পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। দেশের জন্য এটি এক অনন্য সম্মান। কিন্তু বাংলাদেশ কি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এর কোনও বিশেষ সুবিধা পাবে?
বিশ্লেষকদের মতে, সভাপতির ভূমিকা মূলত নিরপেক্ষ ও কাঠামোগত হওয়ায় বাংলাদেশ একে সরাসরি জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। তবে এটি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, শান্তিরক্ষা, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং ন্যায়সঙ্গত বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে বাংলাদেশকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করতে পারে।
জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের সাবেক মূখ্য লেখক ও পরিচালক এবং ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস ড. সেলিম জাহান এই বিষয়ে বলেছেন, ‘সভাপতি হয়ে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও সুবিধা আদায়ের সম্ভাবনা নেই।’
তার ভাষায়, ‘মোটামুটিভাবে ১৯৩টি দেশ যেখানে সাধারণ পরিষদের সদস্য, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক-আলোচনা হয়, কিন্তু সেটাকে একটা পথের দিকে বা একটা উপসংহারের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সভাপতির একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে। কিন্তু কোনো বিশেষ দেশের প্রতি মনোযোগ দেওয়া বা তাদের পক্ষপাতিত্ব করা সাধারণ অধিবেশনের সভাপতির কাজ নয়। তিনি এটা করতে পারেন না। সুতরাং বাংলাদেশ বিশেষ কোনো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক কোনো সুবিধা পাবে না।’
কূটনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ অবশ্য বিষয়টিকে দেখছেন অন্যভাবে। তার মতে, ‘বিশ্বের অন্যান্য দেশ যে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সর্বোচ্চ পদে সমর্থন করেছে, এটাই তো আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সবচেয়ে বড় বিজয়। তারা বাংলাদেশকে আমলে নিয়েছে এটা নিঃসন্দেহে একটা বড় অর্জন।’
তিনি বলেছেন, ‘ড. খলিল তো বলেছেন তিনি সবার প্রেসিডেন্ট হবেন, কোনও দেশের নয়। তাছাড়া সাধারণ অধিবেশনের সভাপতির কাজ নির্ধারিত। এর বাইরে গিয়ে কোনো বিশেষ দেশের প্রতি দূর্বলতা প্রকাশ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়।’
‘সাধারণ অধিবেশনের সকল সদস্য কোনো ইস্যুতে সমর্থন না করলে অথবা জাতিসংঘের স্থায়ী পরিষদের পাঁচ সদস্যের সমর্থন ছাড়া কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। সুতরাং ড. খলিলের পক্ষে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে কিছু করা সম্ভব নয়’, যোগ করেন তিনি।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন বলেছেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ায় প্রথমত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পরিচিতি ও আস্থার জায়গাটা আরো বিস্তৃত হল। সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের একটা লিডারশিপ তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বশান্তি ও অগ্রগতির জায়গায় আরো সুসংহত অবস্থানে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আশা করি বাংলাদেশ এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারবে। যদিও এটি সরাসরি কোনো আর্থিক সুবিধা বা বিশেষ ক্ষমতা দেয় না। তবে এটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রভাব, দৃশ্যমানতা ও আন্তর্জাতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করবে।’
এ বিষয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. শরীফ হাসান আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ‘এটি বাংলাদেশের জন্য কূটনৈতিক সুফল বয়ে আনতে পারে, তবে এই সুফল মূলত প্রতীকী এবং এজেন্ডা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।’
তার মতে, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির ভূমিকা মূলত নিরপেক্ষ ও প্রক্রিয়াগত হওয়ায় বাংলাদেশ একে সরাসরি কেবল জাতীয় স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। তবুও এটি জলবায়ু ন্যায়বিচার, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, শান্তিরক্ষা, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং ন্যায়সঙ্গত বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরতে বাংলাদেশকে পরোক্ষভাবে সহায়তা করতে পারে।’
গত মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে ৮ ভোটে পরাজিত করে এক বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন ড. খলিলুর রহমান। তিনি দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ এই পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এক বছরের জন্য সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি।