Image description

দেশের নাগরিকরা জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) দুই ধরনের কার্ড ব্যবহার করছেন; স্মার্ট ও পেপার লেমিনেটেড। আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিসেস (আইডিইএ) প্রকল্পের আওতায় ২০১১ সালে স্মার্ট কার্ড মুদ্রণ ও বিতরণের কাজ শুরু করার কথা জানানো হয়।

সে সময় স্মার্ট কার্ডের গুণগান গাইতে গিয়ে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বলেছিল, এটি বহুমুখী ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির উন্নতমানের কার্ড। ভবিষ্যতে এ কার্ডের মাধ্যমে মিলবে অন্তত ২২ ধরনের সেবা। কিন্তু ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত কোনো নাগরিক স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে বিশেষভাবে ওই সব সেবা মিলছে না। পেপার লেমিনেটেড কার্ডের মাধ্যমে যেসব সেবা পাওয়া যায়, স্মার্ট কার্ডে তার ব্যতিক্রম নেই।
 
এই দুই ধরনের কার্ডের মধ্যে ব্যাবহারিক কোনো পার্থক্য নেই। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের ৯ কোটি ভোটারকে এই স্মার্ট কার্ড দেওয়ার কথা। কিন্তু চলতি মাসের ১৮ মে পর্যন্ত নাগরিকদের কাছে বিতরণ করা হয়েছে সাত কোটি ৩০ লাখ ৩১ হাজার ২৪৬টি স্মার্ট কার্ড। গত ১৫ বছরেও এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি ইসি।
 
কার্ড পারসোনালাইজেশনের মেশিনগুলোও নষ্ট হওয়ার পথে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, স্মার্ট এনআইডি কার্ডের মাইক্রোচিপে নাগরিকের পেশা, স্থায়ী ঠিকানা, বর্তমান ঠিকানা, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, জন্ম নিবন্ধন নম্বর, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, দৃশ্যমান শনাক্তকরণ চিহ্ন, ধর্ম, ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, আয়কর সনদ নম্বর, টেলিফোন ও মোবাইল নম্বর, মা-বাবা ও স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয়পত্র নম্বর, মা-বাবা বা স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যুসংক্রান্ত তথ্য, অসমর্থ বা প্রতিবন্ধীর তথ্য ইত্যাদি তথ্য থাকতে পারে। এই চিপটি মূলত এনএফসি প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাজ করে এবং এটি একটি শক্তিশালী সিকিউরিটি সিস্টেমে এনক্রিপ্ট করা থাকে, যা সাধারণ ডিভাইসে পড়া যায় না। কিন্তু সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সে সক্ষমতা নেই। সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সে সক্ষমতা দেওয়ার বা একটি ইকোসিস্টেম দাঁড় করানোর উদ্যোগও এনআইডি কর্তৃপক্ষ আজ পর্যন্ত নেয়নি।

বর্তমানে আয়করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর পাওয়া, শেয়ার আবেদন ও বিও হিসাব খোলা, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়ন, ট্রেড লাইসেন্স করা, পাসপোর্ট করা ও নবায়ন, যানবাহন রেজিস্ট্রেশন, চাকরির আবেদন, বীমা স্কিমে অংশগ্রহণ, স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়, বিয়ে ও তালাক রেজিস্ট্রেশন, ব্যাংক হিসাব খোলা, নির্বাচনে ভোটার শনাক্তকরণ, ব্যাংকঋণ, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের সংযোগ, সরকারি বিভিন্ন ভাতা উত্তোলন, টেলিফোন ও মোবাইল ফোন সংযোগ, সরকারি ভাতা, সাহায্য ও সহায়তা, ই-টিকেটিং, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বিজনেস আইডেনটিফিকেশন নম্বর পাওয়া ও সিকিউরড ওয়েব লগে ইন করার ক্ষেত্রে এনআইডি নম্বর ব্যবহার হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এনআইডির স্মার্ট কার্ডের আলাদা কোনো কার্যকারিতা নেই।

