Image description

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে শুধু যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা যুক্তরাজ্য নয়—উচ্চশিক্ষার জন্য এখন তারা নতুন করে ঝুঁকছেন অস্ট্রেলিয়া, জাপান, মালয়েশিয়া, ফিনল্যান্ড কিংবা ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দিকে।

একদিকে বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে তাদের ব্যয়। গত অর্থবছরে বিদেশে পড়াশোনার জন্য বাংলাদেশ থেকে খরচ হয়েছে রেকর্ড ৬৬ কোটি ডলারের বেশি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলোতে ভিসা ও অভিবাসন নীতির কঠোরতা বেড়েছে। তবু বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা থামেনি। বরং শিক্ষার্থীরা বিকল্প গন্তব্য খুঁজে নিচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি শুধু বৈশ্বিক শিক্ষাবাজারের নতুন বাস্তবতা, নাকি দেশের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতাও তরুণদের নতুন গন্তব্য খুঁজতে বাধ্য করছে?

এক দশকে দ্বিগুণ বিদেশগামী শিক্ষার্থী
ইউনেস্কোর ‘গ্লোবাল ফ্লো অব টারশিয়ারি লেভেল স্টুডেন্টস’ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫২ হাজার ৭৯৯ শিক্ষার্থী বিশ্বের ৫৫টি দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন। ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৯ হাজার ১৫১ এবং ২০২১ সালে ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন।

এক দশক আগে, ২০১৩ সালে বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ১১২। অর্থাৎ ১০ বছরে বিদেশগামী শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৬ কোটি ২০ লাখ ডলারে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৭৯ কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে)। এর আগের অর্থবছরে এ ব্যয় ছিল ৫৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫২ কোটি ৮ লাখ ডলার, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪১ কোটি ৪৫ লাখ ডলার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ছিল ২৪ কোটি ৩১ লাখ ডলার।

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দেশে অভিবাসন ও শিক্ষার্থী ভিসা নীতিতে কঠোরতা এসেছে। কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি পারমিটে কোটা নির্ধারণ করেছে। অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় যুক্ত করে ভিসা যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য দেশটির আকর্ষণ কমেনি। 

কঠোর ভিসা নীতি, তবু থামছে না বিদেশমুখীতা
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ঐতিহ্যগতভাবে সবচেয়ে পছন্দের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব দেশে অভিবাসন ও শিক্ষার্থী ভিসা নীতিতে কঠোরতা এসেছে। কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাডি পারমিটে কোটা নির্ধারণ করেছে। আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের শর্তও কঠোর হয়েছে। পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশন ওয়ার্ক পারমিটের নিয়মেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে দেশটিতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় যুক্ত করে ভিসা যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও উচ্চশিক্ষার জন্য দেশটির আকর্ষণ কমেনি। 

ওপেন ডোরস রিপোর্ট অন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ বর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্য ছিলো ২০ হাজার ১৫৬ জন। তবে অস্ট্রেলিয়ায় চলতিবছর প্রথম তিন মাসে ২০২৫ সালের তুলনায় শিক্ষার্থী কমেছে ১৮.৮ শতাংশ। চলতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চে দেশটিতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থী গেছেন ৩১৪ জন। এছাড়া কানাডাতে জানুয়ারি থেকে মার্চে  বাংলাদেশী শিক্ষার্থী গেছেন ১ হাজার ১৩৫ জন। 

