সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘‘বাংলাদেশের একটি হত্যা মামলার আসামি ভারতের মেঘালয় দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশের পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের স্বার্থে এ বিষয়ে তার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে মুখ খুলতে নিষেধ করেন।’’
ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে মমতা বলেন, ‘‘কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়ে ছিল? সবটাই জানি। আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। এত দিন আমি বলিনি, মুখ খুলিনি। অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে আমি এখনও নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে— আমি সেটা চাই না, আমি দেশকে ভালোবাসি।’’
মমতার এমন বক্তব্যের পর বাংলাদেশে আবারও আলোচনায় এসেছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড। এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্রই আলোচনা, বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘‘মমতার বক্তব্য আলোচনা করার মতো বিষয় নয়। যদি ভারত সরকার হাদি হত্যার ব্যাপারে কিছু বলে আমরা অবশ্যই দেখাবো।’’
অপরদিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, ‘‘শরীফ ওসমান হাদি যেহেতু সবসময় ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, সেজন্য আমরা প্রথম থেকেই ধারণা করেছিলাম— এর সঙ্গে ভারত জড়িত থাকতে পারে। এখন মমতার বক্তব্যে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।’’
তবে শরীফ ওসমান হাদির ভাই শরীফ ওমর হাদির অভিযোগ, ‘‘শহীদ ওসমান হাদির খুনের সঙ্গে ইন্টেরিম সরকারের কয়েকজন উপদেষ্টা এবং বিএনপি সরকারের কয়েকজন এমপি ও মন্ত্রী সরাসরি জড়িত। এছাড়া হাদি হত্যার পেক্ষাপট তৈরিতে আমিরে জামায়তের একজন পিএস জড়িত’’, বলে দাবি করেছেন তিনি।
হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের দাবি
ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ও ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখপাত্র ফাতিমা তাসনিম জুমা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ভারতের সম্পৃক্ততা আমরা শুরু থেকেই আন্দাজ করতে পারছি। মমতার বক্তব্যে মধ্যে দিয়ে তা পরিষ্কার হলো।’’
তিনি বলেন, ‘‘ফয়সালকে (হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি) কারা জেল থেকে মুক্ত করেছিল এবং কারা এর অর্থের জোগান দিয়েছে, কাদের মদদে হত্যা করা হয়েছে— ফয়সালকে দেশে আনলেই এসব বেরিয়ে আসবে। বাংলাদেশের সঙ্গে যেহেতু ভারতের একটা সম্পর্ক আছে, আমরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার অতি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছি।’’
এদিকে হাদি হত্যার দ্রুত বিচার নিশ্চিত ও খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা করছে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের। কর্মসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সন্ধ্যায় মশাল মিছিল, শুক্রবার জুমার নামাজের পর সারা দেশে বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে ইনকিলাব মঞ্চ।
হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রসঙ্গে জাবের বলেন, ‘‘‘হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় একাধিকবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে খুনিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সরকারের বক্তব্যকে ধোঁয়াশাপূর্ণ।’’ তাই খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণার দাবিও জানান তিনি।
রাজনীতিকরা যা বলেন
মমতার বক্তব্যে প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘উনি যার বিরুদ্ধে বলেছেন দু’জনেই তো ভারতীয় লিডার। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আগেও কথা বলেছি। আমাদের অবস্থান স্পষ্ট যে, যারাই এর সঙ্গে জড়িত সরকার তাদের খুঁজে বের করে বিচার করুক।’’
গণঅধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ বলেন, ‘‘শরীফ ওসমান হাদি জীবদ্দশায় সবসময় ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। তিনি বাংলাদেশের অধিকার এবং বাংলাদেশের প্রতি ভারতের যে বৈষম্য এবং অত্যাচার তা তুলে ধরেছিলেন। তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ন্যায্যতা ও মর্যাদার কথা ছিল। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে বক্তব্য হাদিকাণ্ড আবারও সামনে এলো।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘বাংলাদেশের একটা বিশেষ গোষ্ঠীও এর সঙ্গে জড়িত। যারা মূলত হাদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে লাভবান হয়েছে। সরকারের উচিত হাদি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যে বা যারা জড়িত, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা।’’
যা বললেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, ‘এটা আমাদের আলোচনার বিষয় নয়।’ বুধবার (৩ জুন) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন।
শামা ওবায়েদ বলেন, ‘‘একজন নেতা একটা কথা বলেছেন, দ্যাট ইজ নট আওয়ার ম্যাটার টু ডিসকাস। এখন ভারত সরকার যদি বাংলাদেশকে হাদির হত্যার ব্যাপারে কিছু বলে অবশ্যই আমরা দেখবো। অলরেডি তো আমাদের এটা নিয়ে কাজ চলছে, কাজ এগিয়েছে আমাদের। এটা নিয়ে খুবই সিরিয়াসলি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এটা নিয়ে কাজ করছে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘হাদি হত্যার বিচার আমরা চাই। হাদি হত্যার ব্যাপারে আমার ডিরেক্টলি গভর্মেন্টের সাথে কথা বলবো, কারণ এই কালপ্রিটদেরকে ফেরত আনতে হয়, তাহলে ভারত সরকারের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে ফেরত আনতে হবে এবং সেই কাজ আমরা কাজ করছি, খুবই সিরিয়াসলি।’’