কর্তৃপক্ষ যা বলছে : বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, পোপার লেমিনেটেড ও স্মার্ট এনআইডি কার্ডের মধ্যে ব্যবহারে কোনো পার্থক্য নেই। একই কথা জানান আইডিইএর (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তিনি বলেন, স্মার্ট কার্ডে সব সুযোগ আছে। কিন্তু কাজে তো লাগাতে হবে। ২২ ধরনের নয়, আরো বেশি সেবা দেওয়ার সুযোগ আছে। এই যেমন, মেট্রো রেলের কার্ডের কাজও স্মার্ট কার্ড দিয়ে সম্ভব। যখন কোনো প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়, তখন কিন্তু এসব পয়েন্ট আসে। এই কার্ডটি ব্যাংক খাতসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু আমি (এনআইডি কর্তৃপক্ষ) কি ব্যাংক খাতে যোগাযোগ করেছি? সরি টু সে, আমি বলেই দিলাম। আগের কমিশনগুলো তো এমনই ছিল। যতগুলো কাজ করার সুযোগ আছে, আমার ধারণা, সেবাদাতা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলা হয়নি। একটি সিস্টেম ডেভেলপ করতে হবে। সবই সম্ভব ছিল। কিন্তু করা হয়নি। সে জন্য দুটি কার্ডের মধ্যে কার্যত কোনো পার্থক্য নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত এই কার্ডে অন্য সেবা যুক্ত করছেন না, ততক্ষণ এর ভ্যালু নেই। এটি কেবল একটি লাক্সারি আইডি কার্ড। এটা ব্যবহারের জন্য ইকোসিস্টেম দাঁড় করাতে হবে। কিন্তু তা হয়নি।

এদিকে শুরুতে বলা হয়েছিল, স্মাট কার্ডের মেয়াদ হবে ১০ বছর। ২০১৬ সালে যাঁদের কার্ড দেওয়া হয়েছে, তাঁদের কার্ডের মেয়াদ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এখন স্মার্ট কার্ড নবায়ন কিভাবে হবেএমন প্রশ্নে মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, মেয়াদ যাই থাক, আপনার কাছে যদি কার্ড ভালো থাকে, আপনি তো আর নতুনভাবে চাইবেন না। কার্ডগুলো নষ্ট হয়নি এখনো। এ ধরনের অভিযোগ নেই। যখন নষ্ট হয়ে যাবে, তখন নির্বাচন কমিশনের কাছে এলে তারপর কমিশন বা এনআইডি কর্তৃপক্ষ নতুন কার্ড থেকে রিপ্লেস করে দেবে।

কার্ড পারসোনালাইজেশনের মেশিনগুলোও নষ্ট হওয়ার পথে : কালের কণ্ঠের এক প্রশ্নের জবাবে প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, কার্ড পারসোনালাইজেশনের মেশিনগুলোও নষ্ট হওয়ার পথে। এগুলো আর নতুনভাবে ঠিক করা সম্ভব হবে না। ২০১৫ সালের মেশিনের সেভগার্ড শেষ হওয়ার কথা। মেশিনের এখন কার্যত কোনো ভ্যালু নেই। নষ্ট হলেও কম্পানি দায় নেবে না। কারণ এর সময় শেষ। এখন ১০টির মধ্যে আটটি মেশিন কোনোভাবে সচল রয়েছে। সব মিলিয়ে ঘণ্টায় আট হাজারের মতো কার্ড করা যায়। কিন্তু শুরুতে একটি মেশিনে ঘণ্টায় ১৬ হাজার কার্ড প্রিন্ট হতো। নতুনভাবে কিনতে হলে প্রচুর টাকা দরকার। দুটি মেশিনেরই দাম পড়বে ৯০ কোটি টাকা।

আইডিইএ প্রকল্প কি বন্ধ হওয়ার পথে, এমন প্রশ্নে মোহাম্মদ আজিজুর বলেন, বন্ধ হওয়ার পথে এভাবে বলা যাবে না। আমরা চেষ্টা করব, কাজগুলো ছোট করে রাজস্ব খাতে বুঝিয়ে দিতে। আমি যতটুকু জানি, সরকারের প্ল্যান আছে রাজস্ব খাত থেকে প্রতিবছর ২৫ থেকে ৩০ লাখ করে স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট করবে। প্রতিবছর কী পরিমাণ মানুষ ভোটার হয়, এটা সে হিসাবের চিন্তা। তখন তো আমরা (আইডিইএ) থাকবই না। একটা প্রকল্প আর কত দিন ঝুলে থাকবে? প্রকল্প থেকে আর কোনো কার্ড কেনা হবে না। ইসি সচিবালয় বাইরে থেকে টেন্ডার করে স্মার্ট কার্ড নেবে। বর্তমান স্মার্ট কার্ডে তিনটি স্তর আছে। ২৪টি ফিচার আছে। প্রথম স্তরের বৈশিষ্ট্যগুলো খালি চোখে দৃশ্যমান হয়। দ্বিতীয় স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যগুলো দেখার জন্য যন্ত্রের প্রয়োজন হয়। তৃতীয় স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য দেখতে ল্যাবরেটরিতে ফরেনসিক টেস্টের প্রয়োজন হবে, যা আপনি-আমি যাচাই করতে পারব না। যে ফরেনসিকের প্রয়োজন পড়ে তা বাংলাদেশেই নেই। তাহলে রেখে লাভ কী? এত ফিচারের দরকার নেই। এখানকার কার্ডে যেসব ফিচার আছে, তার সব থাকবে না। তবে কী কী ফিচার থাকবে, তা পুরো প্রকল্প রেডি হওয়ার পর বলা যাবে।

