট। তবে শুধু প্রথাগত বা নামমাত্র (Nominally) কিছু অর্থ বরাদ্দ দেখিয়েই ‘সবার বাজেট’ বলা যায় না। শেষ পর্যন্ত সম্পদের অভাবে সেই বরাদ্দ রক্ষা করা যাবে কি না, সেটিই বড় দেখার বিষয়। ওনারা বর্তমান পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতি কিংবা বিশ্বায়িত অর্থনীতির ধারা থেকে বের হতে পারবেন না। তবে এই কাঠামোর মধ্যে থেকেই ওনারা মানবকল্যাণ, জনকল্যাণ বা উৎপাদনমুখী কী ধরনের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিচ্ছেন— সেটিই এ সরকারের আসল বাজেট দর্শন।
আগামীর সময়: মাঠপর্যায়ে এক ধরনের ‘এবার আমাদের পালা; সংস্কৃতির চর্চা দৃশ্যমান হচ্ছে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আপনি কি মনে করেন, এটি বিগত আমলের দলীয়করণের ধারাকেই আবার পুনরুজ্জীবিত করছে?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: রাষ্ট্র, সরকার, সমাজ ও অর্থনীতি অতীতে যে পুরনো ধারায় চলছিল, তার ভেতরে ‘রাজনীতিকরণ বা দলীয়করণ’ ছিল একটি বড় প্রবণতা। এর সঙ্গে সন্ত্রাস, শক্তি ও বলপ্রয়োগ এবং সর্বোপরি জনগণের নিরাপত্তার অভাব বা সামাজিক বিপন্নতা জড়িয়ে ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সমস্যাগুলোর কোনো বড় ধরনের স্থায়ী সমাধান হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। ফলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমরা যে বাজেট করছি, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন— বাজেটের দর্শনে আমরা ‘মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর’ যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তা মাঠপর্যায়ে গিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এ প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সুফল কীভাবে প্রতিফলিত হবে, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আগামীর সময়: প্রধানমন্ত্রী শুল্কমুক্ত গাড়ি নিচ্ছেন না, ভিআইপি প্রটোকল নিচ্ছেন না— এমন কিছু প্রতীকী ইতিবাচক আচরণ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের ব্যক্তিগত উদ্যোগ আসলে আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামষ্টিক জায়গাটা পরিবর্তনে কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: একে অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে দেখতে হবে। তবে এখানে একটি বড় ‘কিন্তু’ রয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর এ আচরণে আমরা সামাজিকভাবে যে তৃপ্তি পাচ্ছি বা প্রশংসা করছি, তা যদি সাধারণ মানুষের প্রকৃত অর্থনীতি, রুটি-রুজি এবং জানমালের নিরাপত্তার নিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিফলিত না হয়, তবে এই ইতিবাচক আবহের অবদান খুব দ্রুতই কেটে যাবে বলে আমি আশঙ্কা করি। এই ব্যক্তিগত সদাচরণকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার ভেতরে প্রতিফলিত হতে হবে। ডিসি বা এসপিরা যদি জনগণের সঙ্গে আগের মতোই ঔপনিবেশিক আচরণ করেন, তবে প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগে কোনো প্রতিফলন ঘটল না। বড় প্রশ্ন হলো, প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই আদর্শ ও আচরণ নিজের অনুগামী (দলীয় নেতাকর্মী) এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকর্তাদের শেখাতে পারলেন কি না। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আচরণের চেয়েও রাষ্ট্র সামগ্রিকভাবে তার নাগরিকদের প্রতি কেমন আচরণ করছে—সেটিই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি।
আগামীর সময়: দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হলে ৬ মাস পর মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: আমি একে খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছি। এটি শুধু ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর মধ্যে এর ভালো একটি সূচনাও আমরা দেখেছি। কয়েকদিন আগেই সংসদে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সামনে বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে দাঁড়িয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের কাজের ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তারা নিজেদের কাজের ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো স্বীকার করেছেন এবং গুছিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দেখার বিষয় হলো, এই জবাবদিহির ধারাটি ভবিষ্যৎ দিনগুলোতেও ধরে রাখা যায় কি না।