Image description

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হন তিনি। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে ড. খলিলুর রহমান পেয়েছেন ৯৯টি ভোট। ড. খলিল দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ এই পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস-এর উপস্থিতিতে বিজয়ী প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। এর আগে সাধারণ পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৯০টি রাষ্ট্র ভোট দেয়। ড. খলিল আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এক বছরের জন্য সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

৪০ বছর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। রাজনীতিতে যোগদানের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের ফাঁকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা ড. খলিলুর রহমানকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেয়।

নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচনের আগে ব্যাপক তৎপরতা চালান তিনি। পেশাদার কূটনীতিক ড. খলিলুর রহমান বর্তমান সভাপতি এবং জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যানালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হলেন। জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে বেয়ারবক সাধারণ পরিষদের পঞ্চম নারী সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর দেয়া বক্তৃতায় জাতিসংঘ মহাসচিব ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ড. খলিল রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা শুধু সাধারণ পরিষদে নয় বরং পুরো জাতিসংঘের কল্যাণে ব্যবহার করবেন। 

ড. খলিলুর রহমান তার নির্বাচনী ভিশন বিবৃতিতে ছয়টি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র তুলে ধরেছিলেন। যার মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ, সকল দেশকে সমান অধিকারের মাধ্যমে এগিয়ে নেয়া এবং বিশ্বব্যাপী মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। খলিলুর রহমান নির্বাচিত হলে তিনি সকলের জন্য পূর্ণকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্বপালনের প্রতিশ্রুতি দেন।

বিজয়ী ভাষণে ড. খলিলুুর রহমান নিজের সাফল্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তার নির্দেশনায় কাজ করে এই সাফল্য এসেছে। তিনি বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস রেখেছে এজন্য আমরা সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।

নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ফল ঘোষণার সময় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরসহ বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের কর্মকর্তারা অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। হুমায়ুন কবির মানবজমিনকে বলেন, নির্বাচনের এই ফল ঐতিহাসিক, অসাধারণ। নির্বাচনের এই ফলাফলে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। এটি সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার একটি বড় সাফল্য।

ড. খলিলুর রহমান একজন কূটনীতিক এবং অর্থনীতিবিদ। তিনি ১৯৫৪ সালের ১লা এপ্রিল ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার কাইলাইল ইউনিয়নের পাড়াগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান লাভ করেন।

১৯৮০-৮৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয় ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। সেখানে তিনি আইন ও কূটনীতিতে এমএ এবং অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৯ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন এবং তার কর্মজীবনের শুরুতে দক্ষিণ এশিয়া বিভাগ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে যোগ দেন। সেখানে তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অর্থনৈতিক ও আর্থিক কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯১ সালে তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনে (আঙ্কটাড) বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি নিউ ইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন।

ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন এবং ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনার প্রধান রচয়িতা ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে ব্রাসেলস সম্মেলনে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কর্মসূচি পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতে নেতৃত্ব দেন। ড. খলিলুর রহমান ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের একান্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।