গত ছয় মাস ধরে একটি কেস বারবার রেহনুমার কাছে আসছে। তার কাছে যদিও 'কেমিক্যাল বার্ন' নতুন নয়। এর আগে কেমিক্যাল বার্নের অনেক চিকিৎসাই করেছেন।
তবে রেহনুমা ইদানীং যে-সব রোগী পাচ্ছেন, তাদের কেস একেবারে আলাদা। 'কেমিক্যাল বার্ন' হলেও এদের কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন ক্ষতস্থান ছড়ানো না হয়ে নির্দিষ্ট এবং অল্প জায়গা। কিন্তু ক্ষতগুলো বেশ গভীর, ডাক্তারি ভাষায় যাকে বলা হয় ডিপবার্ন। আবার রোগীদের প্রায় ৯৫ শতাংশই মেয়ে এবং তাদের বয়সও কম—১৫ থেকে ৩০-এর মধ্যে সাধারণত।
রেহনুমা ছয় মাস ধরে আছেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে। বিষয়টি নিয়ে তিনি সহকর্মী ও সিনিয়র চিকিৎসকদের সাথে আলোচনা করেন। কথা হয় তাদের একজনের সাথে।
প্রায় দেড় বছর ধরে ডা. মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম শরীফ জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে আছেন। জানালেন, গত এক বছর ধরে তিনি এমন কেস পাচ্ছেন। ছয় মাস আগেও অনেক ছিল। এখন একটু কম। মাসে তিন-চারটা করে পান। ঢাকার বাইরে অন্যান্য মেডিকেল, যেমন খুলনা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী মেডিকেলেও খোঁজ নিয়ে দেখেছেন; একই কেস সেখানেও তারা পাচ্ছে।
তবে আশ্চর্যজনকভাবে সবারই একই জায়গায় (হাতের তালু), একইরকম 'কেমিক্যাল বার্ন'। অথচ ভুক্তভোগীরা আসছেন দেশের একেক প্রান্ত থেকে। তাদের সাথে কখনো থাকে স্বামী, কখনো বাবা-মা। অনেক সময় সঙ্গে আসা ব্যক্তিরাও জানেন না কীভাবে ঘটনা ঘটল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাত পোড়ার পেছনে ভাতের মাড় গালতে দিয়ে, গরম ডাল হাতে পড়ে, গরম পানি পড়ার মতো কারণ দেখানো হয়।
কিন্তু ডা. শরীফুল বলেন, 'আমরা তো দেখলেই বুঝি পোড়াটা কোন ধরনের। সাধারণ গরম পানি বা ঘরের কাজ করতে গিয়ে পুড়লে সেখানে ফোসকা পড়ে। ডিপ বার্নে ফোসকা পড়ে না। কিন্তু এখানে ক্ষতের স্থান নির্দিষ্ট এবং ডিপ বার্ন। সুতরাং তারা যে কিছু লুকাতে চাচ্ছে, এটিও বুঝি।'
একপর্যায়ে ডা. শরীফুল ও থেরাপিস্ট রেহনুমাসহ বাকিরা রোগীদের সাথে কথা বলে আসল ঘটনা জানার চেষ্টা করেন। যেহেতু বেশিরভাগ রোগী কিশোরী বা যুবতী, তাই তাদেরকে আলাদা রেখে গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। আবার যারা বিবাহিত, তাদের স্বামীকে জানানো হবে না—এই শর্তে কথা বলতে রাজি হয়। আর এভাবেই রোগীদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসে রোমহর্ষক সব কাহিনি।
ঘটনা-১