কোথায় যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা?
ইউনেস্কোর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ৮ হাজার ৫২৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছেন— যা ২০২২ সালের ৮, হাজার ৬৬৫ জনের চেয়ে কিছুটা কম। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় পছন্দের দেশ হলো যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো। যুক্তরাজ্যে ৬ হাজার ৫৮৬ জন, কানাডায় ৫ হাজার ৮৩৫ জন, মালয়েশিয়ায় ৫ হাজার ৭১৪ জন এবং জার্মানিতে ৫ হাজর ৪৬ জন শিক্ষার্থী গিয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ হাজার ২০২ জন, সৌদি আরবে ১ হাজার ১৯০, ফিনল্যান্ডে ৯৫৪, তুরস্কে ৭৫১, সুইডেনে ৬৬০ ও কাতারে ৩০৮ শিক্ষার্থী গেছেন। এর আগে ২০২২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেছেন ৪৯ হাজার ১৫১ শিক্ষার্থী। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৪ হাজার ৩৩৮ জন। তবে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে কম শিক্ষার্থী গিয়েছেন গ্রিস, ব্রাজিল, জর্ডান, রোমানিয়া ও আর্মেনিয়ায়। 

Top Private Universities in the USA
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশের প্রথম পছন্দ যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: avanse

কোভিডের পর বদলেছে ব্রেইন ড্রেইন-এর গন্তব্য?
মহামারির পর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে গন্তব্য নির্বাচনে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বৃদ্ধি পেয়েছে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। ওপেন ডোরস রিপোর্ট অন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জ’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ বর্ষে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্য ছিলো ২০ হাজার ১৫৬ জন। এরআগে ২০২৩-২৪ বর্ষে এই সংখ্যা ছিলো ১৭ হাজার ৯৯ জন, ২০২২-২৩ বর্ষে ১৩ হাজার ৫৬৩ জন। করোনা মহামারির মধ্যে ২০২১-২২ বর্ষে  এই সংখ্যা ছিলো ১০ হাজার ৫৯৭ জন। আর ২০২০-২১ বর্ষে এই সংখ্যা ছিলো ৮ হাজার ৫৯৮ জন। তারও আগে ২০১৯-২০ বর্ষে ৮ হাজার ৮৩৮ জন, ২০১৮-১৯ বর্ষে ৮ হাজার ২৪৯ জন এবং ২০১৭-১৮ বর্ষে ৭ হাজার ৪৯৬ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন।

কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তরুণদের বিকল্প পরিকল্পনার গুরুত্ব বুঝিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজেদের জন্য আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষাকে বেছে নিচ্ছেন।—ড. মনিরা জাহান, অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

যুক্তরাজ্যের সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম তিন কোয়ার্টারে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) মোট ৯ হাজার ৭০ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী স্টুডেন্ট ভিসা পেয়েছেন। ২০২৪ সালে চার কোয়ার্টার মিলিয়ে মোট ৮ হাজার ৪৩৪ জন এবং ২০২৩ সালে ৮ হাজার ৮৯৮ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। করোনা মহামারির বছর ২০২০ সালে এই সংখ্যা মাত্র ১ হাজার ৪৩ জনে নেমে আসলেও, ২০২১ সালে তা একলাফে ৫ হাজার ২৭ এবং ২০২২ সালে ৭ হাজার ৬১৫ জনে উন্নীত হয়।

স্টুডেন্ট ভিসায় আন্তর্জাতিক কোটা (ক্যাপ) নির্ধারণের পর কানাডায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যায় বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। দেশটির সরকারি ওয়বসাইটের তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে যেখানে রেকর্ড ৯ হাজার ৪৭৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কানাডায় গিয়েছিলেন, সেখানে ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬ হাজার ৫০৫ জনে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা আরও হ্রাস পেয়ে ৫ হাজার ৫৫০ জনে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (Q1) মাত্র ১ হাজার ১৩৫ জন শিক্ষার্থী ভিসা পেয়েছেন। অথচ মহামারির পর ২০২২ সালে ৭ হাজার ৩৫৫ জন এবং ২০২১ সালে ৬ হাজার ৫৮০ জন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডাকে বেছে নিয়েছিলেন। এরআগে ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৪ হাজার ৯০০, ২০২৮ সালে ৪ হাজার ১৫০ ও ২০২৭ সালে ২ হাজার ৮২৫ জন। 

