Image description

‘যাওয়ার দিন বিমান থেকে আব্বুর সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। আব্বু জিজ্ঞেস করেছে কী আনবে। আমি চিন্তা করে জানাব বলেছি। আব্বু বলেছে কি কি লাগবে তা হোয়াটসঅ্যাপে লিখে পাঠাতে। নিয়ে আসবে।‘ তৃতীয় শ্রেণির আরিফার সঙ্গে বাবা নুরুল আমিন সোহাগের শেষ কথোপকথন ছিল এমনই। আর কথা হয়নি। আর কখনো হবে না। ৩ জুন ভারতের দিল্লিতে ফ্লোরিশ স্টে বি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে মারা যান চট্টগ্রামের সোহাগ। আগেরদিন ২ জুন বোনের জামাই মোশাররফের চিকিৎসার জন্য সোহাগসহ পাঁচজন ভারতে পৌঁছেছিলেন।

ওই অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত সোহাগসহ ২১ জন মারা যায়। সোহাগের বোন রেহেনা আকতার মুন্নী, বোনের বর মোশাররফ হোসেনসহ বাকি চারজন গুরুতর আহত অবস্থায় দিল্লির হাসপাতালে এখন চিকিৎসাধীন। বাকি দুজন হলেন মোশাররফের চাচাতো বোন উম্মে জোহরা ও তার মেয়ে উম্মে সায়রা। মোশাররফের কিডনি প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে দিল্লিতে যান সবাই। জোহরা ছিলেন ডোনার।

সোহাগ ব্যবসা করতেন। তিনি দুই মেয়ে এক ছেলের জনক। বোনের জামাইয়ের চিকিৎসার দেখভালের জন্য সঙ্গী হয়েছিলেন। আজ শনিবার তিনি লাশ হয়ে ফিরছেন। রাতে লাশ চট্টগ্রাম পৌঁছার কথা। তাদের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। ছোটবেলা থেকেই বারোকোয়ার্টার এলাকার স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

লেকভিউ আবাসিক এলাকার নিজস্ব ভবনটিতে ঢোকার মুখে সোহাগের ছবি সম্বলিত শোক ব্যানার টানানো হয়েছে কয়েকটি। মানুষের মুখে মুখে শুধু আফসোস। বাড়ির কেয়ার টেকার আলী আকবর কথা বলতে গিয়ে চোখ মোছেন। তৃতীয় তলায় সোহাগতের বাসায় স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীর ভিড়।

বাবা বৃদ্ধ আবদুস সোবাহান ড্রয়িং রুমের ঘরের সোফায় বসা। তার চার ছেলে চার মেয়ের মধ্যে সোহাগ দ্বিতীয়। দুজন স্বজনকে দেখে সোবাহান বলে উঠলেন, ‘আল্লাহ আমার সুখের সংসারটা কেন তছনছ করে দিল।’

একটু থামলেন। দুজন তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। আবার বলার চেষ্টা করলেন বৃদ্ধ, ‘যাওয়ার সময় ছেলে বলল, আব্বা দোয়া কইরেন ‘ এবার ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। বাবার কান্না শুনে ভেতর থেকে মেয়ে দৌড়ে এলেন। এসব কথা তুলতে বারণ করলেন স্বজনদের।

পাশে বসা অপর বোন জামাই কবির আহমেদ বাচ্চু ফোন খুলে দুর্গটনার পর সোহাগের নিথর দেহের ভিডিও দেখালেন। ‘এমন ঘটনা আমাদের পুরো পরিবারে বিপর্যয় নেমে এসেছে। সোহাগের বোন মুন্নী ও মোশাররফের অবস্থা খুবই খারাপ। আমরা দুদেশের সরকারের কাছে আবেদন জানাই উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে।’

দুর্ঘটনার পর আরও তিন স্বজনকে দিল্লিতে পাঠানো হয়, আহতদের দেখভালের জন্য। খবর শুনে অস্ট্রেলিয়া থেকে ছুটে এসেছেন ছোট ভাই নুরুন্নবী বাবু, আয়ারল্যান্ড থেকে এসেছেন মেজ ভাই নুরুল কবির মিরন। ছোট ভাই আনোয়ারুল হক লিমন পর্তুগাল থেকে শুধু বাবা মা, ভাইপো ভাইঝিদের খোঁজ নিচ্ছেন।

শুক্রবার বাবা-মাকে সোহাগের দুঃসংবাদটি জানানো হয়। মা রোকেয়া বেগম ছেলের শোকে শয্যাশায়ী। সোহাগের স্ত্রী ফারজানা ফেরদৌস নির্বাক। একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে সোহাগের বড় ছেলে ইফাজুল আমিন আরাফ। ১২ বছরের ছেলেটি চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

১০ বছরের আরিফা ড্রয়িং রুমে দাদার পাশে এসে বসল। তার কোলে পাঁচ মাসের ছোটবোন আয়েশা। বাবাকে আর বায়নার তালিকা পাঠানো হয়নি আরিফার, হবেও না। আরিফা বলে, ‘আব্বু ফোনে বলেছিল বোনকে দেখে রাখতে।’

নাতনির এই কথা শুনে বৃদ্ধ আবদুস সোবাহান আরেকবার কাঁদলেন। সবাই চুপচাপ। আরিফা জানে বাবা নেই। কিন্তু ততটা উপলব্ধি করতে কি পারছে সে কী হারাল! কোলের আয়েশা তো বাবার মুখটিও মনে করতে পারবে না কোনোদিন।