এদিকে কবে নাগাদ দেশের সব নাগরিকের হাতে স্মার্ট এনআইডি পৌঁছাবে, সে বিষয়েও কোনো ধারণা দিতে পারেননি প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার করার উদ্যোগে দৃশ্যমান সাফল্য না থাকলেও এ খাতে ব্যয়ের আড়ালে একের পর এক বিদেশ সফর নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। এ পর্যন্ত ১৯ হাজার ৪১ জন প্রবাসীকে স্মার্ট কার্ড দেওয়া হয়েছে।

শুরুতেই বিলম্ব : ইসি ও আইডিইএ প্রকল্প সূত্র বলছে, প্রকল্পটি শুরু থেকেই ধীরগতির ছিল। ২০১১ সালে এনআইডি উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হলেও বিভিন্ন শর্তের কারণে প্রকল্পের মূল কার্যক্রম শুরু করতে প্রায় দুই বছর বিলম্ব হয়। পরে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অবার্থুর টেকনোলজিসের সঙ্গে ৮১৬ কোটি টাকায় স্মার্ট কার্ড উৎপাদন ও বিতরণের চুক্তি করা হয়। মেয়াদ নির্ধারিত ছিল ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত, যা পরে বাড়িয়ে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর করা হয়। তবে কাজের ধীরগতি ও অপেশাদারির অভিযোগে ২০১৭ সালে ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে ইসি। এরপর বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে অর্থায়নে অনাগ্রহ দেখায়। পরে সরকারি অর্থায়নে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়। ২০২০ সালের মধ্যে প্রায় ছয় কোটি নাগরিককে স্মার্ট এনআইডি দেওয়া হয়।

পরে আইডিইএ প্রকল্পের সময় না বাড়িয়ে ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর আইডিইএ ফেজ-২ নামে নতুন একটি পাঁচ বছরমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেয় ইসি। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তিন কোটি নাগরিককে স্মার্ট এনআইডি প্রদান। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এর মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় আবার সময় বাড়ানোর প্রস্তাব থাকলেও আপত্তি আসে ইসি থেকে। এ বিষয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ ও এনআইডি শাখার মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা কালের কণ্ঠকে জানান, মেয়াদ বাড়ার বিষয়ে তাঁদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, আর নতুন করে কোনো প্রকল্প নেওয়া হবে না। ভবিষ্যতে রাজস্ব খাত থেকে স্মার্ট এনআইডি সেবা দেওয়া হবে।

ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে ব্লাংক কার্ড সরবরাহে সংকট : সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে পূর্বনির্ধারিত দামে তিন কোটি স্মার্ট এনআইডি কার্ড সরবরাহে অপারগতার কথা জানায় বিএমটিএফ। পরে আলোচনার মাধ্যমে প্রতিটি কার্ড ১৭২ টাকা দরে ৪০৬ কোটি টাকায় দুই কোটি ৩৬ লাখ ৩৪ হাজার কার্ড সরবরাহের প্রস্তাব দেয় ইসি। প্রতিষ্ঠানটি ইসির এই প্রস্তাবে রাজি হয়। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা ও বাস্তবায়নে বিলম্বের কারণে ওই টাকায় প্রায় ৬৪ লাখ কার্ড কম পাওয়া যাচ্ছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে ব্লাংক স্মার্ট কার্ড যাচাইয়ের জন্য ফ্রান্স সফর করেন নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং আইডিইএ প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আজিজুর রহমান সিদ্দিকী। তবে সেই যাচাইয়ের সময় সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো দুই কোটি ১৯ লাখ কার্ড দেশে আসেনি। এখন প্রকল্পের মেয়াদ বাকি আছে মাত্র সাত মাস। এই স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক কার্ড সরবরাহ ও বিতরণ সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। তবে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ে কার্ড পাওয়ার বিষয়ে আমরা আশাবাদী। বিএমটিএফের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। সময়মতো সরবরাহ সম্ভব না হলে তো এমন চুক্তি করা হতো না।’