Image description

বছরের পাঁচ মাস পার হয়েছে। কিন্তু এখনো ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ের দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।অথচ দরপত্র আহ্বান থেকে প্রেসে কাজ শুরু হওয়া একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।পুরো প্রক্রিয়াটিতে কমপক্ষে চার মাস প্রয়োজন হয়। এরপর বছরের তিন মাসেরও কম সময় অবশিষ্ট থাকবে। ফলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সব বই ছাপার কাজ শেষ করে তা স্কুলে পৌঁছানো নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

তবে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২৯ নভেম্বরের মধ্যে বই ছাপার কাজ শেষ করতে চায়। কিন্তু তারা যেভাবে রোডম্যাপ করেছে সে অনুযায়ী কাজ শেষ করা কঠিন বলে জানিয়েছেন মুদ্রণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সূত্র জানায়, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার জন্য ২০২৫ সালের মে মাসের শেষদিকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সেই বইয়ের কাজ চলতি বছরের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছিল।

ফলে এখন যদি জুনে দরপত্র শুরু হয় তাহলে তা ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বড় চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। 

এনসিটিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দরপত্র আহ্বানের জন্য প্রস্তুত রয়েছি। আশা করছি, চলতি সপ্তাহেই প্রাক-প্রাথমিকের দরপত্র আহ্বান করা হবে। এরপর প্রাথমিকের সঙ্গে ইবতেদায়ির দরপত্র আহ্বান করা হবে। সবশেষে মাধ্যমিক স্তর।তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করলে আগামী আগস্ট মাস থেকেই ছাপা শুরু করতে পারব। হাতে যথেষ্ট সময় আছে। আমরা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে পারব। এ বছরও কাগজ ও ছাপার মানের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেব না। এ জন্য সবার সহযোগিতা চাই।’

এনসিটিবির রোডম্যাপে বলা হয়েছে, পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা সংগ্রহ, দরপত্র দলিল প্রস্তুতকরণ, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন ও অনুমোদন শেষে লট বিভাজন ও দরপত্র আহ্বান করা হবে আগামী ৭ জুন। আর দরপত্র দাখিলে ১৫ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। ফলে দরপত্র উন্মুক্ত করা হবে ২৮ জুন। দরপত্র মূল্যায়ন শেষ হবে ২৮ জুলাই। এরপর দরপত্র অনুমোদনের জন্য আরো এক মাস সময় রাখা হয়েছে। কারণ এই দরপত্র মন্ত্রিসভাসংক্রান্ত ক্রয় কমিটি থেকে অনুমোদন হতে হয়। দরপত্র অনুমোদন শেষ হবে ২৭ আগস্ট। এরপর মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে অর্থাৎ ৩০ আগস্টের মধ্যে কার্যাদেশ জারি করা হবে।

তবে কার্যাদেশ জারি হলেই ছাপা শুরু হয় না। এরপর মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির জন্য সময় রাখা হয়েছে ২১ দিন, যা ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। এরপর প্রেসগুলোতে ছাপা শুরু হবে। পাঠ্যবই মুদ্রণ ও সরবরাহের জন্য ৭০ দিন সময় রেখেছে এনসিটিবি। সে হিসাবে আগামী ২৯ নভেম্বরের মধ্যে পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

এনসিটিবি সূত্র জানায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপা হবে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের জন্য ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০ কপি, প্রাথমিক স্তরের জন্য সাত কোটি ৯৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কপি এবং মাধ্যমিক স্তরের জন্য ২২ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার ৯২৩ কপি বই ছাপা হবে।

মুদ্রণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই রোডম্যাপে বেশ কয়েকটি সমস্যা দেখছেন। তাঁরা বলছেন, দরপত্র যদি ৭ জুন আহ্বান করা হয়, তাহলে নিশ্চয়ই প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সব বইয়ের দরপর একসঙ্গে আহ্বান করা হবে না। এখন শুরুতে যদি প্রাক-প্রাথমিকের দরপত্র হয়, নবম শ্রেণি পর্যন্ত দরপত্র আহ্বান করতে অন্তত আরো ১৫ দিন থেকে এক মাস সময় লাগবে। তাহলে শুরুতেই রোডম্যাপ থেকে কিছুটা পিছিয়ে যেতে হবে। আর সব বইয়ের দরপত্র যদি একসঙ্গে আহ্বান করা হয় তাহলে সব কার্যাদেশও কাছাকাছি সময়ে দিতে হবে, এতে মাত্র ৭০ দিনে মুদ্রণকারীদের পক্ষে সব বইয়ের কাজ শেষ করা সম্ভব নয়।

প্রেস মালিকরা আরো বলছেন, গত বছর মোট ১০৬টি প্রেস কাজ করলেও আট-দশটি প্রেসের হাতেই বেশির ভাগ কাজ ছিল। এসব প্রেসের কয়েকটির যথেষ্ট সক্ষমতা রয়েছে, যারা ৭০ দিনে কাজ তুলে দিতে সক্ষম। আবার কয়েকটি আছে যাদের পক্ষে ৭০ কেন ১০০ দিনেও কাজ তোলা কষ্টকর। সবচেয়ে বড় জটিলতায় পড়তে হবে যদি কোনো লটে পুনঃদরপত্রে যেতে হয়। কারণ এতে আরো এক-দেড় মাস অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হবে।

এ ছাড়া এ বছর পাঠ্যবই পরিমার্জন করা হচ্ছে। এই পরিমার্জন শেষ করে পাণ্ডুলিপি চূড়ান্ত করতে কম হলেও দুই-তিন মাস বা এর বেশি সময়ের প্রয়োজন। ফলে দ্রুত দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করে আগস্ট মাস থেকে ছাপার কাজ শুরু করাটাও কঠিন।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রেস মালিকরা পর্যায়ক্রমেই তাঁদের কাজ করতে পারবেন। প্রথমে তাঁরা প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও ইবতেদায়ির কাজ করবেন। এরপর মাধ্যমিক স্তরের কাজ শুরু হবে। আর এ বছর পুনঃদরপত্র আহ্বানের সুযোগও খুব কম। ফলে আমরা নির্দিষ্ট সময়েই কাজ শেষ করতে পারব।’

পাঠ্যবই কমেছে ৯৯ লাখ, সাশ্রয় শতকোটি টাকা : গত এপ্রিলের শুরুতে এনসিটিবিতে সব উপজেলা থেকে বইয়ের চাহিদা পাঠানো হয়। তাতে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তর ও ইবতেদায়ির জন্য ২৩ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১১ কপি পাঠ্যবই দরকার। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠানো এ বইয়ের সংখ্যা আগের শিক্ষাবর্ষের (২০২৬) চেয়ে প্রায় এক কোটি বেশি। ফলে এ পাঠ্যবইয়ের চাহিদা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় এনসিটিবি। ফলে শিক্ষা কর্মকর্তাদের পাঠানো চাহিদা যাচাইয়ে কয়েকটি জেলা-উপজেলায় পরিদর্শনে যান এনসিটিবির কর্মকর্তারা। তাতেই ধরা পড়ে পাঠ্যবইয়ের ভূতুড়ে চাহিদা। অতিরিক্ত পাঠ্যবইয়ের চাহিদা দেওয়া সিন্ডিকেটে কিছু মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা, কিছু শিক্ষক এবং ছাপাখানা-সংশ্লিষ্ট একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জড়িত। প্রায় ৯৯ লাখ বইয়ের কোনো প্রয়োজন নেই বলে এনসিটিবির যাচাইয়ে উঠে আসে। এতে সরকারের প্রায় শতকোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলে জানা গেছে।