কুমিল্লার মেয়ে রুখসানা আখতার (২৮) পড়ালেখা করেছেন উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত। এরপরই বিয়ে হয়ে যায়। দুই বছর আগে রুখসানার বিবাহবিচ্ছেদ হলে সব এলোমেলো হয়ে যায়। বিচ্ছেদের পর বড় সন্তানটিকে নিয়ে যাওয়া হয় তার কাছ থেকে। ছোটো সন্তান থাকে রুখসানার কাছেই।
কিন্তু রুখসানা তার দুই মেয়েকেই নিজের কাছে বড় করতে চান। বড় মেয়েকে কাছে আনতে গত দেড় বছর ধরে তিনি আত্মীয়-প্রতিবেশী, অনেকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। প্রথমে কোর্ট-কাচারি, এরপর সামাজিক যত উপায় আছে সবকিছুই চেষ্টা করেছেন। কিন্তু লাভ হয়নি।
স্বামীর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার পর থেকে তিনি মায়ের বাড়িতেই থাকছেন। সারাদিন দরজা আটকে থাকতে থাকতে রুখসানাও ধীরে ধীরে পড়ে যান একাকিত্ব এবং হতাশায়। দেখা দেয় ইনসমনিয়া। একদিন ফোনে এক হুজুরের খোঁজ পান। সামাজিক, আইনত আর কোনোভাবেই যখন নিজের মেয়েটিকে কাছে পাচ্ছিলেন না, তখন শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায় ওই হুজুর। মেসেঞ্জারে সবকিছু খুলে বলেন রুখসানা। উত্তর আসে: 'দশ মিনিটেই এর সমাধান সম্ভব। আগে কাজ হবে এরপর দরকার হলে টাকা দিবেন।''
এই কথা শুনে রুখসানা আশ্বস্ত হন। মনে যে ভয় ছিল অপরিচিত হুজুরের কাছে সাহায্য চাওয়া নিয়ে, সেটাও কেটে গেল। এরপর তাকে বলা হয় ফার্মেসী থেকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট কিনে আনতে (চিকিৎসাবিজ্ঞানে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ব্যবহৃত হয় অ্যান্টিসেপ্টিক ও অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল উপাদান হিসেবে। সাধারণত প্রাথকমিকভাবে ক্ষত পরিষ্কার ও ত্বককে জীবাণুমুক্ত রাখতে ফার্মেসিগুলোতে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট বিক্রি হয়)।
পটাশ কী, না জানলেও হুজুরের পাঠানো ছবি ও নির্দেশনা মোতাবেক কয়েক প্যাকেট পটাশ কিনে নিয়ে আসেন রুখসানা। পটাশের সাথে চিনিও রাখতে বলা হয় তাকে। রাত আড়াইটায় কাজ শুরু হবে। রুখসানাও তাই কথামতো পটাশের প্যাকেট, চিনি ও জায়নামাজ নিয়ে বসেন। সময়মতো এল ভিডিওকল। তাকে বলা হলো, মুখ দেখাতে হবে না। শুধু হাতের তালু্র দিকে ক্যামেরা ধরে রাখতে। এ কথা শুনে রুখসানার আস্থা বেড়ে যায় আরও।
রুখসানা বলেন, 'একপর্যায়ে সে আমাকে ওই পটাশের সাথে চিনি তালুতে নিয়ে একসাথে মিশিয়ে হাত মুঠো করে চেপে ধরতে বললো। আমিও ধরে থাকলাম। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় আমার হাতে ভীষণ জ্বালাপোড়া করতে শুরু করলো। তখন সে বলে, "শক্ত করে ধরে থাকুন মা। এখনই কাজ হচ্ছে। হাত ছেড়ে দিলেই বিপদ! ভয়ঙ্কর বিপদ নেমে আসবে আপনার ওপর। এমনকি আপনার মা মারাও যেতে পারে।'" ওদিকে জ্বালাপোড়া বাড়ছেই। তবু ধরে ছিলাম হাত মুঠো করে। একপর্যায়ে আর পারছিলাম না, হাত ছেড়ে দিই।'
পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট (KMnO4) অত্যন্ত শক্তিশালী জারক পদার্থ। আর চিনি হলো বিজারক। চিনি ও পটাশের মিশ্রণে তাই একটি তীব্র জারণ-বিজারণ রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। যখন শুষ্ক পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের গুঁড়োর সাথে চিনি মেশানো হয় এবং তাতে সামান্য চাপ বা ঘর্ষণ দেওয়া হয়, তখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তীব্র আগুন ও ধোঁয়া সৃষ্টি হয়। রুখসানার বেলায় ঠিক তা-ই ঘটেছে।
আর মূল নাটক এখান থেকেই শুরু। হাতের এই অবস্থা কী করলে ভালো হবে, জিজ্ঞেস করামাত্রই শুরু হয় টাকা চাওয়া। টাকা না দিলে হাতের আরও বড় ক্ষতি হবে, এসব ভয় দেখানো শুরু করে। রুখসানা ঠিকই তখনই বুঝতে পারেন কী ভুল তিনি করেছেন। কিন্তু পরিবারের কাউকে নিজের বোকামির কথা বলার সাহস করতে পারছিলেন না। কিন্তু রাত পোহাতেই তালুর ভেতরের মাংস ফুলে ওঠে তার। এরপর অগত্যা মাকে নিয়ে ছুটতে হয় হাসপাতালে।
ঘটনা ২
মেয়ে শ্রাবণী মজুমদারকে রেখে বাবা-মা দুজনেই বেরিয়েছিলেন ডাক্তার দেখাতে। মেয়েকে যেন চুলোর কাছে যেতে না হয়, তাই কিছু টাকাও রেখে গেছেন খাবার অর্ডারের জন্য। ডাক্তার দেখানোর মাঝেই মেয়ে শ্রাবণী ফোন দিয়ে শুরু করে দিল কান্নকাটি। তার হাত পুড়ে গেছে। বাবা-মা জলদি বাসায় ফিরে এসে দেখেন, মেয়ের বুকসহ ডান হাতের তালু পুড়ে চামড়া উঠে আছে।
জানতে পারেন, তারা বাসা থেকে বের হয়ে যাবার পর শ্রাবণী বের হয় দোকান থেকে পটাশ কিনতে। ভারতের এক ছেলের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে শ্রাবণীর ভালো লাগা ছিল। এ নিয়ে অনেক পাগলামিই সে করেছে। এরমধ্যেই সে অনলাইনে পেয়েছে এক কবিরাজ-তান্ত্রিকের খোঁজ।
সেই তান্ত্রিকও একইভাবে শ্রাবণীকে বলেন পটাশ কিনে আনতে। সেদিন বাসা ফাঁকা পেয়ে সে-ও গিয়ে পটাশ কিনে আনে। এরপর তাকে যেভাবে বলা হয়, সেভাবেই ডান হাতে পটাশ-চিনি মিশিয়ে করে মুঠো করে শক্ত করে ধরে ছিল বুকের সাথে। আর এরপরই ঝলসে যায় হাতসহ বুকের চামড়া।
এরপর শ্রাবণীকেও বলা হয় মিষ্টির টাকা পাঠাতে। তবে তাকে বলা হয় কালী পূজার কথা। বলা হয়, মা কালীকে খুশি করতে তার জন্য পূজো দেয়া হবে। আর সে পূজার জন্য মিষ্টি কিনে দিলেই আপনাআপনি ঠিক হয়ে যাবে হাত।
কিন্তু ব্যাথায় কাতর শ্রাবণী হাত পুড়ে যাওয়ার সাথে সাথেই বাবা-মাকে ফোন দেয়। ফলে কোনো টাকা নিতে পারেনি শ্রাবণীর থেকে। কিন্তু এই ফাঁদে পড়ে কখনো ১০ হাজার, কখনো ৩০ হাজার কখনো বা বলা হয় ৭০ কেজি মিষ্টির টাকা পাঠিয়ে দিতে।
