Image description
বাহিনীর প্রধানরা অধরা

চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের ‘অভয়ারণ্য’ হিসাবে পরিচিত জঙ্গল সলিমপুরে আতঙ্ক কাটেনি। রাত নামলেই বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ভর করে। প্রশাসনের নজরদারির মধ্যেও গত সপ্তাহে পুলিশ ও র‌্যাবের দুটি নির্মাণাধীন ক্যাম্প তছনছ করার পর থেকে এমন ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কুখ্যাত সন্ত্রাসী ইয়াসিন বাহিনী ও রোকন মেম্বারের ত্রাসের কারণে সাধারণ মানুষ তটস্থ। এ দুই বাহিনী পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। নানা অপকর্মে জড়িত তারা। সাধারণ মানুষও তাদের কাছে অনেকটা জিম্মি। তাদের হয়ে আরও একাধিক উপবাহিনীর বিচরণ রয়েছে এলাকায়।

সর্বশেষ ২৪ মে দুইশ থেকে তিনশ সন্ত্রাসী গভীর রাতে রাস্তা কেটে ফেলে এবং নির্মাণাধীন র‌্যাব ও যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এ সময় র‌্যাবের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের রাতভর গুলিবিনিময় হয়। প্রশাসন ১০৪ রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এ ঘটনায় ইয়াসিনকে প্রধান আসামি করে ৩ শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করে সীতাকুণ্ড থানা পুলিশ। তবে এখনো ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিন অধরা। রোকন মেম্বারের টিকিটিও স্পর্শ করতে পারেনি পুলিশ।

পুলিশ ও র‌্যাবের ক্যাম্পে হামলার পর থেকে র‌্যাব, পুলিশ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) এবং বিজিবির নজরদারি বাড়ানো হয়। বসানো হয় চেকপোস্ট। এলাকাটি আপাতত শান্ত রয়েছে। রোববার স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে যান। তিনি বলেছেন, সন্ত্রাসীদের শেষ আশ্রয়স্থলটিও নির্মূল করা হবে। অবৈধভাবে যারা বসতি স্থাপন করেছেন, তাদেরও আশ্বস্ত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বলেছেন, পুনর্বাসনের আগে কোনো উচ্ছেদ হবে না। জঙ্গল সলিমপুর এলাকা ঘিরে কারাগার স্থাপন, প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশনসহ সরকারি বিভন্ন ইনস্টিটিউশন স্থাপনের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানান তিনি। এর আগে ৯ মার্চ হেলিকপ্টার, ড্রোন, সাঁজোয়া যান নিয়ে সেনা, পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি সদস্যদের সমন্বয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তিন হাজারেরও বেশি সদস্য জঙ্গল সলিমপুরে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় অভিযান চালান। সেই অভিযানে এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী ইয়াসিন, রোকনসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যান।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ২০২২ সাল থেকে জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ এলাকার খাসজমিতে কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর, স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ, ক্রিকেট স্টেডিয়াম নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। এজন্য বিভিন্ন সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে অভিযানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সন্ত্রাসীদের ভয়ে অভিযান পরিচালনা করা যায়নি। কোনো কোনো সময় অভিযানে গিয়ে উলটো সন্ত্রাসী এবং দখলদারদের মার খেয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সন্ত্রাসী ধরতে গিয়ে হামলায় এক র‌্যাব কর্মকর্তা নিহত হন। গুরুতর আহত হন আরও তিনজন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে বড় অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী ২৫ মে অভিযান পরিচালনা করে সন্ত্রাসীদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করা হয়।

