Image description

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গতকাল ৭ জুন “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ” শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ পুলিশ; হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস); মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ); আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর তথ্যের ওপর ভিত্তি করে টিআইবি তাদের গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দীর্ঘ প্রতিবেদনের ‘অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন চিত্র’ ছকে তারা উল্লেখ করে বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫টি খুন হয়েছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ২০৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের ১০০ দিনে খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ অব্যাহত রয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।

এছাড়াও গবেষণা প্রতিবেদনে সরকারের প্রথম ১০০দিনে বেশকিছু ইতিবাচক কাজের চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে আসা সরকারের ইতিবাচক দিকগুলো হলো– সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা বাতিল, প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি প্রটোকল সীমিত করা, ব্যক্তিগত সফরে সরকারি সুবিধা ব্যবহার করলে নিজ খরচে তা পরিশোধের নির্দেশনা, সরকারি কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিতের উদ্যোগ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা। 

এছাড়া তিন ধাপে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত এবং সংসদের প্রথম অধিবেশনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রশ্নোত্তর ও আলোচনায় অংশগ্রহণকেও ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।

এছাড়াও কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাহী বিভাগ, সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ, গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাসহ নানা বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে সংস্থাটি।

 

আওয়ামী ৪ সরকারের ১০০ দিনের রিপোর্ট প্রকাশ করেনি টিআইবি

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের সার্বিক কার্যক্রমের এমন মূল্যায়নধর্মী পর্যবেক্ষণ প্রয়োজনীয় কাজ হলেও নবগঠিত সরকারের ১০০ দিনের মূল্যায়ন করে এমন গবেষণা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বিগত চারটি সরকারের সময়ে করেনি টিআইবি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর ওই বছরের ১৮ নভেম্বর প্রথম এই ধরনের একটি মূল্যায়ন প্রকাশ করেছিল সংস্থাটি। “‘নতুন বাংলাদেশ’ কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন-পরবর্তী ১০০ দিনের ওপর পর্যবেক্ষণ” শিরোনামে ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে টিআইবি। 

এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যদিয়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গতকাল ৭ জুন টিআইবি বিএনপি সরকারের ১০০দিনের ওপর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে। 

তবে টিআইবির ওয়েবসাইট ঘেঁটে বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের গঠিত ৪টি সরকারের আমলে প্রথম ১০০ দিনের ওপর এমন পর্যবেক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংস্থাটির ওয়েবসাইটে থাকা ২০০৩ সাল থেকে চলতি বছরের সবগুলো প্রতিবেদন ঘেঁটে আগের কোন সরকারের আমলে এমন প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারগুলোর সময়ে এরকম পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে টিআইবির আউটরিচ এন্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “১৮-র নির্বাচন... মানে ১৮-র নির্বাচনটাকে কি আপনারা স্বাভাবিক নির্বাচন হিসেবে ধরছেন? আমরা তো স্বাভাবিক নির্বাচন হিসেবে বলিনি ওগুলাকে। আমরা সাধারণত নতুন সরকার আসলে এ ধরনের রিপোর্ট পাবলিশ করি। এই দুইটা সময়ে (বিগত অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকার) আমরা সরকারকে দেখেছি। বিশেষ সময়ের পরে যেসব সরকার আসে, সেই সরকারগুলোকে দেখেছি। আগে কেন হয়নি বা আগে কী হয়েছে, এটা কোনো ধারাবাহিকতা না। আমরা অনেক গবেষণা আগে করি নাই, এখন করছি।”

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগের নির্বাচনগুলোর পর এমন পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করা হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে তিনি এ প্রশ্নের জবাব দেননি। 

পরবর্তীতে তৌহিদুল ইসলাম ১৮ আগস্ট ২০১১ এর “সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি প্রতিরোধে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি: অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে জানান, টিআইবি আগেও এমন রিপোর্ট করেছে।

যদিও দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, ওই প্রতিবেদনটি তৎকালীন সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রমের ওপর নয়, বরং দুই বছরের কার্যক্রমের ওপর একটি মূল্যায়ন।

মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম আরও বলেন, “আমরা প্রত্যেকবার ইলেকশনটা আমরা প্রত্যেকবারই চেক করি। ঠিক আছে? যে ইলেকশনটা রাইট অর রং।”

 

টিআইবির প্রতিবেদন মিডিয়ায় বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন


টিআইবির পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সমকাল ৭ জুন “সরকারের ১০০ দিনে খুন, অপহরণ বেড়েছে” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, “সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনে দেশে খুন, ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো অপরাধের ঘটনা বেড়েছে।”

এছাড়াও, সংবাদমাধ্যম প্রতিদিনের সংবাদ “ছিনতাই চুরি ডাকাতি অপহরণ বেড়েছে : টিআইবি” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

তবে প্রতিদিনের সংবাদ এবং সমকালের প্রতিবেদনে কোথাও অপরাধ তুলনামূলক বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো তথ্য, বক্তব্য বা পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।

টিআইবির ওয়েবসাইটে ৭ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনের সারাংশতেও অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়ার কোনো তুলনামূলক তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

তবে আইন শৃঙ্খলা ও মানবাধিকার অংশে পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, “অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পেলেও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, ছিনতাই, চুরি, ও ডাকাতির ঘটনা উদ্ধেকজনক।”

এ বিষয়ে টিআইবির আউটরিচ এন্ড কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “তিনটি মানবাধিকার সংস্থা— তাদের তথ্যগুলোকে আমরা কম্পাইল করে আমরা দেখেছি কী পরিমাণ অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। আমরা কিন্তু কোনো তুলনাতে যাইনি। কম বা বেশি বা এরকম কিছু করিনি। মিডিয়ার দায়িত্ব আমাদের না।”