Image description

টেলিভিশন আর আধুনিক ডেটা বা উপাত্তের মেলবন্ধন ফুটবলকে দেখার ও বোঝার চিরচেনা উপায়টি পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনালটি প্রথমবারের মতো প্রায় ৪০ কোটি মানুষ টেলিভিশনে দেখছিলেন। এর আগে ১৯৫৪ সালের টুর্নামেন্ট পর্যন্ত বিশ্বকাপ মোটেও টেলিভিশনে দেখানো হতো না। ভক্তরা খেলার খবর জানতে পরদিন সংবাদপত্র কিনতেন। থ্রি-পিস স্যুট পরা, চুরুট ফুঁকানো ক্রীড়া লেখকদের কলাম পড়ে ম্যাচ সম্পর্কে ধারণা নিতেন। কিন্তু ১৯৬৬ সাল থেকে দর্শকরা নিজেরাই সাদা-কালো পর্দায় খেলার গতিপ্রকৃতি সরাসরি দেখার সুযোগ পান। টেলিভিশনে ফুটবল সম্প্রচারের এই বিপ্লব পরোক্ষভাবে ফুটবলকে উপাত্তে রূপান্তর করার পথ খুলে দেয়। ‘অপটা’ নামের ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬৬ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপ ম্যাচের ভিডিও নিখুঁতভাবে খতিয়ে দেখে খেলোয়াড়দের প্রতিটি স্পর্শের হিসাব বের করেছে। এর ফলে ফুটবল ইতিহাসের বিখ্যাত সব মুহূর্ত এখন স্প্রেডশিটের সারিতে বন্দি হয়ে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের সুযোগ করে দিয়েছে, যা আগে কেবল মানুষের স্মৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। গত ১৫টি বিশ্বকাপের এই পরিবর্তনের গল্পই মূলত লং বলের আদিম যুগ থেকে আধুনিক টিকিটাকা বা বল ঘোরানোর বিবর্তনের ইতিহাস।

লং বলের যুগ: ১৯৬৬-১৯৭০

১৯৬৬ সালের ওয়েম্বলি ফাইনালের ফুটবল আজকের ফুটবলের চেয়ে একদম আলাদা ছিল। তখনকার পাসের দৈর্ঘ্য ছিল অনেক বেশি; ওই ফাইনালে ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির পাসের ২৫ শতাংশই ছিল অন্তত ২০ গজ দূরত্বের লম্বা পাস। এর বিপরীতে, ২০২২ সালের বিশ্বকাপে কেবল একটি ম্যাচেই (গ্রুপ পর্বে ইরান বনাম ওয়েলস) এমন লম্বা পাসের আধিক্য দেখা গিয়েছিল। লং বলের যুগে বল সব সময় মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার কারণে খেলোয়াড়রা নির্দিষ্ট পজিশন বা অবস্থান নিয়ে খুব একটা কঠোর ছিলেন না। সে সময় কোনো খেলোয়াড়ের মাঠে বদলি হওয়ার আগের দীর্ঘতম সময়ে তার গড় অবস্থান বা ‘পাসিং নেটওয়ার্ক’ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডিফেন্ডাররা দল থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে একাকী পজিশনে ভাসতেন।

