Image description

দেশে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ দেদারছে নকল হচ্ছে। অবাধে বিক্রি হচ্ছে বাজারে। এসব ওষুধ সেবন করে আরো অসুস্থ হচ্ছে রোগীরা। অনেকে মারা যাচ্ছে। কিন্তু জীবননাশকারী এসব ওষুধের উত্পাদন ও বাজারজাত নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না প্রশাসন। 

সম্প্রতি র্যাবের মোবাইল কোর্ট রাজধানীর উত্তরা, গুলশান, নয়াবাজার, শ্যামপুর, কদমতলী ও কেরানীগঞ্জের আটিবাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ নকল ও ভেজাল ওষুধসামগ্রী উদ্ধার করেছে।

র্যাবের (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং) পরিচালক উইং কমান্ডার এ জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জানান, অভিযানে বিপুল নকল ও ভেজাল ওষুধসামগ্রী উদ্ধার করা হয়। পরে সকল ওষুধ ও তৈরির যন্ত্রাংশ ধ্বংস করা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে জেল ও জরিমানা করেছে মোবাইল কোর্ট। তিনি বলেন, র্যাবের একার পক্ষে ভেজাল ও নকল ওষুধ তৈরিকারীদের রোধ করা সম্ভব নয়। সব পেশার মানুষকে দলমত নির্বিশেষে নকল-ভেজাল ওষুধসামগ্রী তৈরি ও বাজারজাতকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ক্রেতাদের কেনার সময় সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর ওষুধের বৃহত্তম মার্কেট পুরাতন ঢাকার মিটফোর্ড, বাবুবাজার ও ইসলামপুর এলাকায় নকল ও ভেজাল ওষুধসামগ্রী পাইকারি বিক্রির সঙ্গে অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ীর সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। এই সিন্ডিকেটের কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ও পুরাতন ঢাকার অলিগলিতে নকল ওষুধ তৈরির কারখানা রয়েছে। ঐসব কারখানায় দেশ-বিদেশের নামিদামি কোম্পানির ওষুধ হুবহু নকল তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরে মিটফোর্ড ওষুধ মার্কেট থেকে পাইকারি বাজারজাত করা হচ্ছে। এভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে নকল ওষুধ। র্যাবের উদ্ধারকৃত ওষুধের মধ্যে রয়েছে ওজন কমানোর ওষুধ, ডায়াবেটিসের ওষুধ, বিভিন্ন এন্টিবায়োটিক, প্যারাসিটামল সিরাপ ও ট্যাবলেট, বিভিন্ন ধরনের ইনজেকশন এবং ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ।

এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, জেনেশুনে নকল ওষুধসামগ্রী উত্পাদন এবং বাজারজাত করে রোগীদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এসব ওষুধ খেয়ে অনেকের মৃত্যু ঘটছে। এটা হত্যা করার মতো অপরাধ। জানতে চাইলে দেশের অন্যতম কিডনি বিশেষজ্ঞ ও কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ বলেন, ভেজাল ও নকল ওষুধ খেলে কিডনি ফেইলিউর হবে। এছাড়া নানা জটিলতা দেখা দেবে। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। নতুন হাসপাতাল তৈরি না করে ভেজাল ও নকল ওষুধসামগ্রীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা শিশু হাসপাতালের নিউনেটাল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মনির হোসেন বলেন, ভেজাল ও নকল ওষুধ সেবনে শিশুদের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তো নেই বরং চরম জটিলতা হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এমনকি প্রাণহানিও ঘটতে পারে। একই হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. সফি আহমেদ মোয়াজ বলেন, অনেক সময় জ্বর নিয়ে শিশুরা আসে। প্যারাসিটামল সিরাপ ও অন্যান্য ওষুধ দেওয়া হয়। জ্বর কমে যায়। আবার জ্বর আসে। অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়। নকল ও ভেজাল ওষুধের কারণে এমন হতে পারে। তাই এসব ওষুধ বিক্রি, বিতরণ ও সংরক্ষণ পুরোপুরি বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। এছাড়া স্বীকৃত ফার্মাসিস্ট এবং চিকিত্সকের পরামর্শ ব্যতীত ওষুধ বিক্রি বন্ধ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এসব দেখভালের দায়িত্বে থাকা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আখতার হোসেন বলেন, একশ্রেণির ওষুধ ব্যবসায়ীর মানবিকতা উঠে গেছে। তারা অতি মুনাফার লোভে নকল ও ভেজাল ওষুধ বিক্রি করছে। ওষুধ প্রশাসন থেকে সোর্স লাগিয়ে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে অধিদপ্তরে আরো জনবলের প্রয়োজন বলে তিনি জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শিমুল হালদারও বলেছেন, ‘এসব বন্ধে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধি করা জরুরি।’