Image description

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক-শিল্প কৌশলে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের আভাস মিলছে। ইরানের তৈরি ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনের আদলে নিজস্ব প্রযুক্তিতে দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন দেশীয়ভাবে উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব।

২৫ মে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সেমাফোরএক প্রতিবেদনে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ভেক্টর ডিফেন্স এবং সৌদি আরবের স্টার্টআপ এসআর২ ডিফেন্স সিস্টেমস-এর যৌথ উদ্যোগে রিয়াদের কাছে একটি ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে ‘স্কাইওয়াস্প’ নামের একটি আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করা হবে, যা মূলত ইরানের শাহেদ ড্রোনের আদলে ডিজাইন করা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ড্রোনের পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার (৯০০ মাইলের বেশি), যা মূলত উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করে ডিজাইন করা হয়েছে। উত্তর-পূর্ব সৌদি আরব থেকে তেহরানের দূরত্বও প্রায় একই রকম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক স্থাপনা, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোনের হামলার মুখোমুখি হচ্ছে। যদিও বেশিরভাগ হামলাই প্রতিহত করা হয়েছে, তবে এই সংঘাত তুলনামূলকভাবে সস্তা ড্রোনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহারের অর্থনৈতিক ও কার্যক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে।

সৌদি আরবের এই প্রকল্পের উত্থান আধুনিক যুদ্ধ কৌশলের এক ব্যাপক পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটিকে শুরুতে ইরানের একটি ভিন্নধর্মী অস্ত্র হিসেবে দেখা হলেও, এটি এখন বিশ্বব্যাপী একটি কার্যকর সামরিক মডেল হয়ে উঠেছে, যা শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে সব দেশের সামরিক চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করছে। অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল যুদ্ধাস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে, রাষ্ট্রগুলো এখন কম খরচের এমন অস্ত্রে বিনিয়োগ করছে যা বিপুল সংখ্যায় তৈরি করা সম্ভব, প্রতিরক্ষাব্যুহকে ব্যাহত করতে পারে এবং দীর্ঘ মেয়াদে চাপ বজায় রাখতে সক্ষম।

 

সৌদি আরব এখন আর কেবল পশ্চিমা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমদানির ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না; বরং তারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে দেশীয়ভাবে তৈরি ও বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনক্ষম আক্রমণাত্মক ড্রোন সক্ষমতা গড়ে তুলতে চাইছে।

সেমাফোরের প্রতিবেদন থেকে এই প্রকল্পের কৌশলগত যৌক্তিকতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যায়। এসআর২ভেক্টর-এর কর্মকর্তাদের মতে, স্কাইওয়াস্প ড্রোনের মূল লক্ষ্য হলো কৌশলগত প্রতিরোধ চাহিদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং কার্যকর পরিমাণে ড্রোন সরবরাহ করা। এই শব্দচয়ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এতে প্রযুক্তিগত আভিজাত্যের চেয়ে ড্রোনের বাণিজ্যিক উৎপাদন সক্ষমতা এবং সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

এসআর২ভেক্টর এই ড্রোনের বহনক্ষমতা বা উৎপাদনের সময়সীমা প্রকাশ না করলেও, কেবল এর পাল্লাই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত অর্থবহ। এর মাধ্যমে সৌদি আরব ইরানের ভূখণ্ডের গভীরে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করবে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক সিইপিএ-এর নন-রেসিডেন্ট ফেলো ফেদেরিকো বোরসারি বলেন, এই ড্রোনটি সৌদি আরবের দূরপাল্লার হামলা সক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে দেবে।

এই প্রকল্পটি সৌদি আরবের ‘ভিশন ২০৩০’-এর অধীনে তাদের প্রতিরক্ষা-শিল্পের বড় পরিবর্তনের অংশ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্র আমদানিকারক দেশ সৌদি আরব এই দশকের শেষ নাগাদ তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয়ের ৫০ শতাংশ স্থানীয়করণের অঙ্গীকার করেছে। এতদিন পর্যন্ত এই প্রচেষ্টার সিংহভাগই ছিল পশ্চিমা যুদ্ধবিমান এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ, সংযোজন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ।

সূত্র: আল-মনিটর