আংশিক কমিটি ঘোষণার দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর পূর্ণাঙ্গ কমিটি পেয়েছে বিএনপির অন্যতম অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদল। গেল বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সকালে বিএনপির দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নূরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি অনুমোদনের কথা জানায় বিএনপি।
এদিকে, দীর্ঘদিন পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হলেও কমিটিকে ‘একপেশে ও মাইম্যান’দের কমিটি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন বিগত সময়ে আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে থাকা নেতাকর্মীরা। তারা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের শাসনামলে জেল-জুলুম, নির্যাতন সহ্য করে যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখলেও শুধুমাত্র নিজেদের লোকদের পদায়ন করে এসব নেতাদের পদবঞ্চিত করা হয়েছে। কমিটিতে ত্যাগের মূল্যায়ন না করে শুধু মাত্র নিজের লোক অর্থাৎ ‘মাইম্যান’দের নেতা বানানো হয়েছে। এতে সাধারণ নেতাকর্মীদের যেমন বঞ্চিত করা হয়েছে পাশাপাশি তাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। যা সংগঠনের জন্য ভালো কিছুর ইঙ্গিত বয়ে আনে না। অবিলম্বে পদ বঞ্চিতদের সঙ্গে ‘ইনসাফ’ বা সঠিক মূল্যায়ন না করা হলে সাংগঠনিকভাবে যুবদল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে যেকোনো সময় অবাঞ্চিত ঘটনাও ঘটে যেতে পারে।
এদিকে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর সোমবার (৮ জুন) সকাল ১১টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে স্থানীয় একটি হোটেলে আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও নুরুল ইসলাম নয়নের নেতৃত্বাধীন কমিটি প্রথম পরিচিতিমূলক সভা আহ্বান করেছে। অন্যদিকে, ঠিক একই সময় গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে পদবঞ্চিতরা নিজের বঞ্চনার বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রত্যাশায় ‘শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন’ কর্মসূচি পালন করবে।
জানা যায়, যুবদলে পদবঞ্চিতরা জোটবদ্ধভাবে পরবর্তী পদক্ষেপের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন। আজ রবিবার (৬ জুন) বিকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমিতে প্রায় শতাধিক পদবঞ্চিত যুবদল নেতা মতবিনিময় ও আলোচনা করেন। এ সময় অনেকেই যুবদলের শীর্ষ নেতাদের নামে বিষোদগার করে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্বজন প্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগ করেন।
এ সময় তারা আরও বলেন, ঘোষিত পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সিনিয়র নেতাদের অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদ দিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়া হয়েছে। এই অসম্মানের কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান পেয়েও অনেক নেতাদের মধ্যে ‘তীব্র ক্ষোভ’ বিরাজ করছে। এই ক্ষোভ যুবদলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে শিগ্গিরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ওই বৈঠক থেকে পদবঞ্চিতরা সোমবার গুলশানের বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত দীর্ঘসময় এই বৈঠক করেন পদবঞ্চিতরা।
পদবঞ্চিত যুবদল নেতা হাফিজুর রহমান শরীফ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দীর্ঘদিন যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকেও সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে আমাদের ত্যাগ তিতীক্ষার ন্যূনতম মূল্যায়টুকুও করা হয়নি। আমি আলাল-নিরব নেতৃত্বাধীন কমিটির অধীনে ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। তখন উত্তরের সভাপতি ছিলেন মামুন হাসান ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ঢাকা-১৮ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য এসএম জাহাঙ্গীর। ৫ বার কারাবাস করেছি। প্রায় ২৫টি রাজনৈতিক মামলার আসামী ছিলাম। আমরা সঠিক মূল্যায়ন চাই।
কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি হুমায়ন কবির দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করলেও মূলত আমরা রাজনৈতিক পরিচয়হীন অবস্থায় আছি। আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছি। অন্যদের চেয়ে আমাদের ত্যাগ কম না। কিন্তু কমিটিতে আমাদের স্থান না দিয়ে রীতিমতো অবিচার করা হয়েছে। আমরা হাইকমান্ডের কাছে সুবিচার দাবি করি।
ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সোহাগ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে যে কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে ত্যাগী নির্যাতিতদের বঞ্চিত করা হয়েছে। সংগঠনের শীর্ষনেতাদের পকেট কমিটি দেয়া হয়েছে। এত নির্যাতিত হয়েও যদি সংগঠন আমাদের অবমূল্যায়ন করে তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বিএনপির হাইকমান্ডের কাছে সুবিচার কামনা করি।
জানা গেছে, গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে সোমবার সকাল ১১টায় মানববন্ধনে ‘পদবঞ্চিত’দের ব্যানারে লেখা থাকবে-‘যুবদলে ত্যাগীদের মূল্যায়ন চাই’, ‘যুবদলে ত্যাগীদের পদ বঞ্চনা চলবে না’, ‘দলের জন্য যারা লড়েছে, পদ তাদেরই দিতে হবে’, ‘যুবদলে যোগ্যদের অধিকার চাই’, ‘যুবদলে বঞ্চনার অবসান চাই’, ‘যুবদলে স্বজনপ্রীতির অবসান চাই’ প্রভৃতি।
জানা গেছে, রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমিতে পদবঞ্চিতদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মোহাম্মদ জাবেদ হাসান স্বাধীন সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক যুবদল, মো. খলিলুর রহমান খলিল সাবেক সহ-সাধারণ সম্পাদক যুবদল, ইমরান হোসেন মানিক-সহ সাধারণ সম্পাদক যুবদল, দেওয়ান অলি উদ্দিন সুমন-সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক যুবদল, মো. রিয়ন তালুকদার সাবেক গ্রাম সরকার সম্পাদক, আমানুল্লাহ বিপুল সাবেক সহ ক্রীড়া সম্পাদক, মোহাম্মদ আসাদুল টিটু সহ শিল্প বিষয়ক সম্পাদক যুবদল, মাহফুজুর রহমান সাবেক সহ সাংগঠনিক সম্পাদক যুবদল, মো. আব্দুর রহিম সাবেক গণশিক্ষা সম্পাদক যুবদল, মো. সেলিম আকন্দ সাবেক সদস্য যুবদল, মো. কাওসার সরকার মামুন সদস্য যুবদল, মিজানুর রহমান খান সাবেক সদস্য যুবদল, মেহেদী হাসান সাবেক সহ ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক যুবদল, খালেদ মাহমুদ মাসুদ সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক যুবদল, মিজানুর রহমান মোল্লা সাবেক সদস্য যুবদল, মহম্মদ মাসুদ আহমেদ খান সাবেক সদস্য যুবদল, হুমায়ুন কবির সাবেক সহ-সভাপতি জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ, রফিকুল ইসলাম রফিক সাবেক সহসভাপতি ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ, জাকির হোসেন খান সাবেক সহসভাপতি ছাত্রদল, সাজ্জাদ হোসেন উজ্জ্বল সাবেক সহ-সভাপতি ছাত্রদল, আবুল হাসান সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ছাত্রদল, মিজানুর রহমান সোহাগ সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ছাত্রদল, গোলাম আযম সৈকত সাবেক সহ সংগঠনিক সম্পাদক ছাত্রদল, মো. আনোয়ার জাহিদ সহ সাধারণ সম্পাদক ছাত্রদল, মো. মেজবাউল আলম সাবেক সহ সাধারণ সম্পাদক ছাত্রদল, স্বপন কুমার মন্ডল সাবেক পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক ছাত্রদল, মেরাজ আজিম ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক ছাত্রদল, মোহাম্মদ ইয়াকুব রাজু সাবেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পাদক ছাত্রদল, মাজেদুল ইসলাম মাসুম সাবেক সহ ক্রীড়া সম্পাদক ছাত্রদল, মো. মহিবুল্লাহ জয় সাবেক সদস্য ছাত্রদল, জসিম উদ্দিন শোভন সাবেক সদস্য ছাত্রদল ঢাবি শাখা, খন্দকার আমিনুল হক কাকন সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, রবিউল হাসান আরিফ সাবেক সহ সম্পাদক ছাত্রদল, কামরুল হাসান সাবেক সদস্য ছাত্রদল, বিশ্বজিৎ ভদ্র সাবেক সহসভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ফরিদ হোসেন খান সাবেক সহ-সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা, মো. আলী আহসান নিশান সাবেক সহ-সভাপতি চারুকলা অনুষদ, শরীফ মোহাম্মদ আল ফরহাদ দিপু সাবেক সহ-সভাপতি ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মাহমুদ খান সাবেক সম্পাদক ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল, হাফিজুর রহমান শরীফ সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল, নাহিদুল ইসলাম নাহিদ সাবেক সদস্য যুবদল, শাহিনুজ্জামান মিন্টু সাবেক সদস্য যুবদল, আমির হোসেন বাদশা সাবেক সদস্য যুবদল, শফিউল বসর সজল সাবেক সদস্য যুবদল প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, আবদুল মোনায়েম মুন্না সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে ২০২৪ সালের ৯ জুলাই জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে বিএনপি। সেই আংশিক কমিটিকে পরবর্তী তিনমাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করার নির্দেশনা থাকলেও দুই বছরে তা করতে ব্যর্থ হয় সুপার ফাইভের দায়িত্ব পাওয়া নেতারা। এ পর্যায়ে নতুন কমিটির দাবি জোরালো হতে থাকলে গেল বৃহস্পতিবার অবশেষে পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।