সূত্র জানায়, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর জালালাবাদ মৌজার বিপুল পরিমাণ সরকারি খাস জায়গা দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় দুই দশকে এখানে পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে অন্তত ৩০ হাজার মানুষের অবৈধ বসতি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকাটিতে একাধিক খুনের ঘটনা ঘটে। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে দখল-বেদখলকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সর্বশেষ এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রধানত ইয়াসিন ও রোকন বাহিনীর হাতে। দুজনই বিএনপির নাম ব্যবহার করে দখল বাণিজ্য পরিচালনা করছিলেন বলে অভিযোগ আছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আয়ের বড় উৎস চাঁদাবাজি এবং সরকারি খাসজমি প্লট করে বিক্রি করা। ছোটখাটো পাহাড় ও টিলা কেটে গড়ে তোলা ২ থেকে ৪ কাঠার প্রতিটি প্লট ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়। কাগজপত্রবিহীন কেবল দখলস্বত্ব বিক্রি করে দিনমজুর ও নিুবিত্ত মানুষের কাছ থেকে এই টাকা আদায় করা হয়। এছাড়া এখানকার অবৈধ বসতিতে অবৈধভাবে দেওয়া বিদ্যুৎ বিলের বিপরীতে ইয়াসিন বাহিনীর পকেটে যায় লাখ লাখ টাকা। সীতাকুণ্ড উপজেলার আওতাধীন হলেও জায়গাটি ভৌগোলিকভাবে চট্টগ্রাম মহানগরীর খুব কাছে। কুমিল্লা, নোয়াখালী, সন্দ্বীপসহ বাইরের জেলা থেকে আসা খেটে খাওয়া পরিবারের লোকজন এলাকাটিকে বেছে নেয় বসবাসের জন্য। কম টাকায় প্লট কিনে কিংবা কম ভাড়ায় শহরের কাছাকাছি থাকার এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না কেউ। আর সন্ত্রাসী এবং দখলদাররাও সুযোগটি কাজে লাগায়।

বিভিন্ন সময়ে অভিযান : ২০২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে অস্ত্র, গোলাবারুদসহ পাঁচজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৭। ওইদিন শীর্ষ সন্ত্রাসী শিবলুর নেতৃত্বে একদল সন্ত্রাসী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে র‌্যাবের ওপর আক্রমণ করে আসামিদের ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। আত্মরক্ষার্থে র‌্যাবও পালটা গুলি চালায়। এ সময় র‌্যাবের কয়েকজন সদস্য আহত হন। পরে র‌্যাব এলাকাটি ঘিরে ব্যাপক ফোর্স নিয়ে অভিযান চালায়। এ সময় সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে ১০টি দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র, ১টি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, ১টি ধারালো ছোরা এবং ২২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। সন্ত্রাসীদের আস্তানা থেকে মিলিটারি গেজেট, মিলিটারি পোশাক, মিলিটারি বাইনোকোলার ও অবৈধ ধাতব মুদ্রা উদ্ধার করা হয়। শিবলু আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ক্যাডার হিসাবে পরিচিত।

৫ আগস্টের পর শিবুল গা ঢাকা দিলে দৃশ্যপটে আসে বিএনপি নামধারী রোকন ও গফুর। গত বছরের ২৯ আগস্ট সেখানে একটি অস্ত্রের কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী ও পুলিশের যৌথ বাহিনী। এতে চার সন্ত্রাসী গ্রেফতার হয়। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় ছয়টি দেশি আগ্নেয়াস্ত্র, খালি কার্তুজে ৩৫ রাউন্ড, তাজা কার্তুজ পাঁচ রাউন্ড, চায়নিজ কুড়াল একটি, ২০টি রামদা, ওয়াকিটকি চার্জারসহ দুটি, মেগাফোন একটি, প্যারাশুট ফ্লেয়ার চারটি এবং অন্য অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামাদি।

একাধিক খুনের ঘটনা : ২০২৫ সালের ৫ অক্টোবর স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ ইয়াসিন বাহিনীর সঙ্গে রোকন-গফুর বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। এ সময় রোকন গ্রুপের সদস্য খলিলুর রহমান কানুকে পিটিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষের লোকজন। আহত হন অন্তত ২০ জন। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন রোকন গ্রুপের সদস্য রিপনসহ কয়েকজন। এ নিয়ে ১৪ মাসে জঙ্গল সলিমপুরে চারটি খুনের ঘটনা ঘটল। নিহত কানু হবিগঞ্জের মাধবপুরের অলি রহমানের ছেলে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা রোববার সীতাকুণ্ড থানায় মামলা করেছেন।

২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি এলাকাটিতে মো. মীর আরমান হোসেন রানা নামের শ্রমিক দলের এক নেতাকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এর আগে আরও দুজনকে কুপিয়ে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এরও আগে জঙ্গল সলিমপুরের নিয়ন্ত্রণ ছিল আক্কাছ নামে এক ব্যক্তির হাতে। র‌্যাবের ক্রসফায়ারে তিনি নিহত হন।