আকাশপ্রেমীদের জন্য রোববার (৩১ মে) অপেক্ষা করছে বিরল এক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ রাতের আকাশে দেখতে পাবেন ‘ব্লু মাইক্রোমুন’। যেখানে একই সঙ্গে ঘটছে দুটি বিরল চন্দ্রঘটনা, ‘ব্লু মুন’ ও ‘মাইক্রো মুন’।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, একই ইংরেজি ক্যালেন্ডার মাসে দুটি পূর্ণিমা সংঘটিত হলে দ্বিতীয় পূর্ণিমাকে ‘ব্লু মুন’ বলা হয়। এ বছরের মে মাসের প্রথম পূর্ণিমা হয়েছিল ১ মে, যা ‘ফ্লাওয়ার মুন’ নামে পরিচিত। প্রায় ২৯ দশমিক ৫ দিন পর ৩১ মে আবার পূর্ণিমা হওয়ায় মাসটির দ্বিতীয় পূর্ণিমা ‘ব্লু মুন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তবে নামের সঙ্গে ‘ব্লু’ বা নীল শব্দ থাকলেও চাঁদ নীল রঙের হবে না। এটি স্বাভাবিক পূর্ণিমার মতোই সাদা, রুপালি কিংবা দিগন্তের কাছে থাকলে কিছুটা সোনালি-কমলা আভায় দেখা যাবে।
কেন বিশেষ এবারের ব্লু মুন?
এবারের পূর্ণিমার বিশেষত্ব হলো, এটি একই সঙ্গে একটি ‘মাইক্রো মুন’। চাঁদ যখন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরের অবস্থান বা ‘অ্যাপোজি’র কাছাকাছি থেকে পূর্ণিমা পর্যায়ে পৌঁছে, তখন তাকে মাইক্রো মুন বলা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, ৩১ মে আন্তর্জাতিক সময় রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে পূর্ণিমা পূর্ণতা পাবে। সে সময় চাঁদ পৃথিবী থেকে প্রায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৩৪ মাইল বা ৪ লাখ ৬ হাজার ৯৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করবে, যা ২০২৬ সালের পূর্ণিমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূরত্ব।
পৃথিবী থেকে দূরে থাকায় চাঁদ স্বাভাবিক পূর্ণিমার তুলনায় প্রায় ৬ থেকে ১০ শতাংশ ছোট এবং প্রায় ১০ শতাংশ কম উজ্জ্বল দেখাতে পারে। তবে খালি চোখে সাধারণ দর্শকের জন্য এই পার্থক্য খুব বেশি স্পষ্ট নাও হতে পারে।
কেন ঘটে ব্লু মুন?
চাঁদের একটি পূর্ণ চক্র সম্পন্ন হতে প্রায় ২৯ দশমিক ৫ দিন সময় লাগে। অন্যদিকে ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে এই চক্র পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে বছরে চাঁদের ১২টি চক্র একটি সৌর বছরের তুলনায় প্রায় ১১ দিন কম হয়। এই সময়গত পার্থক্যের কারণে মাঝে মধ্যে কোনো মাসে দুটি পূর্ণিমা দেখা যায় এবং কয়েক বছরে অতিরিক্ত একটি পূর্ণিমা যুক্ত হয়।
এ কারণেই ২০২৬ সালে সাধারণ ১২টির পরিবর্তে মোট ১৩টি পূর্ণিমা দেখা যাবে।
নীল চাঁদের নামের পেছনের গল্প
‘ব্লু মুন’ নামটি অনেক পুরোনো একটি ইংরেজি প্রবাদ থেকে এসেছে। ১৫০০ শতকের দিকে ‘Once in a Blue Moon’ কথাটি অত্যন্ত বিরল বা প্রায় অসম্ভব কোনো ঘটনা বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীতে একই মাসের দ্বিতীয় পূর্ণিমার সঙ্গে এই নামটি যুক্ত হয়।
তবে ইতিহাসে একবার সত্যিকার অর্থেই নীলাভ চাঁদ দেখা গিয়েছিল। ১৮৮৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের পর বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়া ধূলিকণার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মানুষ সাময়িকভাবে নীলাভ চাঁদ দেখতে পেয়েছিল।
বাংলাদেশ থেকে কীভাবে দেখা যাবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মহাজাগতিক ঘটনা উপভোগ করতে কোনো টেলিস্কোপ বা বিশেষ যন্ত্রের প্রয়োজন নেই। খালি চোখেই নিরাপদে দেখা যাবে ব্লু মাইক্রোমুন।
সূর্যাস্তের পর পূর্ব আকাশে চাঁদ উঠতে শুরু করলে সেটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় দেখাবে। তখন বায়ুমণ্ডলের প্রভাবে চাঁদে কমলা বা সোনালি আভা দেখা যেতে পারে। রাতের প্রথম ভাগ পর্যন্ত আকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে ভালো সময়।
দুরবিন ব্যবহার করলে চাঁদের পৃষ্ঠের বিভিন্ন গর্ত, উঁচু-নিচু অঞ্চল ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। আলোকচিত্রপ্রেমীদের জন্যও এটি হতে পারে বিশেষ সুযোগ।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, ব্লু মুন সাধারণত প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর একবার দেখা যায়। তবে ব্লু মুন ও মাইক্রোমুন একসঙ্গে ঘটার ঘটনা আরও বিরল।
সর্বশেষ ২০২৩ সালে ব্লু মুন দেখা গিয়েছিল। আজকের এই ঘটনার পর আবার ব্লু মুন দেখতে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।