পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সোমবার (৮ জুন) মস্কোতে রুশ ফেডারেশনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন।
বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক এবং জাতিসংঘসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সম্পৃক্ততা ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সম্পর্কে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দেশগুলোর অন্যতম ছিল।
উভয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ২০২৭ সালে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫৫তম বার্ষিকী উদযাপনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত ও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে তাঁর প্রার্থিতার প্রতি সমর্থন দেওয়ার জন্য রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানান।
বৈঠকে দুই নেতা শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, গবেষণা ও প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, পর্যটন, পরিবহন এবং প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদ্যমান সহযোগিতার মূল্যায়ন করেন। একই সঙ্গে এসব ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণ ও গভীর করার বিষয়ে একমত হন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন এবং বাংলাদেশের পণ্যের জন্য রাশিয়ার বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত (ডিএফকিউএফ) প্রবেশাধিকার প্রদানের অনুরোধ জানান। তিনি বাংলাদেশি পণ্যের নিবন্ধন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।
এ ছাড়া হালকা ও ভারী প্রকৌশল, খাদ্য ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত উৎপাদন এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন উদীয়মান খাতে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কগুলোতে বিনিয়োগের জন্য রাশিয়াকে আহ্বান জানান।
তিনি বাংলাদেশ ও ইউরেশিয়ান ইকোনমিক কমিশনের (ইইসি) মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) সম্পাদনে বাংলাদেশের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন কামনা করেন। বর্তমানে ইইসির সদস্য দেশ পাঁচটি—রাশিয়া, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান ও কিরগিজস্তান।
ড. খলিলুর রহমান ব্রিকস ও সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-এর আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন প্রত্যাশা করেন। জবাবে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিবাচক সাড়া দেন।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ায় রাশিয়া সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরিকল্পনা অনুযায়ী দ্বিতীয় ইউনিটের কমিশনিং কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে রাশিয়ার পূর্ণ সহযোগিতা কামনা করেন।
দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে আরও জনশক্তি নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা করেন। তারা বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে মুলতবি থাকা বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি, বিশেষ করে পুনঃপ্রবেশ চুক্তি এবং মানবসম্পদ-সংক্রান্ত চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাশিয়ায় আটকে পড়া কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অনুরোধ জানান। এ বিষয়ে লাভরভ তার সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দেন।
বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের বিষয়েও আলোচনা হয়। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইঙ্গিত দেন যে, এ সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করতে রাশিয়া সহযোগিতা করতে আগ্রহী।
মস্কো সফরকালে আন্তরিক অভ্যর্থনার জন্য রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ড. খলিলুর রহমান তার রুশ প্রতিপক্ষকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।