Image description

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে আর্থিক, সামাজিক ও উৎপাদনশীল খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। তবে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে দেশের অর্থনীতির কিছু সূচকে কিছুটা স্বস্তি এলেও এই স্বস্তিকর অবস্থা বজায় রাখা বা স্থায়িত্বের উপকরণের বেশ ঘাটতি রয়েছে। কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো রয়ে গেছে। নতুন সরকারকে এখন অর্থনীতির এই স্বস্তি স্থায়ীকরণের ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। গতকাল রাজধানীর ধানমণ্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি: উত্তরণকালীন সময়ে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন এসব কথা বলেন।

দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে দেখা যাচ্ছে আর্থিক খাত, সামাজিক খাত এবং উৎপাদনশীল খাত নানা ধরনের চাপের মধ্যে রয়েছে। এসব চাপ নতুন কোনো ঘটনা নয়; বরং কয়েক বছর ধরেই তা দৃশ্যমান। মূল্যস্ফীতি, সরকারি অর্থায়ন, ব্যাংকিং খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সংকট ও চাপ বিদ্যমান, তা থেকে এখনো পুরোপুরি উত্তরণ সম্ভব হয়নি।

ব্রিফিংয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাজস্ব আহরণে সরকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেকখানি পিছিয়ে আছে, তাই আগামীতে এই খাতে বিশেষ জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে দেশের বাজারে মূল‍্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। দেশের মানুষকে প্রকৃত স্বস্তি দিতে হলে যেকোনো মূল্যে মূল‍্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে।

ব্যাংক খাতের চলমান সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, দেশের ব‍্যাংক খাতে এখনো কাক্সিক্ষত শৃঙ্খলা ফেরেনি। ফলে ব‍্যাংকগুলোর ওপর সাধারণ গ্রাহকের আস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। নতুন সরকারকে ব‍্যাংক খাতে দ্রুত শৃঙ্খলা ও সুশাসন ফেরানোর বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিদ্যমান সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, আইন ও বিধি-বিধানের যথাযথ বাস্তবায়নের অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিও সংকটকে আরও গভীর করছে।

সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, অর্থনীতির কিছু সূচকে বর্তমানে সাময়িক স্বস্তি দেখা গেলেও সেটিকে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, এসব অর্জনকে টেকসই করতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার ও রূপান্তর এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

তিনি সতর্ক করে বলেন, অর্থনীতির কিছু ক্ষেত্রে যে আপাত স্বস্তির চিত্র দেখা যাচ্ছে, তার আড়ালে বহু অমীমাংসিত দুর্বলতা রয়ে গেছে। এসব দুর্বলতা দূর করতে কার্যকর নীতি পদক্ষেপ ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

সিপিডি’র এই ব্রিফিংয়ে সংস্থার অন্যান্য গবেষক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা মনে করেন, সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর সংস্কার ছাড়া এই সাময়িক স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়।

সিপিডি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশে জ্বালানি সংকট ও লাগাতার মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে, যা পারিবারিক বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। 

এই মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো উচ্চ মূল্যস্ফীতি। তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে। মূলত জ্বালানি, পরিবহন এবং বিভিন্ন সেবামূলক খাতের ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই মূল্যস্ফীতি এই পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সিপিডি’র মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় যে হারে বাড়ছে, সাধারণ মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হার তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পরিসংখ্যান তুলে ধরে সিপিডি জানায়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দ্রুত পরিবহন খাতে ছড়িয়ে পড়েছে। বাসভাড়া বৃদ্ধির পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামও লাগামহীন হয়ে পড়েছে।
রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম মার্চ মাসে ১ হাজার ৩৪১ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জুন মাসে ১ হাজার ৮৮৫ টাকায় ঠেকেছে। অর্থাৎ, স্বল্প সময়ে এই জ্বালানির দাম বেড়েছে ৪০ শতাংশেরও বেশি।
নতুন করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ায় জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়বে। প্রবৃদ্ধিতেও পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। এমনটাই মনে করছে গবেষণা সংস্থা সিপিডি। সংস্থাটি বলছে সরকারি চাকুরেদের পে-স্কেল দেয়া যৌক্তিক হলেও, তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।