Image description
আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং গোয়েন্দা কূটনীতির জগতে কিছু চরিত্র থাকেন যারা ইতিহাস তৈরি করেন সম্পূর্ণ নিঃশব্দে, ছায়ার আড়ালে থেকে। একবিংশ শতাব্দীর মধ্যপ্রাচ্য তথা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এমন একটি রহস্যময় ও প্রভাবশালী নাম হাকান ফিদান (Hakan Fidan)। তুরস্কের দীর্ঘকালীন গোয়েন্দা প্রধান (MIT Chief) এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিদান এমন এক ব্যক্তিত্ব, যাকে বুঝতে হলে আঙ্কারা এবং তেল আবিবের দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চশমায় চোখ রাখতে হবে।
একপক্ষের কাছে যিনি জাতীয় সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী ও কৌশলগত মাস্টারমাইন্ড, অন্যপক্ষের কাছে তিনি সমীকরণ ওলটপালট করে দেওয়া এক দুর্দান্ত, বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং গোয়েন্দা বিশ্লেষণের নিরিখে হাকান ফিদানের এই দ্বিমুখী দ্বান্দ্বিক রূপটি বর্তমান বিশ্বরাজনীতির এক অন্যতম আকর্ষণীয় অধ্যায়।
আঙ্কারার চশমায়: 'কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন'
তুর্কি নীতিনির্ধারক এবং প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের চোখে হাকান ফিদান কেবল একজন আমলা বা কূটনীতিবিদ নন; তিনি আধুনিক তুরস্কের "Strategic Autonomy" বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বিনির্মাণের প্রধান কারিগর।
১৯৬৮ সালে আঙ্কারায় জন্ম নেওয়া ফিদানের উত্থান কোনো প্রথাগত রাজনৈতিক পরিবার থেকে হয়নি। তুর্কি সশস্ত্র বাহিনীতে একজন নন-কমিশন্ড অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও তার মেধার বিস্তৃতি ছিল অনেক গভীরে। সামরিক বাহিনীতে থাকাকালীনই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা নেন। পরবর্তীতে আঙ্কারার বিলকেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন, যার মূল গবেষণার বিষয়ই ছিল “পররাষ্ট্রনীতিতে গোয়েন্দা তথ্যের ভূমিকা” । তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এই বিরল সংমিশ্রণই তাকে পরবর্তী সময়ে অনন্য করে তোলে।
২০১০ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে হাকান ফিদান যখন তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (MIT)-র ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন থেকেই তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। তার ১৩ বছরের মেয়াদে MIT প্রথাগত অভ্যন্তরীণ নজরদারি সংস্থা থেকে রূপান্তরিত হয়ে একটি বৈশ্বিক ‘পাওয়ার প্রজেকশন’ বা শক্তি প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
২০১৬ সালের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের রাতে ফিদানের নিখুঁত ও ঠান্ডা মাথার প্রতিরোধ এরদোয়ান সরকারকে রক্ষা করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।
সিরিয়া, লিবিয়া এবং নাগর্নো-কারাবাখ যুদ্ধে তুরস্কের সামরিক ড্রোন প্রযুক্তির (Bayraktar TB2) সাথে গোয়েন্দা তথ্যের যে যুগান্তকারী সমন্বয় দেখা গেছে, তার নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ছিলেন ফিদান।
২০২৩ সালে ছায়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে যখন তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন তা ছিল মূলত তুরস্কের ‘ছায়া কূটনীতি’ বা 'Intelligence Diplomacy' কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা মাত্র।
তেল আবিবের চোখে হাকান ফিদান কেমন?
ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা এস্টাবলিশমেন্ট (বিশেষ করে মোসাদ)-এর কাছে হাকান ফিদান একটি অত্যন্ত পরিচিত, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং সতর্কতার সাথে পাঠ্য অধ্যায়। ইসরায়েলি ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য ফিদান একাধারে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা এবং সংকটের মুহূর্তে যোগাযোগের একমাত্র বিশ্বাসযোগ্য মাধ্যম। রহস্যময় ব্যক্তিত্ব।
২০১০ সালে ফিদান যখন MIT-র দায়িত্ব নেন, তখনই ইসরায়েলের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এহুদ বারাক প্রকাশ্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ফিদান তুরস্কের পুরোনো গোয়েন্দা অংশীদারিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ। ইসরায়েলের এই আশঙ্কা যে অমূলক ছিল না, তার প্রমাণ মেলে ২০১৩ সালে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম *ওয়াশিংটন পোস্ট*-এর এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয় যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নজরদারির জন্য মোসাদ যেসব ইরানি নাগরিককে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ করেছিল, হাকান ফিদানের তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা তাদের চিহ্নিত করে। এরপর ফিদান সেই ১০ জন ইসরায়েলি এজেন্টের তালিকা সরাসরি তেহরানের হাতে তুলে দেন। মোসাদের ইতিহাসে এটিকে অন্যতম বড় কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ধাক্কা হিসেবে দেখা হয়, যা ইসরায়েল-তুরস্ক সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী শীতলতার দিকে ঠেলে দেয়।
ইসরায়েলের জন্য ফিদানকে এড়িয়ে চলা অসম্ভব হওয়ার দুটি মূল কারণ রয়েছে:
১. ফিদানের সুদূরপ্রসারী কৌশলের অংশ হিসেবেই হা.মাসের রাজনৈতিক ব্যুরো আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পায়। ইসরায়েলের চোখে এটি "সন্ত্রাসের পৃষ্ঠপোষকতা" হলেও তুরস্কের কাছে এটি ছিল মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে নিজেদের হাত শক্ত রাখার একটি কার্ড।
২. কূটনৈতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ছিন্ন থাকার সময়েও মোসাদের তৎকালীন প্রধানদের সাথে ফিদানের গোপন চ্যানেল সচল ছিল। ২০২২ সালে ইস্তাম্বুলে ইসরায়েলি পর্যটকদের ওপর ইরানি হামলার ছক যখন ফিদানের MIT নস্যাৎ করে দেয়, তখন ইসরায়েল বুঝতে পারে, ফিদান তাদের আদর্শিক শত্রু হতে পারেন, কিন্তু তিনি একজন চরম পেশাদার খেলোয়াড়।
একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে গোয়েন্দা প্রধান যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন, তখন কূটনীতি আর কেবল আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা হয়ে ওঠে দাবা খেলার নিখুঁত চালের মতো। হাকান ফিদানকে এই দুই বিপরীতমুখী দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে পরিষ্কার চিত্র ফুটে ওঠে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের দৃষ্টি বাজপাখির মত। তিনি গতানুগতিক পলিটিক্স থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হন নাই। গোয়েন্দা চীফ থেকে হয়েছেন। অতএব তাঁর দেখার চশমা গতানুগতিক রাজনৈতিক দৃষ্টির বাইরে। তাঁর সাথে কেবল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের তুলনা চলে। তাই সঙ্গত কারনেই প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উত্তরসূরী হিসেবে হাকান ফিদানের নাম শোনা যাচ্ছে।
 
-সাইফুল খান