গত ১৪ মে গ্রিসে গিয়েছেন সুনামগঞ্জের তিন যুবক। রেস্টুরেন্টের ওয়েটার হিসেবে সে দেশে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো কাজ তারা পাননি। দালালের খপ্পরে পড়ে গ্রিসে বৈধভাবে গিয়েও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছেন তারা। তিন যুবকের একজন আমিনুল ইসলাম জানান, আসার পরপরই কাজে যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন দালাল ও মালিক কারও খোঁজ পাচ্ছেন না। এলাকার একজনের বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। গ্রিসে দীর্ঘদিন গার্মেন্টস ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দাদন মৃধা বলেন, দিনদিন কঠোর হচ্ছে অভিবাসন আইন। আগে সাত বছর বসবাস করলেই বৈধ হওয়া যেত। সেই আইনটিও বন্ধ করেছে সরকার। বর্তমানে গ্রিসে সব ধরনের অভিবাসীর বৈধতার আইন বন্ধ রয়েছে।
জানা যায়, আগে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট ছিল তুরস্ক-গ্রিস সীমান্ত। ট্রানজিট কান্ট্রি হিসেবে ব্যবহার করা হতো গ্রিসকে। অনেকেই পাকিস্তান, দুবাই, ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছে পরে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে গ্রিসে প্রবেশ করতেন। এরপর গ্রিস থেকে ইউরোপের অন্যান্য দেশে চলে যেতেন। তবে বর্তমানে তুরস্ক সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়িয়েছে গ্রিস। সীমান্ত নজরদারি, দেয়াল, কোস্টগার্ড টহল ও ইলেকট্রনিক মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে। এতে পুরোনো রুট অনেকটাই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন নতুন রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে প্রবেশের পথ। বিশেষ করে ক্রিট ও গাভদোস দ্বীপমুখী নৌরুটে প্রতিনিয়তই প্রবেশ করছেন অভিবাসীরা। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এই যাত্রায় প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাগরপথে মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশিদের সংখ্যাও উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এদিকে অভিবাসন ঠেকাতে একের পর এক কঠোর আইন বাস্তবায়ন করছে গ্রিস সরকার। ২০২৫ ও ২০২৬ সালের নতুন আইনে অবৈধ প্রবেশ, অবৈধ অবস্থান ও অবৈধভাবে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টাকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। নতুন আইন অনুযায়ী, বৈধ কাগজপত্র ছাড়া অবস্থান করলে জেল, জরিমানা, আটক এবং ডিপোর্টের মুখে পড়তে হতে পারে।
অবৈধ প্রবেশ বা অবৈধ অবস্থানের দায়ে কমপক্ষে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, ৫ থেকে ১০ হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানা, দীর্ঘ সময় ডিটেনশন সেন্টারে আটক রাখা, দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো, ব্যর্থ অ্যাসাইলাম আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রত্যাবাসন ব্যবস্থাসহ অনেক কঠোর আইন। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, নতুন আইন অভিবাসীদের জন্য পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলবে। বিভিন্ন এনজিও অভিযোগ করেছে, এখন শুধু অভিবাসীরাই নয়, তাদের সহায়তা করলেও কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে। নতুন আইনে কিছু ক্ষেত্রে এনজিওকর্মীর বিরুদ্ধেও ১০ বছর পর্যন্ত জেল ও বড় অঙ্কের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, গ্রিসে প্রথম বড় ধরনের অভিবাসী বৈধতা কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। এরপর বিভিন্ন সময়ে সরকার হাজার হাজার অভিবাসীকে বৈধতা দেয়। গ্রিসে বসবাসরত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীদের সবচেয়ে বড় সুযোগ আসে ২০২২ সালে। ২০২২ সালে গ্রিস সরকার বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশিকে পাঁচ বছর মেয়াদি রেসিডেন্স পারমিট দেয়। এরপর ২০২৩ সালেও একটি উন্মুক্ত বৈধতা প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা সুযোগ পান। কিন্তু এখনো বহু বাংলাদেশি অনিয়মিত অবস্থায় রয়েছেন, যাদের অনেকে প্রমাণাদি দেখাতে না পারায় আবেদন করতে পারেননি, কেউ কেউ চুক্তির পরে নতুন করে অবৈধভাবে গ্রিসে প্রবেশ করেছেন। এ ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে হাজারো বাংলাদেশি লিবিয়া হয়ে গ্রিসে প্রবেশ করেছেন, যাদের বেশির ভাগই বর্তমানে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক আছেন।
তবে একই সঙ্গে বৈধ শ্রমিক আনার দিকেও জোর দিচ্ছে গ্রিস। দেশটির সরকার বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, মিসরসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বৈধ কর্মী নেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করছে।
কৃষি, নির্মাণ, পর্যটন ও রেস্টুরেন্ট খাতে শ্রমিকসংকট মোকাবিলায় ওয়ার্কপারমিট ও ফাস্ট ট্র্যাক প্রক্রিয়াও চালু করা হয়েছে। তবে খোঁজখবর করে না এলে প্রতারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।