সুন্দরবনের নিরাপত্তায় দস্যুতা দমনে অন্যতম বড় বাধা হিসাবে ‘ভুক্তভোগীদের নীরবতা’কে দায়ী করছে কোস্ট গার্ড। তাদের মতে, অনেক জেলে অপহরণ বা মুক্তিপণের শিকার হলেও ভয়ে বিষয়টি জানান না। প্রশাসনের দেওয়া বিভিন্ন নম্বরে সহজেই অভিযোগ করা বা তথ্য জানানোর সুযোগ থাকলেও আগ্রহী নন বেশির ভাগ ভুক্তভোগী। এই যোগাযোগ ঘাটতির সুযোগ নেয় দস্যুরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু এলাকায় জেলেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বলেও জানা গেছে। ফলে ওইসব এলাকায় শক্তভাবে দস্যুদের মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে।
শুক্রবার বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পশ্চিম জোনের জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম এই চ্যালেঞ্জের কথা জানান।
বিষয়টি যাচাইয়ে সরেজমিন শুক্রবার বিকালে সুন্দরবনের কটকা এলাকায় গিয়ে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে যুগান্তর। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘দস্যুদের আক্রমণে খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি না হলে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা কোস্ট গার্ডকে জানাই না। কারণ তথ্য দিলে বা অভিযোগ করলে প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে আরও বেপরোয়াভাবে হামলা করে দস্যুরা।’
সেখানে এক জেলে যুগান্তরকে জানান, বৃহস্পতিবার রাতে কটকার নিকটবর্তী এলাকায় জেলেদের নৌকায় হামলা চালিয়েছে ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’ নামে একটি দস্যু দল। তবে এ ঘটনা তিনি জানতে পেরেও ভয়ে কোস্ট গার্ডকে খবর দেননি। আক্রান্ত জেলেরা অভিযোগ করেছেন কিনা তা জানাতে পারেননি তিনি।
তবে বৃহস্পতিবার এই এলাকা থেকে দস্যুতার অভিযোগ পায়নি বলে জানিয়েছে কোস্ট গার্ড। বাহিনীটির গোয়েন্দা শাখার একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আমরা আমাদের সোর্স থেকে পাওয়া তথ্যে এই এলাকা থেকে বিভিন্ন সময় জড়িতদের গ্রেফতার করেছি। এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সঙ্গে মিশে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় আছে। ফলে অধিকাংশ সময়ই কেউ মুখ খুলতে চান না।
এর আগে জোনাল কমান্ডার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ মেসবাউল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনে ইলিশ ধরার মৌসুম, মাছ আহরণ মৌসুম এবং মধু সংগ্রহের সময় দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যায়। এই সময়গুলোতে বিপুলসংখ্যক জেলে, মৌয়াল ও বনজীবী সুন্দরবনে প্রবেশ করেন। তাদের লক্ষ্য করেই অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও চাঁদাবাজির পরিকল্পনা করে দস্যুরা। বর্তমানে সরকার ঘোষিত তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় বনজীবীদের প্রবেশ সীমিত রয়েছে। ফলে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও কমে এসেছে। মৌসুম শুরু হলে দস্যুরা আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করে। তবে কোস্ট গার্ডের তৎপরতার কারণে দস্যুরা এখন আগের মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। তাদের চলাচল, অস্ত্র সরবরাহ, অর্থ সংগ্রহ এবং সংগঠন পরিচালনার সক্ষমতা কমে এসেছে।
ক্যাপ্টেন মেসবাউল ইসলাম বলেন, এই চাপের মুখেই সুন্দরবনের কুখ্যাত ‘ছোট সুমন বাহিনী’র প্রধান সুমন হাওলাদার ও তার সহযোগীরা ১৭ মে কোস্ট গার্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আত্মসমর্পণের পর অনেকেই কর্মসংস্থানের সুযোগ পান না। সমাজও তাদের সহজভাবে গ্রহণ করতে চায় না। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার অভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং মানসিক সমস্যার কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধের পথে ফিরে যায়।
কোস্ট গার্ড জানায়, বর্তমানে সুন্দরবনে ছয় থেকে আটটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। প্রতিটি বাহিনীতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ কিংবা ১২ জন সদস্য থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বড় বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দল থেকে ছোট ছোট উপদল বা ‘ক্লোন’ বাহিনী তৈরি হয়। এসব বাহিনী মূলত জেলে ও মৌয়ালদের লক্ষ্য করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।
ক্যাপ্টেন মেসবাউল ইসলাম বলেন, বনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য সরু খাল ও ন্যারো চ্যানেলকে আত্মগোপনের স্থান হিসাবে ব্যবহার করে দস্যুরা। জোয়ারের সময় যেসব পথে নৌকা চলাচল করে, ভাটার সময় সেগুলোর অনেক অংশ শুকিয়ে যায়। ফলে বড় বোট বা জাহাজ নিয়ে সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব হয় না। তবে বর্তমানে ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব দুর্গম এলাকাও নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
এছাড়া অপহরণের ঘটনা বনের ভেতরে ঘটলেও মুক্তিপণের টাকা অনেক সময় মোংলা, বরগুনা, পাথরঘাটা কিংবা খুলনা শহরের বিভিন্ন এলাকায় হাতবদল হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কোস্ট গার্ড কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন মেসবাউল ইসলাম বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে পাঠানো মুক্তিপণের অর্থের গতিপথ অনুসরণ করে একাধিক সহযোগীকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা হয়েছে। বনের ভেতরের দস্যুদের পাশাপাশি স্থলভাগে থাকা সহযোগী চক্রের বিরুদ্ধেও নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। এই সহযোগী চক্রের ইন্ধনেই মোংলায় জয়মনিঘোল এলাকায় কোস্ট গার্ডের হারবারিয়া স্টেশনে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
কোস্ট গার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে পরিচালিত অভিযানে ৪২টি দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১০ রাউন্ড তাজা গোলা, ২৫০ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, ৯৩ রাউন্ড ফাঁকা কার্তুজ, ১৯৪ রাউন্ড এয়ারগানের গুলি, একটি ককটেল, একটি টেলিস্কোপ এবং দুটি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে ৩৯ জন বনদস্যু ও জলদস্যুকে আটক করা হয়েছে। তাদের কবল থেকে ৪১ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
ক্যাপ্টেন মেসবাউল আরও বলেন, দেশের সমুদ্রসীমা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং নদী তীরবর্তী সীমান্ত এলাকায় অবৈধ অনুপ্রবেশ ও অপরাধ দমনে কোস্ট গার্ড সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সাতক্ষীরার মান্দারবাড়ি দিয়ে আগে পুশইনের ঘটনা ঘটায় সেখানেও সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি, আধুনিক ড্রোন ও সার্ভিলেন্স প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বিশেষ ও যৌথ অভিযান পরিচালনা করছে।