Image description

সংকট সামলাতে গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বাজেটের আকার কমিয়ে ধরা হয়েছিল। সে সময় প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বছরজুড়ে চলে ব্যয়সংকোচন। ফলস্বরূপ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে তৈরি হয় চরম স্থবিরতা। রাজস্ব আদায়ে সৃষ্টি হয়েছে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে বেশি ব্যয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী পরিকল্পনা নিয়ে বিএনপি সরকার ঘোষণা করেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। এ মুহূর্তে সরকারের ওপর সবচেয়ে বড় চাপ হলো আর্থিক সংকট। এর সঙ্গে রয়েছে নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের চাপ। এ ছাড়া বৈশ্বিক চাপ এতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এতসব চাপ নিয়ে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, সংস্কার ও সবার জন্য উন্নয়ন লক্ষ্য সামনে রেখে নতুন বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। যার মোট আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বাজেটের তুলনায় যা প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বিএনপি সরকারকে সাড়ে তিন মাসের মাথায় দিতে হয় এ বাজেট। প্রস্তাবিত বাজেটে বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে টেনে তোলার কঠিন এক চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এতে রেকর্ড পরিমাণ ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে। আবার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। অবশ্য আরও ১৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বরাদ্দ রয়েছে এডিপিবহির্ভূত।

ঘোষিত এ বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন। সরকারের একমাত্র আয়ের বড় খাত হলো এনবিআর। প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। যা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। কেননা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি। গত ৯ মাসে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তবু এই এক লক্ষ্য নির্ধারণ করে যেন এক বিলাসী স্বপ্ন দেখছে সরকার।

এর আগে সর্বশেষ ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে বাজেট উপস্থাপন করেছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। যেটা ছিল ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার। সেই হিসাবে এবারের বাজেট প্রায় ১৩ গুণ বড়। অবশ্য সে সময় ১ মার্কিন ডলারের দাম ছিল ৬৮ টাকা। এখন তা ১২২ টাকা। ১ কেজি চালের দাম ছিল মানভেদে ১৬-২২ টাকা। এখন ১ কেজি মোটা চালের দাম ৫৬-৬০ টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে এজন্য উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সামলে উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করার টার্গেট নেওয়া হয়েছে। এজন্য কর্মসংস্থান, বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা হয়েছে। একদিকে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হয়েছে। তবে অতি ধনীদের সম্পদের ওপর সম্পদ করারোপের চিন্তা থেকে সরে এসেছে সরকার। এ ছাড়া বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদার করার সুযোগ রাখা হয়েছে এবার। যুক্ত হয়েছে অর্থনীতির নতুন ধারণা সৃজনশীল অর্থনীতি। এ ধারণার মাধ্যমে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার আওতা ও বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায়’ শিরোনামের এ বাজেট গতকাল সংসদে উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এর আগে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ বাজেট অনুমোদন করেন। পরে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অর্থবিলে স্বাক্ষর করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে অর্থমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে বেলা ৩টায় অধিবেশন শুরু হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট ২০২৬-২৭ উপস্থাপন শুরু করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ সরকারি দল, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যরা অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি গ্যালারিতে বসে বাজেট অধিবেশন প্রত্যক্ষ করেন। এ ছাড়া তিন বাহিনীর প্রধান, ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সরকারি ও বেসরকারি খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বৈশ্বিক চাপ সামাল দেওয়া, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, আর্থিক খাতের সংস্কার, রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশল, সুষম উন্নয়ন, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় নজর দেওয়া হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাজেট ঘোষণায় অভিষেক ঘটল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের অভিষেক হলো বাজেট দেওয়ার ক্ষেত্রে। এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বাজেট। তবে বিএনপি সরকারের দেওয়া এটি ১৭তম বাজেট। চলতি বছর রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল ব্যয়ের বাজেট ঘোষণা করেছে বিএনপি।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেছেন, অতীতের ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধির ধারা থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার সময় এসেছে। টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতিকৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার এবং বিনিয়োগ প্রবাহ সচল রাখতে সরকারের মধ্যমেয়াদি কৌশলের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। এ খাতে জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা হবে।  আর্থিক খাতের সংস্কার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো হবে। মূল্যস্ফীতির বিবেচনায় করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে। আগামী অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। নারী করদাতাদের ক্ষেত্রে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা, তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধীদের ৫ লাখ টাকা, গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। বাজেটের রাজস্ব কাঠামোতে বেশ কিছু খাতে ছাড় দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু খাতে নতুন কর আরোপ করা হয়েছে। নতুন করদাতা খোঁজার জোর তৎপরতাও দেখা গেছে। ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতা বাড়ানো হয়েছে। কৃষি কার্ড, ফ্যামিলি কার্ডে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রবৃদ্ধি ৬.৫, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশ : বাজেটের খসড়া নথির তথ্যমতে, আসন্ন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছিল। অবশ্য বিশ্বব্যাংক বলছে, এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৫ শতাংশের কম। এমনকি বৈশ্বিক অচলাবস্থা এবং ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকার চলমান সংঘাতের ফলে আগামী বছরও বিশ্ব অর্থনীতিতে ধীর গতি চলমান থাকবে। তবুও বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকার উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জনের এক উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থ আসবে যেখান থেকে : বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারের রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে থাকছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগামী অর্থবছরে এনবিআরের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং কাস্টমস শুল্ক থেকেই এই অর্থের সিংহভাগ আসবে। এ ছাড়া এনবিআরবহির্ভূত কর রাজস্ব থেকে ৫১ হাজার কোটি টাকা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা, ফি, লভ্যাংশ ও অন্যান্য উৎস থেকে করবহির্ভূত রাজস্ব হিসাবে আরও ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে রাজস্ব আয় দিয়েও পুরো বাজেটের ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ঘাটতি পূরণে বিদেশি ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।