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমরা যে বাজেট করছি, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন— বাজেটের দর্শনে আমরা ‘মানবতার পক্ষে দাঁড়ানোর’ যে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, তা মাঠপর্যায়ে গিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এ প্রতিকূল পরিবেশের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সুফল কীভাবে প্রতিফলিত হবে, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে
আগামীর সময়: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে এই সরকারের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমান সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপগুলো কি এ সংকট কাটাতে সঠিক কোনো দিশা দেখাতে পেরেছে?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: আমরা বর্তমানে ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, তা আমরা জানি। আবার সরকার আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে চায়— তাও তারা বলছে। কিন্তু এই বর্তমান অবস্থা থেকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে ‘কীভাবে যাব’, সে পথটাই তারা পরিষ্কার করছে না। এই ‘কীভাবে যাব’র উত্তরটাই লুকিয়ে আছে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের (Reform) মধ্যে। যেমন: রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আনা হবে? সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে গুণগত মান ও দক্ষতা কীভাবে বাড়ানো হবে? শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মানোন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ কী? যেসব মেগা অবকাঠামো অর্ধেক হয়ে থমকে আছে, সেগুলো কীভাবে শেষ করা হবে? এ ছাড়া জ্বালানি, ব্যাংক খাত কিংবা বন্দর ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের সংস্কার করা হবে? অর্থমন্ত্রী যখন বলেন, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে ‘দুই বছর সময় লাগবে’, আমি তার এই সময়সীমার দাবি মেনে নিচ্ছি। কিন্তু উনি তো আমাকে বলছেন না যে, উনি ঠিক কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবেন? উনি কি হাঁটুর জোরে, কোমরের জোরে নাকি হাতের জোরে ঘুরে দাঁড়াবেন— সে সুনির্দিষ্ট কৌশল বা ফর্মুলা তো উনাকে বলতে হবে। সেই স্পষ্ট রূপরেখাটি আমি এখন পর্যন্ত বাজেটে বা সরকারের ১০০ দিনের পদক্ষেপে দেখতে পাচ্ছি না।
আগামীর সময়: বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে তিনটি দেশের সঙ্গে চুক্তি এবং সম্পদ জব্দের বিষয়টিকে টিআইবি ইতিবাচক বলছে। এ প্রক্রিয়ার আর্থিক সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হতে আসলে কত সময় লাগতে পারে?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: অন্য দেশ থেকে পাচার করা টাকা বা সম্পদ ফিরিয়ে আনা মোটেও সহজ কোনো কাজ নয়। এর পেছনে কয়েকটি বড় ধাপ রয়েছে। প্রথমে সম্পদ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হয়, তারপর দীর্ঘ আইনিপ্রক্রিয়া চালাতে হয়, এরপর সম্পদ জব্দ করে সেটিকে আবার নগদ অর্থে রূপান্তর করে দেশে ফিরিয়ে আনতে হয়। এখন শুধু মানুষগুলোই পলাতক নয়, তাদের পাচার করা টাকাও পলাতক। আর আমাদের শুধু ওই পাচার হওয়া নগদ টাকাটুকুই দরকার না; এই লুটেরারা ব্যাংক থেকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেয়নি, সে হিসাবটাও মেলাতে হবে। এটি অত্যন্ত জটিল একটি প্রশাসনিক, আন্তর্জাতিক এবং বহুপাক্ষিক প্রক্রিয়া। বড় বিষয় হলো, রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বর্তমান সরকারের ভেতরে, সংসদে কিংবা সমাজে যদি এই লুটেরারা আবারও কোনোভাবে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়ে যায়, তবে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনার এই পুরো কসরত বা চেষ্টার আর কোনো মূল্যই থাকবে না।
