হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজারের তহবিলে কোনো অর্থই নেই! প্রতিদিন হাজারো ভক্ত-আশেকান নগদ অর্থ ও নজরানা নিয়ে হাজির হন দরগাহে। মনোবাসনা পূরণে কেউ অর্থ, কেউ স্বর্ণালংকার, কেউ আবার পশু দান করেন মাজারে। কিন্তু প্রতিদিনের এই দান যায় কোথায়? পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় জেলা প্রশাসনের তদন্তে কোনো হিসাব দিতে পারেনি মাজার কর্তৃপক্ষ। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন যে আয় হয় তা ভাগবাঁটোয়ারা হয়ে যায়। এখন আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখার জন্য একটি কমিটি করে দিয়েছে জেলা প্রশাসন।
জানা যায়, ‘হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা এবং হজরত শাহপরানের (রহ.) মাজার উন্নয়ন ও সংস্কার’ শীর্ষক মোট ৩৪.৬ কোটি টাকা (জিওবি ২৯.৬ কোটি এবং নিজস্ব অর্থায়ন ৫ কোটি) প্রাক্কলিত ব্যয়ে এপ্রিল ২০২৩ থেকে জুন ২০২৭ মেয়াদে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। শর্ত অনুযায়ী নিজস্ব অর্থায়নের মধ্যে সিটি করপোরেশন ৩ কোটি এবং বাকি ২ কোটি টাকা মাজারের তহবিল থেকে ব্যয়ের কথা রয়েছে। কিন্তু গত ২৯ এপ্রিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পিইসি’র বৈঠকে প্রকল্প পরিচালক জানান, এ পর্যন্ত সিটি করপোরেশন থেকে ৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। মাজারের কোনো অর্থ পাওয়া যায়নি, ফলে অবশিষ্ট ২ কোটি টাকাও প্রকল্পটি সমাপ্ত করার স্বার্থে সিটি করপোরেশন থেকেই বহন করা হবে।
সভার সভাপতি ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া সিলেট সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের কাছে মাজারের আয় ও অর্থের ব্যবস্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য সভায় উপস্থাপনের অনুরোধ জানান। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে তা উপস্থাপন করা সম্ভব না হওয়ায় মাজারের আয়ের বিবরণ ডিপিপিতে সংযুক্তির নির্দেশনা দেন।
এ নিয়ে তদন্তে নামে জেলা প্রশাসন। গত ১০ জুন দুই মাজার কর্তৃপক্ষ ও ওয়াকফ এস্টেটের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠকে বসেন জেলা প্রশাসক। কিন্তু সেই বৈঠকে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজার কর্তৃপক্ষ আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব উপস্থাপন করতে পারেননি।
শুক্রবার সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, ‘মাজারের ৩৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারের ৩০ কোটি, বাকি টাকা মাজারের তহবিল থেকে দেওয়ার কথা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখার নির্দেশনা দিয়েছে। সেই অনুযায়ী মাজার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি সভা হয়। কিন্তু সেখানে তারা কোনো আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে পারেননি।’ দিনে যে পরিমাণ অর্থ এবং অন্যান্য জিনিসপত্র ভক্তরা দান করেন, তার সবটুকুই ভাগবাঁটোয়ারা করে খেয়ে ফেলেন মাজারসংশ্লিষ্টরা। এটা হতে পারে না। এটা পাবলিক প্রপার্টি, এর আয়-ব্যয়ের হিসাব থাকতে হবে। তাই আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট এবং মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে হিসাব সংরক্ষণ করবে। এই সময়ের মধ্যে আয়-ব্যয়ের সঠিক চিত্র, দানের উৎস, ব্যয়ের খাত এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হবে।’
তবে প্রশাসনের এই উদ্যোগে বিস্মিত হয়েছেন মাজার কর্তৃপক্ষ। শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান বলেন, ‘প্রশাসন কেন হঠাৎ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাননি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের হিসাবপত্র রয়েছে, তবে সেগুলো উপস্থাপনের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ পাইনি। তাই কিছু বিষয়ে অসঙ্গতি বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। তবে আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’ তবে যুগান্তরের হাতে আসা ভাগবাঁটোয়ারার হিসাবে দেখা গেছে, সিলেটের ওলিকুল শিরোমণি হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দীর্ঘ ৭শ বছরের ঐতিহ্যে ভক্তদের দেওয়া অর্থ, স্বর্ণালকার ও অন্যান্য সামগ্রী তোলার জন্য দায়িত্ব বণ্টন চালু রয়েছে। বছরের ৩৬৫ দিনই সুনির্দিষ্ট খাদেমদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা রয়েছে। তবে এই বণ্টনে ব্যাপক বৈষম্য ও আধিপত্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। দেখা গেছে, বছরে ৩৬৫ দিনের মধ্যে ১২২ দিনই মাজারের অর্থ ও নজরানা তোলেন সরেকওম ইউসুফ আমান উল্লাহ। এছাড়া অন্যান্যের মধ্যে ৬০ দিন তোলেন সরেকওম মুহাম্মদ ইয়াহইয়া, হিরা মিয়া ৩৫ দিন, তারিন মজুমদার ৩৪ দিন ও সৈয়দ বাড়ি ৩৪ দিন, মজুমদার আব্দুল মুত্তালিব ৩০ দিন, মুফতি শাহেদ ২৫ দিন, মুফতি আব্দুল গণি ১২ দিন, মুফতি মাহমুদ ৬ দিন ও মুফতি মুজাফফর ৫ দিন নগদ অর্থ ও নজরানা তোলেন।