কেউ কেউ ব্যাথায় কাতর হয়ে হাত ঠিক হবে, এই আশায় টাকা পাঠিয়েও দেন। তাতেও যখন কাজ হয় না তখন খেয়াল হয়। আবার কেউ কেউ ভয় পেয়ে পরিবারকে না জানিয়ে ধাপে ধাপে টাকা পাঠাতেই থাকেন। এভাবে ১ লাখ টাকা গচ্চা গেছে এমন রোগীও পেয়েছেন তারা।
থেরাপিস্ট রেহনুমা জানান, 'একবার আমরা একজন পুরুষকে পেয়েছিলাম, মধ্যবয়সি ছিলেন। রাতারাতি ধনী হবার ইচ্ছে থেকে এই ফাঁদে পা দেন। সেই লোকের থেকে এক লাখ হাতিয়ে নিয়েছিল এ গোষ্ঠী। তবে এরা এক নাম্বার বেশিদিন ব্যবহার করে না। একবার ধরা খেলে ওই নাম্বার সম্ভবত বদলে ফেলে।'
ঘটনা ৩
৩৮ বছর বয়সি ইশরাত জাহান (ছদ্মনাম) থাকেন ঢাকার মতিঝিলে। স্বামীর সাথে সব ঝামেলা মিটমাট করার জন্যই দ্বারস্থ হন ফেসবুকের এক 'হুজুর'-এর কাছে।
ইশরাত হুজুরকে মেসেজ দিয়েছিলেন ডিসেম্বর মাসে। মেসেজের উত্তর আসে তার দু-মাস পর ফেব্রুয়ারিতে। তখন রমজান চলছে। ইশরাতকে বলা হলো নামাজের পরে কিছু সূরা নিয়মিত পড়তে। ইশরাত নিয়মিত তা করতেন। দশ-বারো দিন পর হুজুর জানান, অর্ধেক কাজ হয়ে গেছে। বাকি অর্ধেক এখনও বাকি। তার জন্য লাগবে মিষ্টি আর পটাশ। সাথে বিকাশে পাঠাতে হবে ১ হাজার ২০০ টাকা। পটাশ সম্পর্কে ইশরাতেরও কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু তাকে যেহেতু বলা হয়েছে, তাই সরল বিশ্বাসেই সবকিছু কিনে এনে একইভাবে আসনে বসেন। সাথে টাকাও বিকাশে পাঠিয়ে দেন।
ইশরাত বলেন, 'এরপর আমাকে বলা হয়, জিন আসবে রাত দুইটায় আর তাকে দিয়েই কাজ করানো হবে। আমি শুনে প্রথমে অবাক হই। কারণ জিন দিয়ে কাজ করাবে, এমন কিছু বলেনি তারা আমাকে। আমি ভেবেছি নামাজ, আল্লাহর কালাম ও সূরা দিয়েই কাজ করবে তারা। কিন্তু কাজ যেহেতু অনেকটাই শেষের দিকে, তাই শেষমেষ তারা যা বলে সে অনুযায়ী সব করতে থাকি। পটাশ আর মিষ্টির রস মিক্সড করতে বলে, তা-ই করি।'
আর এরপরই বিকট এক শব্দ হয়। হাতে শুরু হয় ভয়ংকর জ্বালাপোড়া। ইশরাতকেও বলা হয়, যত বেশি সময় ধরে রাখতে পারবে, তত দ্রুত কাজ হবে। প্রায় এক মিনিট ধরে থাকার পর ইশরাত একপর্যায় ব্যথায় অজ্ঞান হয়ে যান।
'জ্ঞান আসার পর তাকে জিজ্ঞেস করি কেন এমন হলো। আমাকে জানানো হয়, জিন আমার ওপর ভীষণ রাগ করেছে, তাই তাকে খুশি করতে মিষ্টি খাওয়াতে হবে। আমি যদি বিকাশে দুই মণ মিষ্টির টাকা পাঠাই তবে সমস্যা সমাধান হবে। কিন্তু সে আমাকে ডাক্তার দেখাতে নিষেধ করে। এতে নাকি আমার পুরো পরিবার বিপদে পড়বে। আর তখনই বুঝতে পারি এরা ভন্ড,' বলেন তিনি।
হাতগুলো কখনো স্বাভাবিক হয় না
আমাদের হাতের চামড়া অনেক পুরু। এর নিচেই থাকে চর্বির স্তর। এরপর থাকে মাংসপেশি, মাংশপেশির ভেতর দিয়ে যায় রক্তনালী। এরপরেই থাকে হাড়। ত্বকের আবার তিনটি স্তর আছে। সহজ করে বললে দুটো—এপিডার্মিস ও ডার্মিস। এপিডার্মিস পুড়ে গেলে সেটাকে বলা হয় 'সুপারফিশিয়াল বার্ন'। ডার্মিস স্তর পুড়ে গেলে বলা হয় 'ডিপ বার্ন'।
