সব মানুষকে সুবিধা দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। ‘মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ এই বাজেটে সবার জন্যই সুযোগ রাখা হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন। দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই বাজেট অভ্যুত্থান পরবর্তী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট। বরাবরের মতোই বড় ঘাটতি রেখে এবারও বাজেটের আকার বাড়ানো হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা প্রস্তাবিত বাজেটকে চিন্তাশীল বাজেট আখ্যা দিয়ে বাস্তবায়নকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন প্রস্তাবিত বাজেট ব্যবসাবান্ধব, লক্ষ্য পূরণে বাস্তবায়নে জোর দিতে হবে। বৃহস্পতিবার বিকালে শুরু হওয়া সংসদ অধিবেশনে প্রায় সোয়া পাঁচ ঘণ্টা ধরে নিজের প্রথম বাজেট বক্তব্য উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী।
২০২৪ সালে ৫ই আগস্ট ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের পর ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব নেয়া সরকার জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণ ও জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফেরাতে বাজেটে কর ছাড়, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভর্তুকি সহ জনতুষ্টিমূলক বিষয়ে ব্যাপক জোর দিয়েছে বাজেটে।
বাজেটে কর ও শুল্ক কাঠামো এমনভাবে সাজানোর হয়েছে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিল্পের কাঁচামাল, চিকিৎসা সামগ্রী, প্রযুক্তিপণ্য ও পরিবেশবান্ধব খাতে খরচ কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ও বিলাসী পণ্যে করভার বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। বাজেটে বিএনপি সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রতিফলন দেখা গেছে। এতে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপকে জনতুষ্টিমূলক বলছেন বিশ্লেষকরা। এতে দেশের মানুষ অনেকটা স্বস্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপি’র ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতির বড় অংশই অভ্যন্তরীণ উৎস ব্যাংক থেকে মেটানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। ফলে অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জনতুষ্টির বাজেটের মূল লক্ষ্য থাকে সাধারণ মানুষকে সন্তুষ্ট করা, করের বোঝা না বাড়িয়ে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও ভর্তুকি বাড়ানো এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা গেছে। তাই কাগজে-কলমে জনতুষ্টির এই মহাপরিকল্পনা সাজানো হলেও এর বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পড়েবে সরকার। বাজেটে কালো টাকা বিনা প্রশ্নে বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়েছে। মেগা এই বাজেটে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিশাল ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের চাপ বৃদ্ধি এবং কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামল এবং চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতার শুরুতেই বলেন, সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যই রাজনীতি ও অর্থনীতির পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে আমরা জাতীয় বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে কেবলমাত্র সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ না, বরং আমাদের দেশকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের অমিত অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপায়ণের পথ-নকশার অংশ হিসেবে বাজেট উপস্থাপন করছি। আমাদের প্রস্তাবিত বাজেট হবে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও মর্যাদাশীল জীবন নিশ্চিতকরণে সরকারের অভিপ্রায়ের একটি প্রতিফলন। সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষকে স্বস্তি দিতে বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও করছাড়ের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। ঘোষণা দেয়া হয়েছে জুলাই থেকে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর।
বাজেটে দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর একটি বড় জনমুখী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের শুল্ক ও কর অব্যাহতি সুবিধাও বেড়েছে। দেশীয় শিল্প রক্ষায় আমদানি নিরুৎসাহিত করার নানা পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কর্মজীবী মায়েদের কর্মক্ষেত্রে নিশ্চিন্তে কাজ করার পরিবেশ তৈরিতে বড় উদ্যোগ রয়েছে বাজেটে। দুই ধাপে দেশে আরও ৮০টি আধুনিক দিবাযত্ন কেন্দ্র (ডে-কেয়ার সেন্টার) স্থাপন করা হবে। বয়স্ক, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) ব্যক্তিদের ভাতার পরিমাণ ও সুবিধাভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে সরকার। চলতি বাজেটে এ কর্মসূচি আরও এগিয়ে নিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কৃষক কার্ডে বরাদ্দ ১ হাজার ৬২ কোটি; পাবে সাড়ে ৪২ লাখ কৃষক। বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে।
অর্থ মন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রতিটি নাগরিক পাবেন ‘ই-হেলথ কার্ড’, ইউনিয়নে আধুনিক স্বাস্থ্য ইউনিট। দেশের প্রত্যেক নাগরিককে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেমের অধীনে একটি করে আধুনিক ই-হেলথ কার্ড প্রদান করা হবে।
দেশে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের (সিনিয়র সিটিজেন) ট্রেন ভ্রমণে লাগবে না এমন ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
একদিকে করছাড় ও শুল্ক কমানোর ঘোষণা, অন্যদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা আদায়ের বড় লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বর্তমান মন্থর শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি পরিস্থিতির মধ্যে কোনো বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এই বিশাল রাজস্ব আদায় কঠিন।
আয় ও ব্যয়ের এই বিশাল ব্যবধানের কারণে আগামী অর্থবছরে মোট বাজেট ঘাটতি গিয়ে ঠেকেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকায়, যা জিডিপি’র ৩.৬ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভর করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, মোট ঘাটতির মধ্যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এবং ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস থেকে নেয়া হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে আরও ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ধরা হয়েছে বাজেটে।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে ব্যাপকভাবে ঋণ গ্রহণের কারণে দেশের ঋণ পরিশোধ ও সুদ পরিশোধ বাবদ ব্যয় অত্যধিক পরিমাণে বেড়েছে। তাই বাজেট ঘাটতিও বেড়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপি’র ১০.২ শতাংশ। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য উৎস থেকে ৯১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করার প্রস্তাব আছে।
বাজেট নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়ায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটের নীতিগত কাঠামো শক্তিশালী হলেও তা বাস্তবায়নের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল। গতকাল বিকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বিকাল ৩টায় কালো রংয়ের ব্রিফকেস হাতে বাজেট ঘোষণা করতে সংসদ অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী অধিবেশন কক্ষে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে স্বাগত জানান সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা।
অর্থমন্ত্রী তার দীর্ঘ বাজেট বক্তব্যের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের সকল গণতান্ত্রিক লড়াই সংগ্রামে আত্মদানকারী বীর সেনানীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বলেন, পরিকল্পনা ও কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩৪ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হবে। একইসঙ্গে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে জনমিতিক লভ্যাংশ ও দীর্ঘজীবিতা লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে গণতান্ত্রিক লভ্যাংশও অর্জন করবে।
আমীর খসরু বলেন, সেই লক্ষ্যের আলোকে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমরা মানুষের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে চাই। এজন্য সরকার ১০টি প্রধান অগ্রাধিকার বিবেচনায় রেখে বাজেট প্রস্তাব দাঁড় করিয়েছে। সেগুলো হলো- সবার জন্য উন্নয়ন; সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা; সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা; বিনিয়োগনির্ভর, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতি; বিনিয়ন্ত্রণকরণ এবং সাশ্রয়ী ও সহজীকৃত ব্যবসার পরিবেশ; আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা; জাতীয় নিরাপত্তা; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ; প্রাণ, প্রকৃতি, পরিবেশ ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা; স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা। এই বাজেটের শিরোনাম দেয়া হয়েছে- ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতির ভগ্নদশার পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতায় তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকিসমূহ মোকাবিলার প্রত্যয়কে কেন্দ্রে রেখেই আমরা এবারের বাজেটে স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, সামষ্টিক কৌশল নির্ধারণ করেছি। জনগণের শক্তি, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই গড়ে উঠবে গণআকাঙ্ক্ষার স্বনির্ভর ও মর্যাদাবান বাংলাদেশ।