Image description

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অবসান ঘটাতে চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং সেই চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচি।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সম্ভাব্য চুক্তির আওতায় ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়ও রয়েছে। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পরবর্তী সময়ে শুরু হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাও চুক্তির কিছু বিষয় নিশ্চিত করেছেন। তাদের মতে, তেহরান চুক্তির শর্ত পূরণ করলে তবেই ইরান অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধের সূচনা হয়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। একই সঙ্গে বিশ্বের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান।

এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেছে। চলতি সপ্তাহেও দুই দফা পাল্টাপাল্টি হামলা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার বলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নির্ধারিত হামলা বাতিল করেছেন, কারণ আলোচকরা ‘একটি দারুণ সমঝোতায়’ পৌঁছেছেন এবং খুব শিগগিরই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হতে পারে।

শুক্রবার ইরানি গণমাধ্যমে কথিত ১৪ দফা চুক্তির কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়। তবে ট্রাম্প দাবি করেন, প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে প্রকৃত সমঝোতার কোনো সম্পর্ক নেই এবং সেগুলো সত্যের প্রতিফলন নয়।

এর কয়েক ঘণ্টা পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে ঐকমত্য হয়েছে এবং এখন শুধু চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা।

চলমান আলোচনায় ইসরায়েল সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। এই আলোচনা যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর পথ তৈরি করবে।

দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা চালানোর অভিযোগ করে আসছে। তবে তেহরান বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গবেষণার মতো শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে।

শুক্রবার সাংবাদিকদের সঙ্গে বিস্তারিত ব্রিফিংয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ চলাচলের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করবে এবং এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে।

তাদের মতে, এসব পদক্ষেপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর হবে। এরপর ৬০ দিনের একটি আলোচনা পর্ব শুরু হবে, যার মূল বিষয় হবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে বিবেচিত এই ইউরেনিয়াম দেশটির ভেতরেই ধ্বংস করা হবে এবং পরে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। তবে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে প্রক্রিয়া এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

অর্থনৈতিক বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, কোনো অর্থ আগাম দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে তারা ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনের বিরোধিতা করেছেন, যেখানে দাবি করা হয়েছিল বড় ধরনের আলোচনার আগেই ইরানের কিছু জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া হবে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ধাপে ধাপে ইরানকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে পুনঃঅন্তর্ভুক্ত করা হবে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ সম্পদ মুক্ত করার মতো পদক্ষেপও পর্যায়ক্রমে নেওয়া হবে।

চুক্তির আওতায় ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে তার মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এর মধ্যে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং অঞ্চলের অন্যান্য ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন, এই সমঝোতা পারস্পরিক আস্থা বা প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং ‘কার্যকর বাস্তবায়নের’ ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, ইরান যে পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পরই দেশটি অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।

যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, পাকিস্তান এবং মধ্যস্থতাকারী আরেক দেশ কাতারের পক্ষ থেকে সতর্ক আশাবাদ প্রকাশ করা হলেও চুক্তি চূড়ান্ত হতে এখনো কিছুটা পথ বাকি রয়েছে। গত কয়েক মাসে এমন কয়েকটি সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ মুহূর্তে তা ভেস্তে গেছে।

তবে এবার পার্থক্য হলো, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আগের চেয়ে বেশি আশাবাদী এবং চুক্তির বিষয়বস্তু সম্পর্কেও তুলনামূলক বেশি খোলামেলা অবস্থান নিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেন, ‘আলোচনার শেষ ধাপ সম্পন্ন হলেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা হতে পারে। আমি অত্যন্ত আশাবাদী।’

তিনি আরও বলেন, সমঝোতা স্মারকের প্রথম বিষয়ই হলো ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।

হরমুজ প্রণালি প্রসঙ্গে আরাঘচি বলেন, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহন হওয়া এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ব্যবস্থাপনা ‘আগের মতো থাকবে না’। প্রণালি বন্ধ করার পর থেকে ইরান সেখানে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি আদায়ের দাবি করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, সব জাহাজের জন্য এই পথ উন্মুক্ত ও অবাধ থাকা উচিত।

ইরানের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরও জানান, সমঝোতা স্মারকে ইসরায়েল ও লেবাননের হিজবুল্লাহর মধ্যকার সংঘাত বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আগের কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লেবাননের বিষয়টি এই চুক্তির অংশ নাও হতে পারে। তবে ইরান এটি অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে জোর দিয়েছে বলে জানা গেছে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, উত্তর ইসরায়েলে হামলা অব্যাহত থাকলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাবে তার দেশ।

সূত্র: বিবিসি