'ডিপ বার্ন'কে আবার চার ডিগ্রিতে ভাগ করা হয়। তৃতীয় ডিগ্রিতে ত্বকের উপরিভাগের দুটি স্তরই (এপিডার্মিস ও ডার্মিস) সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চামড়ার নিচে থাকা মাংসপেশি, রক্তনালী, স্নায়ু ইত্যাদিও আক্রান্ত হয়। যদি মাংসপেশিসহ হাড় পুরোটাই পুড়ে যায়, তবে সেটাকে বলে ফোর্থ ডিগ্রি। পটাশ চিনির ঘটনায় বেশিরভাগ সময় সেকেন্ড বা থার্ড ডিগ্রি পর্যন্ত থাকে। তবে ফোর্থ ডিগ্রি পর্যন্তও যেতে পারে।
'বার্ন যখন হাড়, রক্তনালীসহ পুড়িয়ে ফেলে তখন ওই জায়গাটি আর কোনো কাজে আসে না। জায়গাটি মরে যায়। পটাশ চিনি বার্নে যারা বেশি সময় ধরে রাখে, তাদের এমনটা হয়। যেহেতু প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন হয়, তাই ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের মধ্যে এই ডিপ বার্ন হয়ে যায়। ক্ষেত্র বিশেষে কখনো হাত কেটেও ফেলতে হয়,' বলেন শরীফুল।
তিনি আরও বলেন, 'এ কাজগুলো করা হয় সাধারণত গোপনে। আর যেহেতু এই অল্পবয়সি মেয়েরাই থাকে এই ভন্ডদের শিকার, তাই না বুঝে বা ভয় পেয়ে টাকাপয়সাও তারা পাঠিয়ে দেয়। কেউ কেউ তো হাত পুড়ে গেলে পরিবারকে জানানও না। যখন আর পারে না, তখন পরিবারকে জানায়।'
হাত পুড়ে যাবার পর প্রথমে তারা জেলা হাসপাতালগুলোতে যায়। সেখান থেকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। অনেকে সরাসরিই এখানে চলে আসে আগে। প্রথম যখন আসে, তখন ক্ষতস্থানটিকে ড্রেসিং করা হয়। ডিপ বার্নের ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় রক্তনালী ঠিক থাকে। কিন্তু দুয়েক দিন পর সেই রক্তনালীতে রক্ত জমাট হয়ে যায়। এজন্য কিছুদিন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
ফোর্থ ডিগ্রি বার্ন বা রক্তনালীসহ পুড়ে গেলে ওই স্থানই কেটে ফেলতে হয়। আর ডিপ বার্নের ক্ষেত্রে হাতটিকে 'অ্যাবডোমিনাল ফ্ল্যাপ' সার্জারি করা হয়। এটি হলো প্লাস্টিক সার্জারির একটি বিশেষ কৌশল। শরীরের অন্য কোনো অংশের (যেমন: হাত বা পায়ের) ত্বক বা টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে, পেটের অংশ থেকে অক্ষত রক্ত সঞ্চালনসহ টিস্যু এনে ঐ স্থানে প্রতিস্থাপন করা হয়। এভাবে ২১ দিন রাখা হয়। এরপর চামড়া নতুন হলে অপারেশন করে আবার আঙ্গুলগুলো আলাদা করা হয়।
অপারেশনের পর ড্রেসিং তো আছেই। পুরো প্রক্রিয়ায় তিন থেকে ছয় মাস চলে যায়। এরপর শেষ এক দুই মাস চলে থেরাপি।
কিন্তু এত কিছুর পরও এই হাতগুলো কখনো স্বাভাবিক হয় না। শুধু কার্যকর বা ফাংশনাল পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়।
