স্বাস্থ্যসেবা বরাবরই চিকিৎসাকেন্দ্রিক। এবার হবে প্রতিরোধকেন্দ্রিক। বাজেটও বেড়েছে আগের অর্থবছরের চেয়ে দ্বিগুণ। প্রশ্ন এখন খরচের সক্ষমতা নিয়ে। এমনিতেই অতিরিক্ত রোগীর চাপে হিমশিম খায় হাসপাতালগুলো। মানসম্মত চিকিৎসা থেকেও বঞ্চিত অনেকে। আবার চিকিৎসা নিতে রয়েছে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা। এতে দেশ হারাচ্ছে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা।
বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে এটি ১.০১ শতাংশ। আগের সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির হিসাবে ০.৫৮ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা জানাচ্ছেন, স্বাস্থ্য খাতে আগের তুলনায় বরাদ্দের বিস্তৃতি আশাব্যঞ্জক। তবে এটিও যথেষ্ট নয়। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এই খাতে বাড়াতে হবে আরও বরাদ্দ। এখন যা বরাদ্দ হচ্ছে, তা যেন প্রয়োজনীয় সব খাতে সঠিকভাবে বণ্টন ও খরচ হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এবার জোর দেবেন মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও টিকাদানে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোয় বাড়ানো হবে শয্যা। পাশাপাশি থাকবে মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা। কোনো দরিদ্র পরিবার যেন চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে নিঃস্ব না হয়, তা দেখবে রাষ্ট্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হকের মন্তব্য, ‘স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো যৌক্তিক। খেয়াল রাখতে হবে এটি যেন কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নে খরচ না হয়। পুষ্টি, পরিবার পরিকল্পনা ও টিকার বরাদ্দে দিতে হবে জোর। বছর শেষে বরাদ্দ হওয়া অর্থ যাতে ফেরত না যায়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দক্ষতা থাকাও জরুরি।’
বাজেট ঠিকমতো খরচ হচ্ছে কিনা, প্রতি মাসে রাখতে হবে তার রিপোর্ট। ‘মাস শেষে যদি কোনো খাতে নির্ধারিত বরাদ্দ খরচ না হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে করতে হবে জবাবদিহি। বছর শেষে এ আলোচনা অর্থহীন। কৌশলী, যৌক্তিক বাজেট প্রণয়নের পাশাপাশি ডিজিটালাইজেশনও জরুরি’, জানাচ্ছিলেন এই অধ্যাপক।
সংসদে অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য সরকারের। প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা, যার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে এরই মধ্যে।
বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তার ভাষ্য, ‘২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমিয়ে শূন্যে আনতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় থাকা উচিত নির্ধারিত বরাদ্দ। নইলে সংশোধিত বাজেটে কমে যেতে পারে বরাদ্দ।’
তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতে আগের তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছে ঠিকই। তবে আরও দরকার। লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে— স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫% বরাদ্দ করা। সেটি একবারে না পারলেও এ বছর অন্তত ২% - ২.৫% বরাদ্দ করা দরকার ছিল।
আপাতত তা না হলেও শূন্যপদ পূরণ করতে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম, যার ৮০ শতাংশই হবে নারী। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিক পাবে ‘ই-হেলথ কার্ড’।