জাতীয় বাজেট ঘোষণার ক্ষেত্রে বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পথেই হাঁটছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনটি বাজেট ঘোষণা করেছিলেন জিয়াউর রহমান। যার প্রথমটিতেই তিনি শিক্ষা, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়াকে মূলনীতি হিসেবে বেছে নেন। এ ছাড়া ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের ধারণাকে সঙ্গী করে কৃষি ও উৎপাদনব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের প্রথম বাজেট (১৯৭৬-৭৭) ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। যার আকার ছিল ১ হাজার ৯৮৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এর প্রায় ৫০ বছর পর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানও এক বৈষম্যহীন দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে প্রথম বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। যেখানে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন শিক্ষা খাতকে। এ খাতে এর আগে কোনো সরকারই এত বেশি গুরুত্ব দেয়নি। তিনি একক খাত হিসেবে এই শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ ৫৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে যাচ্ছেন।
একই সঙ্গে বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করে অর্থনীতির গণতন্ত্রায়ন করে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে চান। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালু করেছেন। ব্যাপকভিত্তিক কর্মসৃজনের জন্য সৃজনশীল অর্থনীতির প্রবর্তন করতে যাচ্ছেন লাল-সবুজের বাংলাদেশে। দেশের বিপর্যস্ত ও ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা সত্ত্বেও আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সংকোচননীতিকে পাশ কাটিয়ে বিশাল আকারের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। সামরিক শাসক হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আরও দুটি বাজেট ঘোষণা করেন (১৯৭৭-৭৮ এবং ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছর), যে বাজেটে তিনি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেন শিক্ষা খাতকে। একই সঙ্গে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে তিনি মুক্তবাজার অর্থনীতি ধারণার প্রবর্তন করেন বাংলাদেশে। পরের দুটি বাজেটেও তিনি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। যার ফলে মাত্র চার বছর এক মাস নয় দিনের শাসনামলে দেশকে স্বনির্ভতার দিকে নিয়ে যান।
একই সঙ্গে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারণা বিশ্বব্যাপী খুবই প্রশংসা পায়। উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা ও ঋণ পেতে খুবই সহায়ক ভূমিকা রাখে মুক্তবাজার অর্থনীতির এ ধারণা। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত রাখতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তনও করেন জিয়াউর রহমান। দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে হলে সবার আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি বলে তিনি মনে করতেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চষে বেড়িয়েছেন খাল খনন কর্মসূচি সফল করতে। কেননা, সে সময় বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করে নলকূপ বসিয়ে কৃষিক্ষেত্রে সেচ দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না বাংলাদেশের। এজন্য তিনি বৃষ্টির পানি ধরে রেখে সেচব্যবস্থাকে সহজ করতে ব্যাপকতর খাল খনন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেন। ব্যক্তি খাত ও বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করেন। রাষ্ট্রব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে কর আদায় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেন। এজন্য উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করেন। অর্থনীতিকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ধারা থেকে অপেক্ষাকৃত বাজারমুখী ধারায় নেওয়ার চেষ্টা করেন।
একইভাবে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বাজেটে দেশের অর্থনীতিকে গণতন্ত্রায়নের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামোয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে বিনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছেন। এটা শুধু অর্থনীতিই নয়, বিনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ হ্রাস করা হবে। সরকারি সময় সাশ্রয় ও কর্মসম্পাদনে প্রতিবন্ধকতা কমানো হবে।
