হামের প্রকোপ না কমতেই চোখ রাঙাতে শুরু করেছে ডেঙ্গুজ্বর। দেশে ডেঙ্গু সংক্রমণ আবার উদ্বেগজনক হারে বাড়তে শুরু করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এডিস মশাবাহিত রোগটিতে আক্রান্ত হয়ে ৭৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গত সোমবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন একজন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘এবারের পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় লার্ভার ঘনত্ব পরিমাপের সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ ২০-এর ওপরে রয়েছে। কোনো কোনো এলাকায় এ সূচক ৯৩ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। সাধারণত ২০-এর বেশি হলেই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ধরা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন আর শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। চট্টগ্রাম, বরিশাল, পিরোজপুর, চাঁদপুর, নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ঝুঁকি বাড়ছে। দক্ষিণাঞ্চল, কক্সবাজার ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে লার্ভার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। গত দুই বছর নিয়মিত নজরদারি না হওয়ায় ওয়ার্ডভিত্তিক প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্য নেই। ফলে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তাই এখনই কমিউনিটি পর্যায়ে মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে লার্ভা অনুসন্ধান, প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং পর্যাপ্ত কীটনাশক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত সোমবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত) ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৭ জন। গত সোমবার ভর্তি হয়েছিলেন ১০১ জন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৩৮৪ জন, মারা গেছেন ছয়জন। দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৯৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭৩ হাজার ৩৬২ শিশু এবং হাম শনাক্ত হয়েছে ৯ হাজার ১৩৬ শিশুর। হামের প্রকোপ না কমতেই হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছে ডেঙ্গু রোগী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোগীর সংখ্যা বাড়লেও ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থার পুরোনো দুর্বলতা এখনো কাটেনি। দেড় বছরের বেশি সময় ধরে এডিস মশার জাতীয় জরিপ না হওয়া, সিটি করপোরেশনগুলোতে কীটতত্ত্ববিদের সংকট এবং মাঠপর্যায়ের নজরদারির অভাব পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এখনই এ ব্যাপারে গুরুত্ব না দিলে পরিস্থিতি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। প্রতি বছর সাধারণত তিন দফায়, বর্ষার আগে, বর্ষাকালে ও বর্ষার পরে এই জরিপ করার কথা।
এর মাধ্যমে কোন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব কত, কোথায় ঝুঁকি বেশি ও কোন এলাকায় আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিতে হবে, তা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু গত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে কার্যত কোনো জাতীয় জরিপ হয়নি। ফলে কোথায় মশার বিস্তার বাড়ছে, কোন এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়াই মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ বলেন, আগে সিডিসি এই জরিপ করলেও বর্তমানে এটি আইইডিসিআরের দায়িত্বে রয়েছে। তবে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম জানান, তার জানা মতে বর্তমানে কোনো জরিপ পরিচালিত হচ্ছে না।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং চিকিৎসার বিশেষ প্রটোকলসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। পরিত্যক্ত ওয়াশরুম, ছাদ ও গ্যারেজে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহারের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে ডেঙ্গু টিকা এখনো বিশ্বজুড়ে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত না হওয়ায় এই মুহূর্তে তা প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলো ডেঙ্গুরোগীদের জন্য মোট সিটের ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব সিটে রোগীদের কোনো ডাক্তার বা বেড চার্জ দিতে হবে না (শুধু ওষুধ ও খাবারের খরচ রোগী বহন করবে)। এ ছাড়া ডেঙ্গু রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ৮০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হবে। গতকাল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা প্রস্তুতি বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দুই মাস আগে থেকেই সিটি করপোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু করেছে। ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়। এটি জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই মশার উৎস নির্মূলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে।’