২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত ২০ বছরে উচ্চশিক্ষার জন্য মোট ৪০ হাজার ৫ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়া গেছেন। মহামারির ২ বছর অর্থাৎ ২০২০ ও ২০২১ সালে শিক্ষার্থী সংখ্যা যথাক্রমে দশমিক ৯ শতাংশ ও ৯.৬ শতাংশ হ্রাস পায়। তবে পরবর্তী বছরগুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্য ক্রমশ বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৫৮৪ জন (৬০.৭% প্রবৃদ্ধি) এবং ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৭১৯ জন (৫৫.৮% প্রবৃদ্ধি) শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমান। ২০২৫ সালে তা আরও ৪৭% বৃদ্ধি পেয়ে ১০ হাজার ৩৫২ জনে পৌঁছায়। 

জাপানে ২০২৪ সালে রেকর্ড ৭ হাজার ৫৯৭ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী গেছেন, যা ২০২৩ সালে ছিল ৫ হাজার ৩২৬ জন এবং ২০২২ সালে ছিল ৩ হাজার ৩১৩ জন। ২০২১ সালে ৩,০৯৫ জন এবং ২০২০ সালে ৩,০৯৮ জন শিক্ষার্থী দেশটিতে পড়তে যান। মহামারি-পূর্ববর্তী সময়ে, অর্থাৎ ২০১৯ সালে ৩,৫২৭ জন, ২০১৮ সালে ৩,৬৪০ জন এবং ২০১৭ সালে ২,৭৪৮ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানকে বেছে নিয়েছিলেন।

অন্যদিকে, মালয়েশিয়ায় ২০২৫ সালে গেছেন ৪ হাজার ৭১৭ জন শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৮৫ জন এবং ২০২৩ সালে ছিল ২ হাজার ৩৯৭ জন, যা ২০১৭ সালের (১,৮৩৪ জন) পর এই অঞ্চলের জন্য সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি। সর্বশেষ ২০২৫ সালে রেকর্ড ৪ হাজার ৭১৭ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য মালয়েশিয়া গেছেন। এর আগের বছর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৮৫ জন এবং ২০২৩ সালে ছিল ২ হাজার ৩৯৭ জন।

করোনা মহামারি ও বৈশ্বিক লকডাউনের কারণে ২০২১ সালে এই সংখ্যা মাত্র ৯৩২ জনে নেমে আসলেও, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকে এটি দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়। এর আগে ২০২২ সালে ১ হাজার ৪৬৩ জন এবং মহামারির প্রাক্কাল ২০২০ সালে ১ হাজার ৪১৪ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় পড়াশোনা করতে যান। মহামারি-পূর্ববর্তী সময়ে, অর্থাৎ ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪৯২ জন, ২০১৮ সালে ৯০৬ জন এবং ২০১৭ সালে ১ হাজার ৮৩৪ জন শিক্ষার্থী দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন।

কোভিড-পরবর্তী সময়ে ফিনল্যান্ড বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় উচ্চশিক্ষার গন্তব্যে পরিণত হয়। ২০২২ সালে ফিনল্যান্ডে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ জন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৫০০ জনে। ওই সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনে, আর ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ২২০০ জন ছাড়িয়ে যায়। 

কেনো বদলে গেল ব্রেইন ড্রেইন-এর গন্তব্য?
বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, দেশ ছাড়ার পেছনে কাজ করছে দেশের ভঙ্গুর কর্মসংস্থান, যুগোপযোগী শিক্ষার অভাব, ক্যারিয়ারের দীর্ঘসূত্রতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের চরম অনিশ্চয়তা। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তরুণরা নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখলেও, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে দৃশ্যমান কোনো সংস্কার না আসায় হতাশা আরও ঘনীভূত হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার মত দেশগুলোর ভিসানীতিতে কঠোরতা আসায় ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলোকে বেছে নিচ্ছেন শিক্ষার্থীর। 