ওয়ান-স্টপ পদ্ধতি : একাধিক দপ্তরে ঘোরাঘুরি ও একই নথি বারবার দাখিল পরিহার করা হবে। যথাসময়ে ফাইল ও প্রস্তাব অনুমোদন। ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত এবং স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা পরিহার করা হবে। বেসরকারি খাতের সুবধার্থে ফর্মের সংখ্যা হ্রাস, রেকর্ডপত্র সংশোধন/সহজীকরণ, রেজিস্টার একীভূতকরণ, বন্দরব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও সেবা প্রদান উন্নীতকরণ।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ডিজিটাল সেবার সম্প্রসারণ, সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম, লাইসেন্স প্রক্রিয়ার সময় ও ব্যয় হ্রাস, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ সহায়তা করা হবে। রাজস্ব খাতে কর-ভ্যাট-শুল্ক আধুনিকীকরণ, তথ্যভিত্তিক নিরীক্ষা, ই-ভ্যাট ও ই-কর ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। দেশকে দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত থেকে বেকারত্ব দূর করা হবে। এ জন্য সৃজনশীল অর্থনীতির মধ্য দিয়ে নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে। প্রান্তিক মানুষকে স্বস্তি দিতে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির প্রসার ঘটানো হবে। এ ছাড়া সামাজিক সুরক্ষার আওতা ব্যাপক হারে বাড়ানো হবে। এজন্য সামাজিক নিরাপত্তা খাতে রেকর্ড পরিমাণ ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হবে ১১ জুনের বাজেটে। জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাজেটের মূলনীতি ও অর্থনৈতিক দর্শনের ভিত্তি ছিল মুক্তবাজার অর্থনীতি, ব্যক্তি খাতের প্রসার এবং স্বনির্ভরতা। সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয়করণ নীতি থেকে সরে এসে তিনি উৎপাদনমুখী মিশ্র অর্থনীতি চালু করেছিলেন। তাঁর বাজেটের মূলনীতিগুলো ছিল অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বেসরকারীকরণ। রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া এবং দেশে পুঁজি ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা।
কৃষির সবুজ বিপ্লব : খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে কৃষি খাতে ভর্তুকি প্রদান, সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং উন্নত বীজের ব্যবহার বৃদ্ধি।
স্বনির্ভর অর্থনীতি : বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ‘স্বনির্ভর বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ এবং এজন্য গ্রাম সরকার ব্যবস্থা চালু করা।
জনশক্তি রপ্তানি : মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি করা।
অবকাঠামো উন্নয়ন : খাল খনন এবং রাস্তাঘাট নির্মাণের মাধ্যমে গ্রামীণ ও জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা। এসব ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারও একই রকম নীতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এজন্য বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের তিন বছরমেয়াদি বাজেট পরিকল্পনাতেও এসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমান তাঁর প্রথম বাজেটে ব্যক্তিগত আয়করের করমুক্ত সীমা ৮ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করেন। এ বছর মূল্যস্ফীতির কথা মাথায় রেখে ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হচ্ছে।
শিল্প ও বাণিজ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো হয়। অনেক খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা হয়। উদ্যোক্তাদের নতুন শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হয়। জাতীয়করণ করা কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। শিল্প পরিচালনায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়। আমদানি-নীতির সংস্কার করা হয়। কাঁচামাল ও শিল্পযন্ত্রপাতি আমদানিতে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়। শিল্প উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি সহজ করা হয়। তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পকে উৎসাহ দেওয়া হয়। বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ব্যবসা ও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে কিছু কর-সুবিধা দেওয়া হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। যৌথ উদ্যোগে শিল্প স্থাপনে উৎসাহ দেওয়া হয়। ২০২৬-২৭ অথর্বছরের বাজেটে বিএনপির দেওয়া নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষিত যুবকদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। শিল্প ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।
বাংলাদেশকে কর্মসংস্থানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে। নতুন শিল্প ও উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও বিকাশ এবং সরকারি সেবার একক জানালা চালু করা হবে। দক্ষ জনবল গড়ে তোলে, বিদেশে কর্র্মী পাঠানো হবে। সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. ওয়াহিদউদ্দীন মাহমুদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সরকার এই মুহূর্তে একটা ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে কিন্তু ইরান যুদ্ধ এসে সেটাকে আবারও সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তাই বর্তমান সরকারের উচিত হবে একটা স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটা তাদের প্রথম বাজেট। সেজন্য অনেক চাপ ও প্রত্যাশাও রয়েছে। অতীতে জিয়াউর রহমানও অনেক সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে মুক্তবাজার অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বর্তমান সরকারের উচিত হবে শিক্ষা এবং বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।