আগামীর সময়: আপনি জানেন, বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক নিয়ে একটি অস্থিরতা চলছে। একটি রাজনৈতিক মহল ব্যাংকের মালিকানার আচরণ করছে। অন্যটি হলো, আগের আমলের মতোই একজন গভর্নর বসিয়ে দিয়ে ব্যাংক দখলের পুরনো প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, এটি আসলে সেই পুরনো প্রক্রিয়ারই ধারাবাহিকতা এবং এর সঙ্গে এখন একটি রাজনৈতিক দল সরাসরি যুক্ত হয়ে যাচ্ছে— যা সত্যিই আশঙ্কাজনক। যেকোনো ব্যাংক, তা সে যে খাতেরই হোক না কেন, অবশ্যই আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’-এর নির্ধারিত নীতি-কাঠামোর ভেতরে পরিচালিত হতে হবে। যদি সেখানে কোনো সংকট সৃষ্টি হয়, তবে দেখতে হবে নীতি-কাঠামোর কোন জায়গাটিতে ব্যত্যয় বা বিচ্যুতি ঘটছে। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো দৃঢ় বা সুনির্দিষ্ট কাঠামোগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আজ একজনকে বসাচ্ছে, কাল তাকে তুলছে, অর্ধেক কথা বলছে— একটি অনিশ্চিত অবস্থা চলছে। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার পক্ষ থেকে একটি বড় ব্যাখ্যা দিয়েছেন; কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কাছ থেকে আমরা এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা শুনতে পাইনি। এমনকি অর্থমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও কোনো কার্যকর বক্তব্য আসেনি। এর একটি স্থায়ী ও প্রাতিষ্ঠানিক সমাধান প্রয়োজন। এখানে শুধু মালিকানার বা কোনো দলের বিষয় জড়িয়ে নেই, এর সঙ্গে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত জমা করা অর্থ জড়িয়ে রয়েছে। তাই এই ব্যাংকটি টিকবে কি টিকবে না; কিংবা কীভাবে চলবে— তা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরপেক্ষ নীতি-কাঠামো দিয়ে ঠিক করতে হবে। এটি শুধু সংসদে বিতর্ক করে রাজনৈতিক জয়লাভের বিষয় নয়। এর সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামোর অন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোও যুক্ত।
রাজস্ব আদায় না বাড়িয়ে আপনি কি টাকা ছেপে বেকার ভাতা দেবেন? টাকা ছাপালে তো মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হবে
আগামীর সময়: তাহলে দিনশেষে ব্যাংক খাতের সংস্কারের আসলে কী হলো? নাকি আমরা কোনো সংস্কার ছাড়াই পুরনো ভুলত্রুটিগুলো সঙ্গে নিয়ে এভাবেই সবকিছু চলতে দেখব?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: ক্ষমতাসীন দল যে নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো বা ইশতেহার দিয়েছিল, তাতে কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ‘সংস্কার কমিশন’ গঠনের কথা ছিল। বিশেষ করে ব্যাংক খাতের ভেতরে এই সংস্কার কমিশনের কথা বলা হয়েছিল। তাহলে এই ১০০ দিনের মধ্যে সেই বহুপ্রত্যাশিত ‘সংস্কার কমিটি’ কেন গঠিত হলো না? অর্থনীতিকে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বয়ান ছাড়া জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য করা যায় না। অতীতে একটি বয়ান তৈরি করা হয়েছিল—‘উন্নয়ন, উন্নয়ন এবং উন্নয়ন’। ঠিক একইভাবে এই নতুন সরকারকে এখন বলতে হবে— ‘কর্মসংস্থান, কর্মসংস্থান ও কর্মসংস্থান’ অথবা ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ’ কিংবা ‘মানবিক সমাজ’।
আগামীর সময়: আপনি যে বয়ানের কথা বললেন, তার একটা ইঙ্গিত তো ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কিংবা বেকার ভাতার মতো উদ্যোগগুলোর ভেতরে আমরা পাই। তা ছাড়া সরকার বলছে, তারা আগের মতো মেগা প্রজেক্ট করবে না (যদিও পরে পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় প্রকল্প নিয়েছে)।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: বাংলাদেশে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ যখন নতুন করে শ্রমের বাজারে আসছে, আপনি কি তাদের সবাইকে ফ্যামিলি কার্ড দিয়ে বসিয়ে রাখবেন? রাজস্ব আদায় না বাড়িয়ে আপনি কি টাকা ছেপে বেকার ভাতা দেবেন? টাকা ছাপালে তো মূল্যস্ফীতি আকাশচুম্বী হবে। এগুলো দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া গেলেও মূল অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হবে না। আপনাকে ব্যাংক খাতের সংস্কার করতে হবে, জ্বালানি খাতের সংস্কার করতে হবে, যাতে শিল্পকারখানাগুলো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ পায়। মূল মনোযোগটা সেখানেই দিতে হবে।