তখনকার ফুটবল মূলত ‘পজেশন ভ্যালু’ বা বলের দখলের মূল্যের ওপর ভিত্তি করে চলত, যার সহজ অর্থ হলো বল যত প্রতিপক্ষের গোলের কাছে যাবে, গোল হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে। ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে দলগুলো প্রতিটি ব্যাকপাস বা পেছনের পাসের বিপরীতে সাত গজ সামনে বল বাড়াত, যা ২০২২ সালে এসে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। পেপ গার্দিওলা একবার লিখেছিলেন, ‘পেছনে পাস দেওয়া মানে ভয় পাওয়া নয়, বরং আরও একটি ভালো আক্রমণ শুরু করা।’ এক প্রজন্ম আগে এমন কথা বললে হয়তো কোনো কোচের চাকরিই থাকত না। এছাড়া ১৯৭০ সালে ৬২ শতাংশ শট পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া হতো, যা ২০০৬ সালে ৫৪ শতাংশে নেমে আসে। ৫০ বছর আগে একটি গোল করতে যেখানে ১৫টি শটের প্রয়োজন হতো, সেখানে আধুনিক ফুটবলে প্রতি ৯টি শটের একটি গোল হচ্ছে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের ছোট ছোট পাস এবং বলের ঘূর্ণনের ফুটবল প্রাচীন ও আধুনিকতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ ছিল, যা আজকের ৪-২-৩-১ ফর্মেশনের সাথে অনেকটাই মিলে যায়।

মিডফিল্ডের যুগ: ১৯৭৪-১৯৮২

ফুটবলের এই যুগগুলো আসলে বিশ্লেষকদের তৈরি করা, তবে ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে ববি মুরের লম্বা বল ছোঁড়ার দিন শেষ হয়ে বিশ্বকাপের পুরো ধরনটাই বদলে যেতে শুরু করে। ১৯৬৬ সালে ফুটবলের মাঝমাঠ যেখানে একদম ফাঁকা থাকত, ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে সেই চিত্রটি পুরোপুরি উলটে যায়। দলগুলো মাঠের দুই প্রান্ত বা উইং ব্যবহার না করে সরাসরি মাঝমাঠ দিয়ে খেলা তৈরি করতে শুরু করে। ১৯৬৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বল নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং পাস দেওয়ার মধ্যবর্তী গড় সময় প্রায় ১৫ শতাংশ কমে ৩.৪ সেকেন্ড থেকে ২.৯ সেকেন্ডে নেমে এসেছে। দলগুলো ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে মিডফিল্ড পার হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কেবল ড্রিবলিং নয়, বরং সেখানে একটি পরিকল্পিত পাসিং গেম তৈরি করা। ১৯৭৪ সালে রিনাস মিশেলসের বিখ্যাত নেদারল্যান্ডস দল তাদের ‘টোটাল ফুটবল’ বা সামগ্রিক ফুটবলের মাধ্যমে বিশ্বকে লং বলের যুগ থেকে বের করে আনে, যেখানে জোহান ক্রুইফের মতো ক্রিয়েটিভ ফরোয়ার্ড নিচে নেমে এসে মাঝমাঠে শক্তিশালী ত্রিভুজ তৈরি করতেন।

রক্ষণভাগের যুগ: ১৯৮৬-১৯৯০

টোটাল ফুটবলের সুন্দর পাসিং ত্রিভুজ ছাড়াও ডাচরা ফুটবলে আরেকটি বড় কৌশল রেখে গেছে—তা হলো অফসাইড ট্র্যাপ । প্রতিপক্ষ যখন মাঝমাঠ দখল করতে শুরু করল, তখন ডিফেন্ডাররা নিজেদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে রক্ষণভাগকে ওপরে তুলে এনে লাইন্সম্যানদের সাহায্য নিতে শুরু করল। ১৯৮০-এর দশকে অফসাইডের সিদ্ধান্ত এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, ১৯৯০ সালে ফিফাকে নিয়ম পরিবর্তন করে বলতে হয় যে, আক্রমণভাগের খেলোয়াড় শেষ ডিফেন্ডারের সমান লাইনে থাকলে তাকে অনসাইড ধরা হবে। এর ফলে ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে রেকর্ড ৮.৬টি অফসাইডের বাঁশি বেজেছিল। এছাড়া খেলোয়াড়রা যখন-তখন গোলরক্ষককে ব্যাকপাস দিয়ে সময় নষ্ট করত, যা খেলাকে জঘন্য ও বিরক্তিকর করে তোলে। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে গোলের গড় মাত্র ২.২-এ নেমে যাওয়ার পর ফুটবলের নিয়ন্ত্রকরা গোলরক্ষককে ব্যাকপাস দেওয়া নিষিদ্ধ করেন। নিয়ম পরিবর্তনের আগের এই দশকটি খুব আকর্ষণীয় ফুটবলের জন্য পরিচিত ছিল না এবং ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা তখন পুরোপুরি ম্যারাডোনা-নির্ভর দলে পরিণত হয়েছিল।