ফিনল্যান্ডের একটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ জানান, তিনি উচ্চশিক্ষা শেষে ইউরোপেই স্থায়ী হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। দেশের শিক্ষা ও চাকরিবাজারের তুলনা টেনে তিনি বলেন, ‘এখানে শিক্ষার পরিবেশ এবং জীবনযাত্রার মান চমৎকার। বাংলাদেশে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করে একজন শিক্ষার্থীকে মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিতে ঢুকতে হয়; যা দিয়ে বর্তমান বাজারে টিকে থাকা অসম্ভব। অথচ বিদেশে পড়াশোনা শেষে শুরুতে ন্যূনতম ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আয় করা সম্ভব, যা জীবনযাত্রার মান বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দেশের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সংস্কারের ধীরগতির কারণে তরুণ প্রজন্ম এখন দেশ ছাড়াকেই একমাত্র সমাধান ভাবছে।’

মালোয়েশিয়া ইউনিভার্সিটি মালায়া (ইউএম) স্নাতকোত্তর অধ্যয়নরত সাদিয়া আফসানা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, মূলত স্নাতক সম্পন্ন করার পর আমার লক্ষ্য ছিলো কানাডার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সেখানে সম্প্রতি ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়ায় মালোয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছি। এখানে কম খরচে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও মুসলিম-ফ্রেন্ডলি পরিবেশ ও হালাল খাবারের সুবিধা রয়েছে। এছাড়া নিরাপদ ও শান্ত জীবনযাত্রার জন্যও মালোয়েশিয়া একটি ভালো দেশ।

ঢাকাভিত্তিক একটি শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক কাজী হামিদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারি শিক্ষার্থীদের মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ঘরে বন্দি থাকার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে বিদেশে পড়াশোনা, নতুন পরিবেশে বসবাস এবং বৈশ্বিক সুযোগ-সুবিধা অনুসন্ধানের আগ্রহ বাড়িয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে তুলনামূলক কম সময়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করার সুযোগও শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করছে। আর্থিকভাবে সক্ষম শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো দেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। অন্যদিকে তুলনামূলক কম খরচে উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এছাড়া সরকারি ও আন্তর্জাতিক বৃত্তির সুযোগও বিদেশমুখী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মূলত স্নাতক সম্পন্ন করার পর আমার লক্ষ্য ছিলো কানাডার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়। তবে সেখানে সম্প্রতি ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়ায় মালোয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছি। এখানে কম খরচে ভালো বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও মুসলিম-ফ্রেন্ডলি পরিবেশ ও হালাল খাবারের সুবিধা রয়েছে। এছাড়া নিরাপদ ও শান্ত জীবনযাত্রার জন্যও মালোয়েশিয়া একটি ভালো দেশ।-সাদিয়া আফসানা, শিক্ষার্থী, মালোয়েশিয়া ইউনিভার্সিটি মালায়া

যদিও শিক্ষাবিদদের মতে, বিদেশমুখী হওয়ার পেছনে শুধু উন্নত শিক্ষার আকর্ষণ নয়, দেশের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মনিরা জাহান মনে করেন, ব্রেইন ড্রেইনের গন্তব্য বদলে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সরকারি চাকরিতে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং দক্ষ তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগের অভাব অনেককে বিদেশমুখী করছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি খণ্ডকালীন কাজের সুযোগ থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজের শিক্ষাব্যয় বহনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও পাচ্ছেন। এছাড়া বর্তমান প্রজন্ম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষা ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অবগত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তারা বিদেশে অধ্যয়ন ও কর্মসংস্থানের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে পারছেন, যা বিদেশে যাওয়ার আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক পরিবার উন্নত জীবনমান, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতা তরুণদের বিকল্প পরিকল্পনার গুরুত্ব বুঝিয়েছে। ফলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও নিজেদের জন্য আরও বিস্তৃত সুযোগ তৈরির লক্ষ্যেই অনেক শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষাকে বেছে নিচ্ছেন।