সরকার যে বলছে ‘আমরা মেগা প্রজেক্ট করব না’— এটি একটি অর্ধশিক্ষিত বা অপরিপক্ব কথা। যারা এটি বলছেন, তারা আসলে ‘মেগা’ শব্দটাও বোঝেননি, ‘প্রজেক্ট’ শব্দটাও বোঝেননি। ফ্যামিলি কার্ডের পরিধি যদি আমরা দেশ জুড়ে বিশাল আকারে করি, তবে সেটিও একটি মেগা প্রজেক্ট হতে পারে! পদ্মা ব্যারাজের মতো প্রকল্প যদি দেশের প্রয়োজনে লাগে, তবে তা অবশ্যই করতে হবে। আমি বলব, সরকারের ভেতরে এখনো কাজের কোনো সুনির্দিষ্ট সমন্বয় (Coordination) গড়ে ওঠেনি। আমি এখানে স্পষ্ট সমন্বয়ের অভাব দেখছি, একটি দূরদর্শী অর্থনৈতিক বয়ানের (Narrative) অভাব দেখছি এবং সর্বোপরি মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের ‘জীবন; এবং ব্যবসায়ীদের ‘বিনিয়োগের’ জন্য যে নিশ্চয়তা (Security) থাকা দরকার, তা এখনো দেখতে পাচ্ছি না।
আগামীর সময়: দেশে খুন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। পাশাপাশি ‘মব সহিংসতা’ বা গণপিটুনি এবং মাজার ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। আইনশৃঙ্খলার এই ‘উদ্বেগজনক’ চিত্র দেশের সামগ্রিক ব্যবসায়িক পরিবেশ, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কতটা বাধাগ্রস্ত করবে?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: যেকোনো দেশের সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আপনি যদি নিজের সম্পদের নিরাপত্তা না পান, আপনার ব্যবসার বা কলকারখানার শ্রমশক্তির নিরাপত্তা না পান, তবে অর্থনীতিতে কখনো স্থিতিশীলতা আসবে না; বরং সামাজিক অশান্তি বাড়তেই থাকবে। নারী, শিশু এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, হিজড়া জনগোষ্ঠী কিংবা নদীভাঙনে সর্বস্বান্ত হওয়া মানুষ— তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এই বিপন্ন মানুষদের রক্ষা করতে না পারি, তবে আমি সংস্কারের যে ‘পথরেখা’ বা রোডম্যাপের কথা বলছি— সে পথরেখায় কখনোই আলো জ্বলবে না, তা অন্ধকারেই রয়ে যাবে।
আগামীর সময়: আপনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের তুঙ্গস্পর্শী সময়ে এক টকশোতে বলেছিলেন— ‘আমাদের ইতিহাসের তাৎক্ষণিক পর্ব শেষ, উত্তরপর্ব হাজির হয়েছে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশ এখন এই দুই পর্বের মধ্যবর্তী একটি ‘কালপর্বে’ আছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আপনি কি মনে করেন, তাৎক্ষণিক পর্বটি আসলেই শেষ হয়েছে? নাকি এই কালপর্বের জটিলতা আরও প্রলম্বিত হবে?
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: এটি একটি চমৎকার প্রশ্ন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই বিখ্যাত লাইনের মতো বলতে হয়—‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। পুরনো যে অধ্যায়, সেটি পুরোপুরি শেষ হয়নি। আমি প্রত্যাশা করেছিলাম, এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হয়তো ‘কালপর্বের; সময়টার অবসান ঘটবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, সমাজ ও অর্থনীতিতে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অনিষ্পন্ন রয়ে গেছে। সংবিধান থেকে শুরু করে রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতি— যেসব ক্ষেত্রে আমরা স্থায়ী পরিবর্তন ও সংস্কারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চেয়েছিলাম, সেগুলো এখনো শেষ হয়নি। আর এই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারগুলো শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এ সংকটময় কালপর্বও শেষ হবে না। আমরা নাগরিকরা যদি চাপ সৃষ্টি করে রাজনীতিবিদদের এই সময়টাকে দ্রুত শেষ করতে বাধ্য না করি, তবে এর চূড়ান্ত খেসারত কিন্তু দিনশেষে আমাদেরই দিতে হবে। তবে এই কালপর্ব পার করার ক্ষেত্রে আরেকটি নতুন বৈশ্বিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে— বর্তমানে বিশ্বের বা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিবেশ আমাদের জন্য খুব একটা অনুকূলে নেই। ফলে চ্যালেঞ্জটা আরও বেড়ে গেছে। এই কালপর্বের সময়সীমা সংক্ষিপ্ত করতে হবে।