Image description

টেন্ডার বাক্স অথবা টেন্ডারবাজির মতো বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলো কি একসময় শুধু অভিধানের পাতায় ঠাঁই নেবে! সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়। কেননা, ধীরে ধীরে সরকারি কেনাকাটায় লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। ঘরে বসেই এখন সেরে ফেলা যাচ্ছে প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া। অন্য সরকারি কাজের মতো ঢাকঢোল পেটানো না হলেও এই ক্ষেত্রে কাজের কাজ হয়েছে ঠিকই। ই-টেন্ডারিংয়ের সুবাদে সরকারি কেনাকাটায় যেন ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব।

ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) চালুর মাধ্যমে সরকারি কেনাকাটায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। কমে এসেছে দুর্নীতি, অনিয়ম। টেন্ডার বাক্স ছিনতাই, মারামারি, কাটাকাটি এমনকি দরপত্র জমা দেওয়া নিয়ে খুনের মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো এখন অতীত হওয়ার পথে।

এত বড় একটা পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হলো? জানা গেছে, এর পেছনে কাজ করেছে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা। সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা হয়েছে বেশ শক্তপোক্ত। বাংলাদেশ এখন এ কাজে দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশ থেকে বিষয়টি বুঝতে ও শিখতে আসছে তাদের প্রতিনিধিরা। এরই মধ্যে ১১টি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিদল শিক্ষা সফর করে গেছে। সংখ্যাটা দিনে দিনে বাড়বে বলেই মনে করছেন ক্রয় কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা।

জানা যায়, সরকারি ক্রয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। প্রতি বছর প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমানের অর্থ এ খাতে ব্যয় হয়। এটি জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ৮৫ শতাংশ। এখানে কিছু একটা করা দরকার— এমন চিন্তা থেকেই ২০০১ সালে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ‘কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট (সিপিএআর)’ সরকারি ক্রয় ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের পথ দেখায়। এর ভিত্তিতে ২০০২ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) অধীনে ‘সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ)’ গঠন করা হয়। একই বছরে বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহায়তায় শুরু করা হয় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রিফর্ম প্রজেক্ট (পিপিআরপি)। ২০০৬ সালে সরকারি কেনাকাটায় আইন এবং ২০০৮ সালে বিধিমালা তৈরির মাধ্যমে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষের (বিপিপিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মঈন উদ্দীন আহম্মেদ আগামীর সময়কে বললেন, সরকারি ক্রয় সংস্কারের যে অর্জন, তা টেকসই করতে প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া এবং কার্যক্রম বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের আগে সমন্বিত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পরিবর্তনের শুরু যেখানে

ডিজিটাল রূপান্তরের বড় পদক্ষেপ আসে ২০১১ সালের ২ জুন, যখন ই-জিপি পোর্টাল চালু করা হয়। এর মাধ্যমে পরিকল্পনা থেকে চুক্তি ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত পুরো ক্রয়চক্র সম্পন্ন হচ্ছে অনলাইনে। সংস্কার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সিপিটিইউকে রূপান্তর করে গঠন করা হয় ‘বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (বিপিপিএ)’। পিপিআরপি বাস্তবায়নের পর বিপিপিএ বিশ্বব্যাংকের কারিগরি সহায়তায় ডিম্যাপ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। বর্তমানে চলছে পিএমআইপিএসডি প্রকল্পের কাজ। এখন সরকারি ক্রয়ে মোট ব্যয়ের প্রায় ৬৫ শতাংশ এই প্ল্যাটফর্মে সম্পন্ন হচ্ছে। পাশাপাশি শতভাগ ডিজিটাইজেশনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিপিপিএ।

সুবিধা যা মিলছে

ই-জিপি চালুর পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান থেকে চুক্তি স্বাক্ষরে গড় সময় নেমে এসেছে ৫৪ দিনে। ৯৯ শতাংশ চুক্তি প্রাথমিক বৈধতা মেয়াদের মধ্যেই সম্পন্ন হচ্ছে। দরপত্র ও চুক্তি তথ্য প্রকাশের হার পৌঁছেছে শতভাগে।

আইন ও বিধিমালা

২০২৫ সালে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা, ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়। পিপিআর, ২০২৫-এ ১৫৪টি বিধি ও ২১টি তফসিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। নতুন বিধিমালার গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক হলো অভ্যন্তরীণ ক্রয়ে ১০ শতাংশ কম বা বেশি মূল্যসীমা প্রত্যাহার করা। এর ফলে একক ঠিকাদারের একাধিক কাজ পাওয়ার আধিপত্য কমবে।

দুর্ভোগ কমে মিলছে সুফল

গত ২৮ সেপ্টেম্বর পিপিআর, ২০২৫ কার্যকর হওয়ার পর অল্প সময়েই দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। প্রতি দরপত্রে গড় দরদাতা সংখ্যা ২ দশমিক ২ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৪। এ ছাড়া দৈনিক নিবন্ধন আবেদন ৬ হাজার ৭০ থেকে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৩০০টি। নারী দরদাতা ৮ হাজারের বেশি, যার মধ্যে ২ হাজার নতুন নিবন্ধিত। গড় দর বিচ্যুতি ১০ শতাংশ থেকে কমে ৭ শতাংশে নেমেছে।

শিক্ষা নিতে এসেছে যেসব দেশ

বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা এবং এর ডিজিটাইজেশন অর্থাৎ ই-জিপি সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত বিপিপিএ পরিদর্শন করেছে বিশ্বের অনেকগুলো দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে তানজানিয়া, মিসর, মোজাম্বিক, নাইজেরিয়া ও ইথিওপিয়া। এ ছাড়া অস্ট্রিয়া, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, আফগানিস্তান, নেপাল, গাম্বিয়া, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), উই কানেক্ট ইন্টারন্যাশনাল, কোরিয়ান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি এবং সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজ (ইউকে)।

ই-জিপির মাধ্যমে নতুন কিছু উদ্যোগ

এরই মধ্যে ই-জিপি ব্যবস্থায় বেশ কিছু উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। এগুলো হলো— ই-অডিট ও ই-কন্ট্রাক্ট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, দরদাতাদের জাতীয় ডাটাবেজ, আইবাস প্লাস প্লাস, এনআইডি ও ই-পিএমআইএসের সঙ্গে আন্তঃসংযোগ স্থাপন এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র ও ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট। সেই সুবাদে অর্জিত হয়েছে চারটি আইএসও সনদ। এ ছাড়া ২০২২ সালে চালু হওয়া ই-পিএমআইএস নিশ্চিত করছে এডিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে রিয়েল-টাইম মনিটরিং। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সবুজ ও টেকসই সরকারি ক্রয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। একক দরদাতার ওপর নির্ভরতা কমানো এবং অতিমূল্য নির্ধারণের প্রবণতা কমাতে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সাফল্যের পেছনের চ্যালেঞ্জ

সরকারি ক্রয় সংস্কারে বিভিন্ন অর্জনের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। এর মধ্যে ক্রয়কারী ও দরদাতাদের সক্ষমতার ঘাটতি, দুর্বল চুক্তি ব্যবস্থাপনা, নৈতিক ঝুঁকি এবং বাজার বিশ্লেষণের সীমাবদ্ধতা অন্যতম। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, এখনো চ্যালেঞ্জ আছে বলেই শতভাগ সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া ই-জিপিতে করা যাচ্ছে না। যেমন উপজেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের ঘাটতি দক্ষতার ঘাটতি আছে। আমরা নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এরপরও এ কাজে পুরোপুরি দক্ষ জনশক্তি তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগবে।