দেশের ছয় জেলায় বজ্রপাতে ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫, ময়মনসিংহ ২ এবং নীলফামারী, পঞ্চগড়, চুয়াডাঙ্গা ও বগুড়া জেলায় একজন করে মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন উপজেলা বজ্রপাতে তিন নারীসহ পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে শিবগঞ্জ উপজেলাতেই মারা গেছেন তিন জন। বৃহস্পতিবার বিকালে বৃষ্টির সময় বজ্রপাত হলে মারা যান তারা। সংশ্লিষ্ট থানার ওসিরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নিহতরা হলেন-সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের আতাহার এলাকার মো. রাব্বিলের ছেলে আব্দুল্লাহ, শিবগঞ্জ উপজেলার চককীর্তি ইউনিয়নের চকনরেন্দ্র গ্রামের আব্দুর রবের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার, রানীবাড়ি-বাজারপাড়ার আবুল কাশেমের মেয়ে সাদিয়া খাতুন, মোবারকপুর ইউনিয়নের শিকারপুর দক্ষিণপাড়ার ফিটু আলী ছেলে মো. মেসবাউল ও নাচোল উপজেলার লাহাবাড়ি গ্রামের সুমিয়ারা বেগম।
শিবগঞ্জ থানার ওসি মতিউর রহমান বলেন, শিবগঞ্জের তিনজনই মারা গেছেন বাড়ি সংলগ্ন আম বাগানে। বৃষ্টির মধ্যে বাগানে আম কুড়াতে গিয়ে মারা যান তারা। ওই তিন জনের পরিবারকে তাৎক্ষনিকভাবে ২৫ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি একরামুল হোসাইন বলেন, সদর উপজেলার আতাহারে বৃষ্টির মধ্যে মাঠে গরু আনতে যায় আব্দুল্লাহ। এ সময় বজ্রপাত হলে গুরুতর আহত হয় সে। স্থানীরা তাকে দ্রুত চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এছাড়া নাচোল উপজেলার লাহপাড়ায় মাঠে ঘাস কাটতে গিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফেরার সময় বজ্রপাতে মারা সুমিয়ারা বেগম। নাচোল থানার ওসি সুকোমল চন্দ্র দেবনাথ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সদর ও নাচোল উপজেলায় মৃতদের পরিবারকেও ২৫ হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেয়া হরে বলে জানানো হয়েছে।
ময়মনসিংহ অফিস থেকে জানিয়েছে, ময়মনসিংহের দুই উপজেলায় বজ্রপাতে এক কলেজশিক্ষকসহ দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টায় গফরগাঁও উপজেলায় সিয়াম (২৮) নামে এক যুবক এবং দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে মুক্তাগাছায় এএসএম খালেকুল আজাদ (৫৬) নামে এক কলেজশিক্ষকের মৃত্যু হয়।
নিহত সিয়াম উপজেলার পাগলা থানার পাঁচভাগ ইউনিয়নের মধ্য লামকাইন গ্রামের মৃত রুকন উদ্দিনের ছেলে এবং শিক্ষক খালেকুল আজাদ উপজেলার বড়গ্রাম ইউনিয়নের রঘুনাথপুর রৌয়ারচর গ্রামের মৃত হাজী ইউসুফ আলীর ছেলে। তিনি মুক্তাগাছা উপজেলার গাবতলী ডিগ্রি কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বাড়ির আঙিনায় ধানের কাজ করছিলেন সিয়াম। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে হোসেনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
পাগলা থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এদিকে মুক্তাগাছায় বজ্রপাতে এএসএম খালেকুল আজাদ (৫৬) নামে এক কলেজশিক্ষকের মৃত্যু হয়। দুপুর সোয়া ১টায় উপজেলার রঘুনাথপুর রৌয়ারচর বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কলেজ বন্ধ থাকায় নিজ গ্রামে একটি মসজিদের নির্মাণকাজ তদারকি করছিলেন খালেকুল আজাদ। দুপুর ১টা ১৫ মিনিটের দিকে বৃষ্টির সঙ্গে আকস্মিক বজ্রপাত শুরু হলে সেখানে থাকা অন্যরা নিরাপদ স্থানে সরে যান। এ সময় তিনি পাশের একটি আমগাছের নিচে আশ্রয় নেন। হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মুক্তাগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সায়েম তানভীর বলেন, বজ্রপাতে তিনি আহত হন। হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানিয়েছেন, নীলফামারীর ডিমলায় বজ্রপাতে আলম ইসলাম (৪০) নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। এ সময় সেরিনা বেগম (৩০) নামের এক গৃহবধূ গুরুতর আহত হয়। সন্ধ্যায় উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের নিজপাড়া এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত আলম ইসলাম নাউতারা ইউনিয়নের নিজপাড়া এলাকার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের ছেলে ও আহত গৃহবধূ সেরিনা একই এলাকার বাসিন্দা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হয়ে বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হয়। এ সময় নিজ বাড়ির পাশে আকস্মিক বজ্রপাতের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান আলম ইসলাম। তার পাশে থাকা এক প্রতিবেশী গৃহবধূ গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা আহত তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে যান।
ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাশেদুজ্জামান বলেন, সন্ধ্যার দিকে বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তির মরদেহ হাসপাতালে রয়েছে। আহত গৃহবধূকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে চিকিৎসধীন আছেন। তিনি বর্তমানে সুস্থ আছেন।
এ বিষয়ে ডিমলা থানার ওসি শওকত আলী সরকার বলেন, বজ্রপাতে নিহতের বিষয়টি জেনেছি। ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, পঞ্চগড়ে বজ্রপাতে শাহাদাত হোসেন (১৯) নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে। বিকেলে সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের বানিয়াপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
শাহাদাত ওই এলাকার কেরামত আলীর ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাহাদাত ট্রাক্টরের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। বিকেলে তিনি ট্রাক্টরচালকের সঙ্গে ফসলি জমি থেকে ভুট্টা পরিবহন করছিলেন। এ সময় ট্রাক্টরের চাকা নরম মাটিতে দেবে যায়। বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় ট্রাক্টর তোলার কাজে ব্যবহারের জন্য একটি বেলচা আনতে বাড়িতে যান তিনি।
বেলচা নিয়ে ঘটনাস্থলে ফেরার পথে হঠাৎ বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন শাহাদাত। স্থানীয়রা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অমরখানা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান নুরু ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
বগুড়া স্টাফ রিপোর্টার জানিয়েছেন, বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় মরিচ ক্ষেতে কাজ করার সময় বজ্রপাতে রাব্বি হোসেন (১৫) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় তার মা মনিকা বেগম গুরুতর আহত হয়েছেন। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উপজেলার সদর ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের মাঠে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত রাব্বি হোসেন ওই গ্রামের আফাল উদ্দিনের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে রাব্বি হোসেন তার মা মনিকা বেগমসহ কয়েকজনের সঙ্গে তেঁতুলিয়া গ্রামের মাঠে মরিচ ক্ষেতে কাজ করছিলেন। এ সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে রাব্বি ঘটনাস্থলেই মারা যায়। একই ঘটনায় তার মা গুরুতর আহত হন। পরে স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।
আদমদীঘি থানার ওসি কামরুজ্জামান মিয়া বজ্রপাতে রাব্বি হোসেনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার নান্দবার গ্রামে বজ্রপাতে নাফিজ আহমেদ শান্ত (২৮) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। একই ঘটনায় তার চাচাতো নাহিদ (২৩) গুরুতর আহত হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
বিকেলে নাফিজের বাড়ির ছাদে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পরে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত দুজনকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক নাফিজ আহমেদ শান্তকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত নাফিজ আহমেদ শান্ত আলমডাঙ্গা উপজেলার গাংনী ইউনিয়নের নান্দবার গ্রামের জাহাঙ্গীরের ছেলে। আহত নাহিদ একই গ্রামের লিটনের ছেলে। সম্পর্কে তারা দুজন চাচাতো ভাই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য সাইদুর রহমান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যার আগে থেকেই এলাকায় ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়। এ সময় নাফিজ আহমেদ শান্ত ও তার চাচাতো ভাই নাহিদ, নাফিজের বাড়ির দ্বিতীয় তলার ছাদে বসে ছিলেন। একপর্যায়ে বজ্রপাত হলে ছাদের পাশের একটি নারিকেল গাছে আগুন ধরে যায়। একই সঙ্গে বজ্রপাতের আঘাতে দুই যুবক অচেতন হয়ে পড়েন।
পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং দুজনকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে নাফিজকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত নাহিদকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক রোকাইয়া বলেন, সন্ধ্যা ৭টার দিকে বজ্রপাতে আহত দুজনকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর শান্তকে মৃত ঘোষণা করা হয়। আহত নাহিদকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।