পরিবর্তনের যুগ: ১৯৯৪-২০০৬

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ব্যাকপাসের নিরাপত্তা হারিয়ে দলগুলোকে আবার সামনের দিকে পাস দেওয়া শিখতে হয়েছিল, তবে তাদের লড়াই করতে হয়েছিল আরনল্ডো সাচির জোনাল ৪-৪-২ প্রেস বা সুসংগঠিত রক্ষণ কৌশলের বিপক্ষে। আগে ডিফেন্ডাররা মূলত ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং করতেন, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অস্ট্রিয়ার সাবেক ম্যানেজার আর্নস্ট হ্যাপেল বলেছিলেন, ‘আপনি যদি ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং করেন, তবে আপনি মাঠে ১১টি গাধা পাঠাচ্ছেন।’ সাচির ইতলাই প্রথম ৪-৪-২ ফর্মেশনে সুসংগঠিত হয়ে জোনাল ডিফেন্সের চল শুরু করে। অন্য দলগুলোও এই কৌশল রপ্ত করায় প্রেস করার কার্যকারিতা বেড়ে যায় এবং পাসের সাফল্যের হার ১৯৮৬ সালের ৮২ শতাংশ থেকে কমে ২০০২ সালে ৭৬ শতাংশে নেমে আসে। ২০০২ সালের টুর্নামেন্টে ৩২ শতাংশ গোল হয়েছিল ক্রসের সূত্র ধরে, যা প্রথাগত ৪-৪-২ ফর্মেশনের সোনালী সময় ছিল। ২১ শতকের শুরুতে ফুটবল দলগুলো ‘ট্রানজিশন’ বা দ্রুত গতি পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে এবং দলগুলো জোরে প্রেস করে প্রতিপক্ষকে গুছিয়ে ওঠার সময় দিত না। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ফরোয়ার্ডের ভূমিকাটি পুরোদস্তুর অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের রূপ নেয় এবং উইঙ্গাররা ইনভার্টেড উইঙ্গার হিসেবে দূর থেকে শট নেওয়ার কৌশল বেছে নিলে ফুটবল আধুনিক রূপ পায়।

বল সার্কুলেশন বা বল ঘোরানোর যুগ: ২০১০-২০১৮

২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের অপরাজেয় পথচলা মূলত বল সার্কুলেশন বা বল ঘোরানোর আধুনিক টিকিটাকা যুগের সূচনা করে। মাঝমাঠে দুজন খেলোয়াড়ের জায়গায় স্পেন চার বা পাঁচজন মিডফিল্ডার নিয়ে খেলা শুরু করে এবং ২০১০ সালের বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে গড়ে ৫২৫টি পাস সম্পন্ন করে লং বলের ব্যবহার মাত্র ৭.৭ শতাংশে নামিয়ে আনে। স্পেনের এই পাসিংয়ের মূল উদ্দেশ্য কেবল বলের দখল বা পজেশন ধরে রাখা ছিল না, বরং ব্যাকপাস এবং সাইডপাসের মাধ্যমে তারা এমন এক ফুটবল তৈরি করে যা প্রেস করা প্রতিপক্ষের জন্য অসম্ভব ছিল। এর ফলে দলের সব খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের অর্ধে চলে আসতে পারতেন এবং বল হারানোর সাথে সাথে তা ফিরে পাওয়ার জন্য ‘কাউন্টার-প্রেসিং’ বা ‘রেস্ট ডিফেন্স’ কৌশলের সর্বোচ্চ ব্যবহার শুরু হয়। তবে এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে দুর্বল দলগুলো স্পেনের মতো খেলার চেষ্টা না করে গভীর রক্ষণভাগ বা ডিপ ব্লকে (deep block) খেলা শুরু করে এবং কাউন্টার অ্যাটাকের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। এর ফলে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে ফ্রান্স একদম সরাসরি ফুটবল খেলে এবং সেট-পিসের ওপর ভর করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।

মেসির বিজয়: ২০২২

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ স্মরণীয় হয়ে থাকবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা মহাতারকা লিওনেল মেসির শিরোপা জয়ের জন্য। অতিরিক্ত সময়ের পর ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচটি টাইব্রেকারে জিতে নেয় আর্জেন্টিনা, যেখানে এমবাপের হ্যাটট্রিকও ফ্রান্সকে জেতাতে পারেনি। আর্জেন্টিনার পাসিং নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সব আক্রমণ যেন এই জাদুকরের পায়ের মাধ্যমেই ডানা মেলছিল। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে মেসির সেই বিখ্যাত অ্যাসিস্টটি ছিল এই টুর্নামেন্টের সেরা প্রতিচ্ছবি, যেখানে তিনি বাইলাইন থেকে কাটব্যাকের মাধ্যমে বল বাড়িয়েছিলেন। কাতারে প্রতিপক্ষ দলগুলো সুসংগঠিত মিড-ব্লক তৈরি করে রাখায় ফাইনাল থার্ডে বল নেওয়ার ক্ষেত্রে মাঝমাঠের ব্যবহার কমে মাত্র ১৬ শতাংশে নেমে আসে, যা গত ১৫টি টুর্নামেন্টের মধ্যে সর্বনিম্ন। দলগুলোকে প্রতিপক্ষের ব্লকের চারপাশ দিয়ে ঘুরে আক্রমণে যেতে হতো বিধায় কাতার বিশ্বকাপে প্রতি ম্যাচে কাটব্যাকের মাধ্যমে ২.৩টি সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা ১৯৭৮ সালের পর সর্বোচ্চ। এছাড়া খেলোয়াড়দের সতেজতার কারণে কাতার বিশ্বকাপে ওপেন প্লে থেকে ১৩০টি গোল আসে এবং সেট-পিস থেকে গোল এসেছে মাত্র ২৪ শতাংশ—যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বনিম্ন।

লিডারবোর্ড

বিশ্বকাপের সামগ্রিক ডেটা পর্যালোচনা করলে পজেশন ভ্যালু এবং মাঠের পারফরম্যান্সের মানদণ্ডে সবার ওপরে আছেন ডাচ কিংবদন্তি জোহান ক্রুইফ। এছাড়া মেসুত ওজিল এবং অ্যালেক্সিস সানচেজের মতো খেলোয়াড়রা বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন। জুরগেন গ্রাবোস্কি বা আরিয়েল ওর্তেগার পরিসংখ্যানও ছিল অসাধারণ। আর দলগুলোর পারফরম্যান্সের বিচারে ১৯৬৬ সাল থেকে গোল ব্যবধানের দিক থেকে সবচেয়ে সফল অঞ্চল হলো পশ্চিম ইউরোপ এবং দক্ষিণ আমেরিকা। ১৯৬৬ সাল থেকে ব্রাজিলের গোল ব্যবধান প্রতি ম্যাচে নিখুঁত ১.০০ (৮৫ ম্যাচে +৮৫) এবং জার্মানি রয়েছে ঠিক তার পেছনে (০.৯৮)। বিশ্বকাপে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিলই ডেটার তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে। ফুটবল রোমান্টিকদের সেই চেনা উক্তিটি তাই ডেটার খতিয়ানেও সত্যি প্রমাণিত হয়—‘জোগা বনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল যার নাম, সুন্দর ফুটবলই তার স্বভাব—এ নিয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।

সংবাদসূত্রঃ দ্য অ্যাথলেটিকস