Image description

বিষ দিয়ে মাছ শিকার, শিল্প দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য, বন্যপ্রাণী পাচার, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমুখী চাপে অস্তিত্ব সংকটে সুন্দরবন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড বর্তমানে বনটির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনের নদী ও খালগুলোতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে যেমন বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যাচ্ছে, তেমনি মাছের পোনা ধ্বংস হওয়ায় প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। বিষাক্ত পানি ও মাছের প্রভাবে বনের বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীর স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

 

সুন্দরবনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ঘোষিত ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়াতে (ইসিএ) গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পশুর নদীতে গিয়ে পড়ছে। জোয়ার-ভাটার মাধ্যমে এসব দূষিত উপাদান বনের ভেতরে প্রবেশ করে জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।

 

প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণও উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। সম্প্রতি পরিচালিত এক গবেষণায় সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলা, পশুর ও রূপসা নদীর ১৭ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষ করে হরিণা চিংড়িতে এর পরিমাণ বেশি পাওয়া গেছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

 

 

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

 

 

এদিকে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্রের মাধ্যমে বাঘসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পাচার অব্যাহত রয়েছে। গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন সোসাইটির (ডব্লিউসিএস) তথ্যমতে, বন্যপ্রাণী অপরাধের মাত্র ৩০ শতাংশ ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় এবং মামলার নিষ্পত্তিতেও দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়।

 

সুন্দরবনের প্রায় ৫৫ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হলেও সেখানে অবৈধভাবে মাছ শিকার অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ আহরণ চলছে।

 

নদীপথে তেল, কয়লা, সার ও ক্লিংকারবাহী জাহাজডুবির ঘটনাও বারবার ঘটছে। এ ছাড়া নৌযানের শব্দ ও ঢেউয়ের কারণে বন্যপ্রাণীর বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। নদীভাঙনের ফলে গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এবং ডলফিনের অভয়ারণ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা বাড়ায় সুন্দরবনের অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা আরও বেড়েছে।

 

 

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

 

 

অন্যদিকে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনের দাবি, কেন্দ্রটির কারণে পশুর নদীতে ভারী ধাতুর দূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।

 

জাতিসংঘের আইইউসিএন-এর তথ্যমতে, সুন্দরবনের মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, ভোঁদড়, শকুন ও কচ্ছপ। বিপন্ন প্রাণীর মধ্যে রয়েছে বানর, মেছোবিড়াল ও উদবিড়াল। এছাড়া বনবিড়াল, বাগদাশ, ইরাবতী ডলফিন ও শুশুক সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত।

 

সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডও বড় উদ্বেগের কারণ। গত ২২ বছরে বনে ২৭ বার আগুন লেগে প্রায় ৭০ একর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, অসাধু চক্রের যোগসাজশে এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

 

 

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

 

 

‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র কেন্দ্রীয় প্রধান সমন্বয়কারী মো. নুর আলম শেখ বলেন, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বন্যপ্রাণী পাচার, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শিল্প দূষণ, প্লাস্টিক দূষণ, অভয়ারণ্যে অবৈধ মৎস্য আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সব মিলিয়ে সুন্দরবনের অস্তিত্ব আজ চরম হুমকির মুখে।

 

ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পায়নের ফলে সুন্দরবনের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ কারণেই ইউনেস্কোর বিজ্ঞানী ও পরিদর্শক দল সুন্দরবনকে বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।

 

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বন অপরাধ দমনে টহল ও ড্রোন নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে বিষ প্রয়োগ ও হরিণ শিকার কমেছে। চলতি শুষ্ক মৌসুমে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি। প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণও অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।

 

পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার বিভাগীয় উপপরিচালক শরীফুল ইসলাম বলেন, মোংলা এলাকার শিল্পকারখানাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় রয়েছে। বায়ু ও পানি দূষণ রোধে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ এবং নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।

 

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, বন বিভাগ নিয়মিত টহল ও ড্রোন নজরদারি বাড়িয়েছে। বন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সুন্দরবনের সুরক্ষা, বননির্ভর মানুষের জীবিকা এবং বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।

 

 

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

 

 

 

তিনি আরও বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশের গর্ব, দেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাবলয় এবং বিশ্ব ঐতিহ্যের এক অনন্য সম্পদ। এ বন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই সুন্দরবন রক্ষায় সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

 

তিনি বলেন, বন অপরাধ, বন্যপ্রাণী শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং বনভূমি ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সুন্দরবনের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, জনসচেতনতা তৈরি এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে বন সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।

 

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সুন্দরবনের প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে বনায়ন, খাল পুনঃখনন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বননির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ সুন্দরবন রেখে যেতে সরকার বদ্ধপরিকর।