Image description
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, “সাপের খেলা দেখাতে এলাকায় প্রবেশ করায় বেদে পরিবারের নারীদের চুল কেটে দিয়েছে মুগদা উপজেলা জামায়াতের নেতা আলী হাসান।”
প্রথমে বিএনপিপন্থী Nationalist Rofik প্রোফাইল থেকে এই দাবিতে ভিডিওটি ছড়ানো হয়। পরে ভিডিওটি বিভিন্ন আওয়ামীপন্থী ও বিএনপিপন্থী প্রোফাইল ও পেজ থেকে পোস্ট করতে দেখা যায়। কয়েকজন সাংবাদিকও যাচাই ছাড়াই ভিডিটি পোস্ট করেছেন। আরও দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানেএখানেএখানেএখানে ও এখানে
এছাড়াও, একই ভিডিও বাংলাদেশে সুন্নি মুসলিমদের দ্বারা শিয়া নারীকে নির্যাতনের দাবিতেও ছড়ানো হয়েছে। দেখুন এখানে। 
ভাইরাল ১৭ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, গাছের সঙ্গে হাত বাঁধা তিন নারীকে। সাদা-পাঞ্জাবি ও টুপি পরিহিত এক ব্যক্তি কাঁচি দিয়ে তাঁদের একজনের চুল কেটে দিচ্ছেন। এ সময় নির্যাতনের শিকার নারীরা চুল না কাটার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন।
তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, প্রচারিত দাবিগুলোর কোনোটিই সঠিক নয়। নিপীড়িত নারীরা বেদে সম্প্রদায় সদস্য নন। তারা সেখানে সাপের খেলাও দেখানে যাননি। এমনকি ঘটনাটি মুগনা এলাকারও নয়। তাছাড়াও নীপিড়ক ব্যক্তিটির নাম আলী হাসান নয় এবং তিনি জামায়াতে ইসলামের নেতাও নন।
ভিডিওটির কি-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে মূল ঘটনার একাধিক সংবাদ প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ২ মার্চ প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি ঘটেছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ডহরগাঁও এলাকায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনার চেইন চুরির অভিযোগে তিন নারীকে আটক করে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাঁদের গাছে বেঁধে মারধর এবং চুল কেটে দেন। পরে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার মেহেদী ইসলাম প্রথম আলোকে জানান, স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম ভুঁইয়ার বাড়িতে সোনার চেইন চুরির অভিযোগে ওই তিন নারীকে আটকে রাখা হয়েছিল। এ সময় সেলিম ভুঁইয়া, তাঁর পরিবারের সদস্য এবং স্থানীয় কয়েকজন মিলে তাদের নির্যাতন করেন।
ঘটনার পরদিন, ৩ মার্চ, চুরি ও নির্যাতনের ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা দায়ের হয়। যুগান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চুল কাটার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের বাসিন্দা সেলিম ভুঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রতিবেদনে তাকে স্থানীয় ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।
 
নির্যাতনের শিকার নারীরা কারা?
তিন নারী বর্তমানে রূপগঞ্জের হোড়গাঁও গ্রামে বসবাস করলেও তাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর থানার জাহাপুর এলাকার বাবু মিয়ার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (৩২), খুলনার খালিশপুর থানার দীঘলিয়া এলাকার সুজন মিয়ার স্ত্রী ইতি আক্তার (২৮) ও বালিয়াপাড়া এলাকার রুহুল আমিনের স্ত্রী শারমিন আক্তার (৩০)। তারা সবাই মুসলিম পরিবারের সদস্য। বেদে সম্প্রদায়ের হওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ভিডিওতে দৃশ্যমান আক্রান্ত নারী ইতি আক্তার সাংবাদিকদের জানান, তারা কাজের খোঁজে রূপগঞ্জে এসেছিলেন এবং স্থানীয় একটি পোশাক কারখানায় যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ঈদের পর বসবাসের জন্য বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে ওই বাড়িতে যান। সেখানে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাদের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ আনা হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কয়েকজন ব্যক্তি তাদের মারধর, শারীরিক নির্যাতন, টানাহেঁচড়া ও শ্লীলতাহানির পর গাছের সঙ্গে বেঁধে চুল কেটে দেন।
একটি ভিডিও প্রতিদেবনে ওই নারীকে একই ধরণের কথা বলতে শোনা যায়।
এ বিষয়ে জানতে দ্য ডিসেন্ট যোগাযোগ করে রূপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম সালাউদ্দীনের সঙ্গে। তিনি জানান, এই ঘটনা তিনি এই থানায় আসার আগে ঘটেছে। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্টভাবে অবগত নেন। এসময় তিনি ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
এর প্রেক্ষিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্য ডিসেন্ট। তিনি বলেন, ‘‘এখন পর্যন্ত আমরা উভয় পক্ষের কারো কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পাইনি। উভয়পক্ষের সবার জামিন হয়েছে। মামলার তদন্ত চলমান আছে।’’
অর্থাৎ, “সাপের খেলা দেখাতে এলাকায় প্রবেশ করায় বেদে পরিবারের নারীদের চুল কেটে দিয়েছে মুগদা উপজেলা জামায়াতের নেতা আলী হাসান” এই দাবি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভিডিওটি ভিন্ন স্থান ও ভিন্ন ঘটনার, যেখানে বেদে সম্প্রদায়, সাপের খেলা বা মুগদা এলাকার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও জামায়াতের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।