অল্পবয়সি, অসহায় মেয়েরাই ফাঁদে পা দিচ্ছে
কখনো হুজুর কখনো তান্ত্রিক কবিরাজ পরিচয়ে এই ফেসবুক পেজগুলো প্রতারণা করে যাচ্ছে। বিভিন্ন ফেসবুক পেজ তো আছেই, আবার ইউটিউবে সিনেমা নাটক দেখার সময় বিজ্ঞাপনেও এদের খোঁজ পাওয়া যায়।
রেহনুমা বলেন, 'এরা একেকজন একেক হুজুর, তান্ত্রিক কবিরাজের নাম বলছে। কিন্তু ঘটনা একই সবার। এরা কি কোনো চক্র যারা একসাথে কাজ করছে না কি জানি না। তবে এরা এই কমবয়সি বা অসহায় মেয়েদেরই টার্গেটে রাখছে। ভুক্তভোগীরাও বয়স কম, আবেগে বা ডিপ্রেশনে গিয়ে ভুলভাল করে ফেলে। সাধারণত নিম্ন মধ্যবিত্তের মানুষজনকেই দেখি এরকম ফাঁদে পা দিতে। একেবারে গরীব বা লেখাপড়া না জানা কাউকে দেখিনি।'
যেমন, তানিয়া ঢাকায় থাকেন একা। ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স মাস্টার্স পাশ করেছেন ঢাকার একটি কলেজ থেকেই। তিনিও এরকম প্রতারণার ভুক্তভোগী।
তানিয়া বলেন, 'আসলে ওই সময় আমরা এত বেশি হতাশা, কষ্ট, যন্ত্রণার মধ্যে থাকি, আমাদের মাথায় এই সাধারণ বিচারবোধ কাজ করে না যে কী করছি! এখন ভাবলে নিজের কাছেই নিজে ছোট হই যে কাকে বিশ্বাস করলাম।'
রুখসানা, ইশরাত, শ্রাবণী ও তানিয়ার মতো আরও কয়েকজনের সাথে কথা বলে টিবিএস। তাদের থেকে প্রতারণাকারী এসব পেজ ও ভন্ডদের মোবাইল নাম্বারও সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু ঘটনার সত্যতা যাচাই করার জন্য প্রদত্ত নাম্বারগুলোতে যোগাযোগ করা হলে বেশিরভাগ নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। কেবল একটি নাম্বারে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। নাম আলম হুজুর।
তার সাথে টিবিএসের কথোপকথন হুবহু তুলে ধরা হলো (কিছু বানোয়াট সমস্যা বলা হয় তাকে):
প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম, আলম হুজুরের নম্বর এটা?
আলম: জি বলুন মা, কী সমস্যা?
প্রশ্ন: এখানে কি সব সমস্যার সমাধান হয়?
আলম: হ্যাঁ মা, মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা ছাড়া সব সমস্যাই সমাধান সম্ভব। আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি প্রেমিক বা স্বামীকে নিজের কাছে আনতে চাচ্ছেন। আপনি কি বিবাহিত?
প্রশ্ন: না আমি একজনকে পছন্দ করি।
আলম: বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সে আপনাকে চায় না। তাই তো?
প্রশ্ন: হ্যাঁ।
আলম: সমস্যা নেই। একসাথে সংসার করবেন, বিয়ে করবেন, এটা তো সুন্দর চাওয়া। ইনশাআল্লাহ হবে, আপনার এই সমস্যা সমাধান করতে কেবল একদিন লাগবে। খালি আপনাকে কিছু কাজ করতে হবে। ভয় পাবেন না।
প্রশ্ন: কী কাজ? টাকা দিতে হবে অনেক?
আলম: না টাকা আগে দিতে হবেনা। আগে আপনি মা কাজটা দেখেন। এরপর বিশ্বাস করলে করবেন। শুধু আপনাকে তেরোটি মোমবাতি কিনতে হবে, তিনটি গোলাপফুল কিনতে হবে। ইমো বা হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিয়ে ভিডিওকলে থাকবেন, সব দেখবেন নিজের চোখেই। সাথে আপনার নাম, এক কপি ছবি আর ওই ছেলের নাম দিতে হবে। কাজ হওয়ার পর শুধু জিনকে খুশি করার জন্য এক মণ মিষ্টির টাকা পাঠাবেন আর আমার জন্য নামাজ পরে দোয়া করবেন আল্লাহর দরবারে।
প্রশ্ন: কিন্তু এত টাকা?
আলম হুজুর: সমস্যা নেই মা। যতটুকু পারবেন ততটুকু দিলেই হবে। জিনকে খুশি করা শুধু।
প্রশ্ন: আমার তো স্মার্টফোনও নেই। তাহলে কি আমার কাজ হবে না?
আলম: স্মার্টফোন না থাকলে তো ঝামেলা। নিজের চোখে না দেখলে তো আপনি প্রমাণ পাবেন না আমাদের কাজের। আমরা যে আসলেই কাজ সমাধান করি তা বুঝতে পারবেন না।
প্রশ্ন: এছাড়া আর কোনো উপায় নেই আমার সমস্যা সমাধানের?
আলম: তাহলে এক কাজ করতে হবে মা, কি আর করার। আপনি এভাবেই ফোন দিয়েন। আমি আপনাকে বলছি কী কী কিনতে হবে। পটাশ কিনবেন ছয় প্যাকেট আর মিষ্টি কিনবেন এক প্যাকেট। সাদা মিষ্টি। বেশি টাকা খরচও হবে না। আপনি কিনে এনে আমাকে কল দিবেন। আমি ফোনেই আপনাকে বলে দিব কী করতে হবে। এরমধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়বেন। নামাজ বাদ দেয়া যাবে না।
প্রশ্ন: জি, আচ্ছা। আপনাকে ফোন দিব।
আলম: ঠিক আছে, মা। যা যা বলছি, তা কিনে ফোন দিবেন। আমি সব সমস্যা সমাধান করে দিব একদিনেই ইনশাআল্লাহ। তবে খবরদার কাজ আদায় হওয়ার আগপর্যন্ত কাউকে জানাবেনা না। মা-বাবা কাউকে না। এতে কাজের চেয়ে ক্ষতি হবে বেশি। আপনি ভরসা রাখেন। আমরা আল্লাহর নামে কাজ করে দিব।
কবিরাজ-তান্ত্রিক সেজে একেকসময় একেক রূপে এভাবেই প্রথমে বিশ্বাস অর্জনের চেষ্টা করে তারা। ধীরে ধীরে তাদের উদ্দেশ্যের দিকে আগায়। কেউ স্বামী, কেউ প্রেমিককে কাছে টানতে, কেউ ফর্সা হতে, কেউ টাকাপয়সা পাওয়ার লোভে এমন পটাশ-চিনি দিয়ে হাত পুড়িয়ে ফেলছে। যারা বুঝতে পারে, তারা হয়তো দ্রুতই বেরিয়ে এসে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছে। আর যারা বোঝে না, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবার পরেও টাকা দিয়ে যায় ভালো হবার আশায়। আর এভাবেই সমস্যা সমাধানের শর্টকাট আশা দেখিয়ে এক শ্রেনীর লোক হাতিয়ে নিচ্ছে টাকাপয়সা। সেইসাথে নষ্ট করে দিচ্ছে ভুক্তভোগীর হাত।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা