রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত রামিসা ধর্ষণ-হত্যার ঘটনায় মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
রবিবার (৭ জুন) মামলার রায় ঘোষণার পর মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি সোহেলের নিজ গ্রাম নাটোরের সিংড়া উপজেলার মহেশচন্দ্রপুরের মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করে। তবে ছেলে হত্যাকারী হলেও তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশে শোকগ্রস্ত সোহেলের পরিবার।
রবিবার দুপুরে সোহেলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনের ঘরের বারান্দায় বসে রয়েছেন সোহেলের বাবা ও মা। কথা বলার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলছেন তারা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে সোহেলের বাবা জাকির হোসেন বলেন, ‘অপরাধী হলেও সোহেল আমার ব্যাটা (ছেলে)। আমি গরিব মানুষ। আপিল করার সামর্থ্য নাই আমার।
সোহেলের মা বলেন, ‘হাজার হলেও সোহেল আমার ব্যাটা। তার এই ফাঁসির রায় মাইনা লিতে আমার বুক ফাইট্যা যাচ্ছে। কিন্তু আমার ছেলে অপরাধী। তাই আমাদের কিছুই করার ক্ষ্যামতা নাই।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সোহেলের বোন জলি বেগম বলেন, ‘আমার ভাইয়ের ফাঁসি হবে, এটা আমরা ধারণা করছিলাম। ফাঁসির রায় আমরা মেনে নিছি। আমাদের সামর্থ্য থাকলে আপিল করতাম।’
প্রতিবেশী সেন্টু ও মকুল জানান, তারা এই মামলার রায়ে খুশি। দ্রুত বিচারের রায় কার্যকর করার দাবি জানান তারা। সেন্টু বলেন, ‘একজন মেয়ের বাবা হিসেবে এ ধরনের অপরাধ মেনে নেওয়ার মতো নয়। যেভাবে একটা শিশুকে হত্যা করা হয়েছে, তার বিচার হওয়া খুবই প্রয়োজন।’
এদিকে সিংড়া পৌর শহরের ভালোবাসা মহল্লায় সোহেলের স্ত্রী স্বপ্নার বাবার বাড়ির এলাকায় গিয়ে জানা যায়, সেখানে এখন তাদের ঘরবাড়ি নেই। স্থানীয়রা জানায়, স্বপ্নার বাবা জিয়াদুল ইসলাম পৈতৃক সূত্রে যে জায়গা পেয়েছিলেন, তা তার আরেক মেয়ের চিকিৎসার জন্য বিক্রি করে দিয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি মহল্লার একটি ক্লিনিকে চাকরি করেন এবং সেখানেই থাকেন। আর স্বপ্নার মা থাকেন রাজশাহীতে সেই মেয়ের বাড়িতে।
ভালোবাসা মহলায় অবস্থিত ওই ক্লিনিকে গিয়ে কথা হয় জিয়াদুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ ঘটনা (শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা) মেনে নেওয়ার মতো না। আমি মেয়েকে আগেই ত্যাজ্য করেছিলাম। মেয়ের এই রায়ে আমি খুশি। বিচার বাস্তবায়ন হোক। পরিবার থেকে কোনো আপিল করব না।’
প্রতিবেশী আবুবক্কর ও আবু সাইদ বলেন, ‘স্বপ্নার কপালে শনি পড়েছে। সোহেল তার তৃতীয় স্বামী। বাবা-মার অমতে তাকে (সোহেল) বিয়ে করার পর তার (স্বপ্না) সঙ্গে পরিবারের কোনো সম্পর্ক ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘সঙ্গ দোষে যেমন লোহা ভাসে, স্বপ্না তেমনি এমন ঘটনায় জড়িত হয়েছে। সোহেলের মতো খারাপ ছেলের সঙ্গে বিয়ে হওয়াই তার কাল হয়েছে। আমরা তাদের দুজনের শাস্তি চাই।’
এলাকাবাসীর ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সোহেলের রয়েছে কলঙ্কিত অতীত। এলাকায় পরকীয়া, চুরি, ছিনতাই, মাদক কারবারসহ নানা অপরাধে লিপ্ত ছিলেন তিনি। চার বছর আগে স্ত্রী স্বপ্নাকে নিয়ে সিংড়া ছেড়ে ঢাকায় চলে যান সোহেল।
গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীর একটি বাসা থেকে আট বছরের শিশু রামিসার খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ফ্ল্যাটটিতে বসবাসকারী সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলাটি তদন্ত করে ঘটনার ৫ দিনের মাথায় ২৪ মে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন পল্লবী থানার উপপরিদর্শক অহিদুজ্জামান ভূঁইয়া। ওই দিনই শিশু ট্রাইব্যুনালে মামলাটি বিচারের জন্য নথি বদলি করা হয়। তবে সেদিন থেকে ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হওয়ায় গত ১ জুন মামলাটির চার্জ গঠনের দিন ধার্য করা হয়। ঈদের পর ১ জুন মামলার চার্জ গঠন শেষে আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়।
পরদিন ২ জুন মামলাটির ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে রামিসার বাবা, মা, বোন, স্বজনসহ ১৬ জনের সাক্ষ্য শেষ হয়। ৩ জুন মামলায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন ও ৪ জুন মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি হয়।