বগুড়া মহানগরীর চারমাথা এলাকায় জেলা শ্রমিক দল নেতার সেঞ্চুরি মোটেলে নারী নিয়ে ফুর্তি করতে গিয়ে যৌন উত্তেজক সিরাপ সেবন করায় সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বিপুল চন্দ্র পালের (৫০) অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
হোটেলের ম্যানেজারের দাবি উপেক্ষা করে সিসিটিভি ফুটেজে বোরকা পরিহিত এক নারীর সঙ্গে বিপুলকে দেখা যাওয়ায় পুলিশ ও অন্য সবার মনে এ ধারণা জন্মেছে।
তবে মৃতের স্ত্রী লিপি রানী পাল দাবি করছেন, সারিয়াকান্দির রক্সি নামে এক ব্যক্তি তার স্বামীকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে। হোটেল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি চাপা দিতে নিহতের পরিবারের সঙ্গে সমঝোতা করার চেষ্টা করছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ আলম জানান, পরিবার থেকে মামলা দিলে অভিযোগের ব্যাপারে তদন্ত করা হবে।
স্থানীয়রা জানান, বগুড়া জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল হামিদ মিটুল বেশ কয়েক বছর আগে চারমাথা এলাকায় সেঞ্চুরি মোটেল নামে আবাসিক হোটেল প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর থেকে ওই হোটেলে যৌন ব্যবসা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বোর্ডারদের ফ্রি টিস্যু, পানি, তোয়ালে ও সাবান সরবরাহ করা হয়ে থাকে বলে স্থানীয়রা জানান।
মৃত বিপুল চন্দ্র পাল বগুড়া সদরের এরুলিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের দুইবারের সাবেক সদস্য ও এরুলিয়া পালপাড়ার জীতেন্দ্র নাথ পালের ছেলে। বর্তমানে তিনি শাহ ফতেহআলী পরিবহণের সুপারভাইজার পদে চাকরি করতেন। বাড়ি কাছে হওয়ার পরও তিনি মাঝে মাঝে সেঞ্চুরি মোটেলে রাত্রিযাপন করতেন।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী তিনি শুক্রবার রাত ৯টার দিকে এক নারীসহ হোটেলে এসে দোতলার একটি কক্ষে উঠেন। এর দুই ঘণ্টা পর লিফটের ৬ষ্ঠ তলার ৬১০ নম্বর কক্ষে পার হন। সেখানে ফুর্তির পর ওই নারী বেরিয়ে যান।
পরদিন শনিবার বেলা ১২টার দিকে কর্মচারীরা রুম ছেড়ে দেওয়ার জন্য ডাকতে গেলে বিপুল চন্দ্র পালের কোনো সাড়াশব্দ পাননি। এ ব্যাপারে সন্দেহ হলে পুলিশে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে সদর থানা ও নিশিন্দারা উপশহর ফাঁড়ির পুলিশ সেখানে যায়। তারা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে বিকল্প চাবি দিয়ে রুম খুললে বিছানায় বিপুল চন্দ্র পালের লাশ দেখতে পান।
ওই রুমে যৌন উত্তেজক সিরাপ, ঘুমের ট্যাবলেট, কোমল পানীয় ও খাবারের পানির বোতল পাওয়া যায়।
সুরতহাল শেষে পুলিশ বিপুল চন্দ্র পালের লাশ উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, যৌনকর্মী নিয়ে ফুর্তি করতে গিয়েই যৌন উত্তেজক ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় বিপুলের মৃত্যু হয়েছে।
সেঞ্চুরি মোটেলের ব্যবস্থাপক এনামুল হক প্রথমে দাবি করেছেন, বিপুল একাই কক্ষটি ভাড়া নিয়েছিলেন; কিন্তু সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়ার পর ঘটনার নাটকীয় মোড় নেয়।
এদিকে বিপুল চন্দ্র পালের স্ত্রী লিপি রানী পাল দাবি করেছেন, শুক্রবার রাতে তার স্বামী মোবাইল ফোনে জানিয়েছিলেন, তিনি সারিয়াকান্দির রক্সি নামে এক ব্যক্তির বোনের বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাচ্ছেন। বাড়িতে ফিরতে রাত ১টা বাজতে পারে। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। স্ত্রীর দাবি রক্সি নামে ওই ব্যক্তি বিপুলকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।
বিপুলের মেয়ে প্যারা-মেডিকেল কলেজের প্রথমবর্ষের ছাত্রী তিথি রানী পাল জানান, হোটেলের কক্ষ থেকে যৌন উত্তেজক ওষুধ পাওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। বাবাকে হত্যার ঘটনা চাপা দেওয়ার জন্য এসব বলা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে কাকে দেখা গেছে তাও পরিষ্কার হওয়া দরকার। রক্সিকে গ্রেফতার করলেও তার বাবা বিপুল চন্দ্র পালের মৃত্যুরহস্য উন্মোচিত হবে।
এরুলিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের মেম্বার নূর আলম বলেন, বিপুলের সঙ্গে কারো কোনো শত্রুতা ছিল না। তিনি এ ব্যাপারে সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানিয়েছেন।
সেঞ্চুরি মোটেলের মালিক জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল হামিদ মিটুল ফোন বন্ধ রাখায় এ ব্যাপারে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বগুড়া সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহফুজ আলম জানান, হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজে বিপুলের সঙ্গে বোরকা পরিহিত এক নারীকে দেখা, কক্ষে যৌন উত্তেজক সিরাপ পাওয়ায় প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নারী নিয়ে ফুর্তি করতে গিয়েই যেকোনোভাবে তার (বিপুল) মৃত্যু হয়েছে। পরিবার হত্যা দাবি করলে এ ব্যাপারে তাদের মামলা দিতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে রোববার দুপুর পর্যন্ত কেউ এ ব্যাপারে থানায় আসেননি।