ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী আগস্ট মাসে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করতে পারেন বলে দলটির ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র দাবি করেছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতার ভাষ্য, দেশে ফিরে আইনি লড়াইয়ের সম্ভাব্য পথ খুঁজছেন শেখ হাসিনা। তবে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুকূলে না এলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফিরবেন না বলেও সূত্রগুলো মনে করছে।
আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো বলছে, নয়াদিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন শেখ হাসিনা। দলটির নেতাদের মতে, এ ধরনের আবেদন শুধু দেশে ফেরার প্রস্তুতির অংশ নয়, বরং এর একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের পর ক্ষমতা হারিয়ে ভারত চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি প্রকাশ্যে দেশে ফেরার কোনো সময়সীমা ঘোষণা না করলেও দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন বলে আওয়ামী লীগের নেতারা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য, ভারতে অবস্থান করেও তিনি নিয়মিত দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, গত দুই বছরে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সংগঠনকে টিকিয়ে রাখা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করা। ক্ষমতা হারানোর পর পশ্চিমা বিশ্বসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে দলটির বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গণহত্যা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে আলোচনা বাড়ে। আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, এসব অভিযোগের জবাবে শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে নিজের অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টা করছেন এবং নতুন সমর্থনভিত্তি গড়ে তুলতে কাজ করছেন।
দলটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, আগস্ট মাসকে সামনে রেখেই দেশে ফেরার প্রশ্নটি বিবেচনা করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কাছে আগস্ট শুধু একটি রাজনৈতিক মাস নয়, আবেগ ও শোকেরও মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হন।
আবার ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এ দুটি দিন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। দলটির নেতাদের মতে, আগস্টে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার উদ্যোগ প্রতীকী অর্থেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করতে পারে।
তবে আওয়ামী লীগের নেতারাই স্বীকার করছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সহজ হবে না। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে। দলটির ভেতরের আলোচনায় এমন কথাও রয়েছে যে, কিছু মামলায় তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকায় দেশে ফিরলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জটিল আইনি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। এ কারণে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থান, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন তিনি।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের দাবি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ন্যূনতম রাজনৈতিক সমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতার পরিবেশ তৈরি না হলে শেখ হাসিনা আপাতত দেশে ফেরার ঝুঁকি নেবেন না। দলটির নেতারা মনে করেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পক্ষ দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। তারা দ্রুত কোনো পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতির স্থিতিশীলতার জন্য অপেক্ষা করছে।
এ প্রেক্ষাপটে ট্রাভেল পাসের আবেদনকে আওয়ামী লীগের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, আবেদনটি গৃহীত হোক বা না হোক, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি বার্তা দেওয়া সম্ভব হবে যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরতে আগ্রহী এবং একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে নিজের দেশে ফেরার অধিকার প্রয়োগ করতে চান।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ট্রাভেল পাস হলো একটি বিশেষ ভ্রমণ নথি, যা সাধারণত বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে বা বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা হাইকমিশন ইস্যু করে। এটি পূর্ণাঙ্গ পাসপোর্ট নয়; বরং সীমিত উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত একটি অস্থায়ী ভ্রমণ দলিল। কোনো নাগরিকের পাসপোর্ট বাতিল, হারিয়ে যাওয়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নিজ দেশে ফেরার জন্য ট্রাভেল পাস ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েক নেতা মনে করেন, ট্রাভেল পাসের আবেদন করার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করা সম্ভব হবে। কারণ আন্তর্জাতিক আইনের সাধারণ নীতিতে একজন নাগরিককে নিজ দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে আবেদনটি প্রত্যাখ্যাত হলে সেটিও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
দলটির ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো আরও বলছে, এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো দেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করা। গত দুই বছরে দলের অনেক শীর্ষ নেতা কারাগারে গেছেন, কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন, আবার অনেকে বিদেশে অবস্থান করছেন। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের বার্তা তৃণমূলের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, দেশে ফেরা নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ মূলত দুটি বার্তা দিতে চাইছে। প্রথমত, দলটি এখনো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনা নিজেকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে মনে করছেন না এবং সুযোগ তৈরি হলে দেশে ফিরে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
তবে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সত্যিই আগস্টে ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করবেন কি না, আবেদন করলে সেটি কী পরিণতি পাবে এবং দেশে ফেরার বাস্তব সুযোগ তৈরি হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে এই উদ্যোগ ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।