দালাল চক্রের প্রতারণা ও নিয়োগকর্তাদের নির্যাতনে হুমকির মুখে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশের নারী কর্মীরা। অতিরিক্ত কাজ করানো, যথাযথ খাদ্য ও চিকিৎসা না দেওয়া এবং শারীরিক-মানসিক ও যৌন নির্যাতনে চরম সংকটে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে যাওয়া নারীরা। গত আট বছরে ৭৯৯ জন বাংলাদেশি নারী বিদেশে মারা গেছেন। যার সিংহভাগই সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। ফলে বিদেশে নারী কর্মীর সংখ্যা দিন দিন কমছে। এর জন্য দালাল চক্রের প্রতারণা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিতর্কিত ‘কাফালা’ (নিয়োগকর্তা) ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, সুরক্ষা নিশ্চিতে নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভিন্ন পেশায় (নার্স, কেয়ার গিভার) বিদেশ পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিদেশে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী কর্মী কাজ করছেন। গত আট বছরে ৭৯৯ জন নারীর লাশ দেশে এসেছে। যার বড় অংশই সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। তাদের মৃত্যু সনদে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হলেও অধিকাংশের পরিবারই তা বিশ্বাস করেন না। তারা মনে করেন, নিহত স্বজনরা শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন। এ ছাড়া দেশে ফেরত আসা নারীদের সিংহভাগই শারীরিক পঙ্গুত্ব কিংবা তীব্র মানসিক ভারসাম্যহীনতা নিয়ে জীবন পার করছেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে দেশে ফেরা নারী গৃহকর্মীরা জানান, বিদেশে তারা শারীরিক, মানসিক এবং যৌন নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত বেতন না পাওয়া এবং নির্ধারিত সময়ের অধিক কাজে নিয়োজিত থাকাসহ নানা সংকটে পড়েছেন। ফলে বিদেশে নারী কর্মীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর এক লাখের বেশি নারী বিদেশে কর্মী হিসেবে গেলেও ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার। যা ২০২২ সালের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম। বর্তমানে ১০ লাখেরও বেশি নারী বিদেশে কাজ করলেও গত সাত বছরে অন্তত ৭০ হাজার নারী দেশে ফেরত এসেছেন।
রিভিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেশন মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৭ থেকে ২০২২ ছয় বছরে বিদেশে ৭০৫ জন বাংলাদেশি নারী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। যাদের ৭৬ শতাংশই ছিলেন গৃহকর্মী। সবচেয়ে বেশি ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ নারী মারা গেছেন সৌদি আরবে। জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত এবং ওমান থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃতদেহ এসেছে। মৃত নারীদের গড় বয়স ছিল মাত্র ৩৭ বছর, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কেননা বিদেশ যাওয়ার আগে তারা বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকার সনদ পেয়েছিলেন। তারা মনে করেন, নিহত স্বজনরা শারীরিক, মানসিক বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা গেছেন, যা মৃত্যু সনদে আড়াল করা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে নারী নির্যাতনের মূল কারণ হিসেবে বিতর্কিত ‘কাফালা’ (নিয়োগকর্তা) ব্যবস্থা ও দালাল চক্রকে দায়ী করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দালাল চক্র ভালো বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে নারীদের মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাঠায়। সেখানে তারা প্রতিশ্রুত কাজ না পেয়ে ভিন্ন পরিস্থিতির মুখে পড়েন। এ ছাড়া বিতর্কিত ‘কাফালা’ ব্যবস্থার ফলে একজন নারী কর্মীর চাকরি পরিবর্তন এবং দেশ থেকে চলে যেতে নিয়োগকর্তার অনুমতির প্রয়োজন হয়।
এ ছাড়াও অধিকাংশ নারী কর্মীদের পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। ফলে নির্যাতিত হলেও পুলিশ বা দূতাবাসের আশ্রয় নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত নারীদের সুরক্ষার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। নারীদের যদি বিদেশে পাঠাতেই হয়, তবে নার্স বা কেয়ার গিভার হিসেবে পাঠানো উচিত। কারণ এই পেশাগুলোতে সুরক্ষা নিশ্চিত থাকে।
তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার নারী বিদেশে মারা গেছেন, কিন্তু মাত্র একটি ঘটনার বিচার হয়েছে। এ ছাড়াও অনেক নারী কয়েক মাস পরেই শরীরে নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে দেশে ফিরে আসেন, তাই তাদের পাঠানোর আগে দূতাবাসের মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করা আবশ্যক।