খরচ হবে যেভাবে : বাজেটের ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যয় পরিচালন খাতে। আগামী অর্থবছর পরিচালন ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও সংশ্লিষ্ট খাতে ৩ লাখ কোটি টাকা এবং অন্যান্য উন্নয়ন ব্যয়ে ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বরাবরের মতোই অন্যতম বড় খাত হিসেবে থাকছে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। এ অর্থ থেকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, কর্মসংস্থান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

এরপরই বাজেটের অন্যতম বড় ব্যয় হচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে আগামী অর্থবছরে ব্যয় হবে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ খাতে হাসপাতাল, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগসহ বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য রাখা হয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা। সড়ক, সেতু, মহাসড়ক ও অন্যান্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে এই অর্থ ব্যয় হবে। কৃষি, খাদ্য ও মৎস্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা। কৃষক কার্ড, কৃষি ভর্তুকি এবং খাদ্যনিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক, সেতু, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়নে এ অর্থ ব্যবহার করা হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা। পানিসম্পদ খাতে খাল খনন, নদী পুনরুদ্ধার এবং বন্যা ব্যবস্থাপনার জন্য রাখা হয়েছে ১০ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা।

বাজেটের ঘাটতি অর্থায়ন : এবারও রেকর্ড পরিমাণ বাজেট ঘাটতি নিয়ে নতুন অর্থবছর শুরু করতে হচ্ছে নির্বাচিত সরকারকে। বাজেটের মোট ব্যয়ের বাকি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এই ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত খাতের পাশাপাশি বৈদেশিক উৎসের প্রতি নির্ভরশীল থাকতে হবে। এর মধ্যে সরকার বছরজুড়ে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে নেওয়া হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী বছরের ঘাটতির বাকি ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে বৈদেশিক উৎস থেকে। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছর বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।

ভর্তুকি-প্রণোদনা ও নগদ সহায়তা : প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যুৎ (৩৭ হাজার), গ্যাস (৬.৫ হাজার) ও সার (২৭ হাজার) ভর্তুকি বাবদ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার ফলে উদ্ভূত বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ, এলএনজি ও কৃষি ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত বরাদ্দের প্রয়োজন হবে। বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে ওএমএস, টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা হবে। সার্বিকভাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভর্তুকি ও প্রণোদনা এবং নগদ ঋণ বাবদ ১,১৭,১২৫ কোটি টাকা (জিডিপির ১.৭১ শতাংশ) বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এরম মাধ্যমে বেসরকারি খাতের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আওতায় অর্থায়নের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষত : বিশ্বব্যাংক এখাতে অর্থায়নে আগ্রহী। এ খাতের সার্বিক উন্নয়নে সরকার ফ্যাসিলিটেটরের ভূমিকা পালন করতে পারে।

সামাজিক সুরক্ষায় রেকর্ড বরাদ্দ : সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় ৪১ লাখ নারীকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান, প্রতিবন্ধী ভাতা বৃদ্ধি, মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

ফ্যামিলি কার্ড-কৃষক কার্ড : নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী অধিক সংখ্যক মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার ছাতার নিচে আনতে সরকার এর আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে এর অধীনে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কর্মসূচির বাস্তবায়ন শুরু করেছে। যা বিএনপি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ। এ খাতের অধীনে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া এ খাতের আওতার সঙ্গে বাড়ানো হবে উপকারভোগীর সংখ্যাও।

বাজেটের ১০ অগ্রাধিকার : প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সবার জন্য উন্নয়ন, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনীতি, ব্যবসা সহজীকরণ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে সর্বোচ্চ বরাদ্দ বৃদ্ধি : মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। বাজেট বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক অবকাঠামো খাতে এই বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়ক হবে।

তরুণদের কর্মসংস্থানে বিশেষ গুরুত্ব : তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে বাজার-চাহিদাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কারিগরি শিক্ষা এবং স্টার্টআপ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে স্টার্টআপের টার্নওভার ট্যাক্স শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ৫০০ কোটি টাকার একটি স্টার্টআপ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বড় স্বস্তি : প্রস্তাবিত বাজেটে সব ধরনের ফ্রিল্যান্সিং আয়ের ওপর কর অব্যাহতির সুবিধা সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের সেবার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বৈদেশিক আয় দেশে আনলেই এ সুবিধা পাওয়া যাবে।

আইটি ও ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসার : আগামী পাঁচ বছরে জিডিপিতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অবদান ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫জি সেবা সম্প্রসারণ, উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ উদ্যোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ গড়ার উদ্যোগ : ব্যবসা সহজীকরণে অনলাইনভিত্তিক ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ সেবা চালু, কোম্পানি নিবন্ধন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন, ঝুঁকি-ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় কর অডিট এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে কর হ্রাসের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়াতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার পৃথক তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায়, প্রস্তাবিত এই বাজেটকে ‘চিন্তাশীল বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তবে তিনি মনে করেন, বাজেটের নীতিগত কাঠামো শক্তিশালী হলেও তা বাস্তবায়নের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল।