গ্রীষ্মকাল এলেই রাজশাহীর বাজার ও বাগানজুড়ে দেখা মেলে সুস্বাদু ও রসালো লিচুর। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজশাহীর লিচুর আলাদা সুনাম থাকলেও বর্তমানে বাজারে অপরিপক্ব, কৃত্রিম রং করা এবং পোকামাকড় আক্রান্ত লিচু বিক্রির অভিযোগও বাড়ছে। ফলে বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে লিচু কিনতে গিয়ে অনেক ক্রেতাই প্রতারিত হচ্ছেন। কোথাও দেখা যাচ্ছে বাইরে টাটকা, কিন্তু ভেতরে পচা কিংবা পোকার আক্রমণে নষ্ট ফল।
রাজশাহীর বিভিন্ন লিচুবাগান ও স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মৌসুমের শুরুতেই বিভিন্ন জাতের লিচু বাজারে উঠতে শুরু করেছে। তবে দ্রুত বেশি লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অপরিপক্ব লিচুতেও কৃত্রিম রং ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্রেতারা সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
স্থানীয় বাগান মালিক মনির হোসেন জানান, ভালো লিচু চেনার জন্য কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। তার ভাষায়, স্বাভাবিক গোলাপি বা হালকা লাল রঙের লিচুই সাধারণত ভালো ও পাকা হয়। একেবারে সবুজ লিচু কাঁচা থাকার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া হাতে নিয়ে চাপ দিলে পাকা লিচু সামান্য নরম অনুভূত হবে, তবে অতিরিক্ত নরম হলে বুঝতে হবে সেটি নষ্ট হতে শুরু করেছে।
তিনি আরও বলেন, ভালো লিচু থেকে মিষ্টি সুবাস পাওয়া যায়। টক বা তীব্র গন্ধ থাকলে সেটি নিম্নমানের বা অপরিপক্ব হতে পারে। বড় ও পরিপুষ্ট লিচু সাধারণত বেশি রসালো ও মিষ্টি হয়।
পোকামাকড় আক্রান্ত লিচু শনাক্তের উপায়
রাজশাহীর কয়েকটি বাগানে সরেজমিনে দেখা গেছে, কিছু গাছে ইতোমধ্যে পোকার আক্রমণের লক্ষণ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আর্দ্রতা বৃদ্ধি ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
তাদের মতে, আক্রান্ত লিচুর খোসায় ছোট ছিদ্র, কালচে দাগ কিংবা অস্বাভাবিক শুকনো ভাব দেখা যায়। অনেক সময় ডাঁটার গোড়ায় বাদামি রঙের দাগ বা পচনের চিহ্নও থাকে, যা পোকার আক্রমণের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, লিচু কেনার সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা উচিত:
খোসায় ছোট ছিদ্র বা কালো দাগ আছে কিনা পরীক্ষা করুন, ডাঁটার গোড়ায় পচন বা বাদামি দাগ থাকলে সতর্ক থাকুন, অতিরিক্ত শুকনো বা অস্বাভাবিক হালকা লিচু এড়িয়ে চলুন, ফাটলধরা বা কুঁচকে যাওয়া লিচু না কেনাই ভালো, গুচ্ছ থেকে কয়েকটি লিচু খুলে ভেতরের অবস্থা দেখে নেওয়া নিরাপদ।
পরিচর্যায় বাড়ছে লিচুর গুণগত মান
রাজশাহীর একাধিক বাগান মালিক জানান, নিয়মিত পরিচর্যা ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উন্নত মানের লিচু উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। আমাদের বাগানের লিচুগুলো নিয়মিত ও বিজ্ঞানসম্মত পরিচর্যার মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়েছে। সময়মতো প্রয়োজনীয় স্প্রে ও পরিচর্যা কার্যক্রম পরিচালনা করায় ফলের গুণগত মান ভালো হয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী পরিচর্যা না করলে পোকামাকড়ের আক্রমণে ফল ঝরে পড়ে এবং ফলের গায়ে দাগ বা পচন দেখা দেয়।
তারা আরও জানান, সঠিক পরিচর্যার কারণে তাদের বাগানের লিচু রোগবালাই মুক্ত, দেখতে আকর্ষণীয় এবং স্বাদেও বেশ মিষ্টি হয়েছে। এতে ভোক্তারাও সন্তুষ্ট হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।
সচেতনতাই নিরাপদ ফল বেছে নেওয়ার উপায়
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিচিত ও বিশ্বস্ত বিক্রেতার কাছ থেকে লিচু কেনাই সবচেয়ে নিরাপদ। কেনার আগে ফলের রং, গন্ধ, খোসা ও ডাঁটার অবস্থা ভালোভাবে পরীক্ষা করা উচিত। অতিরিক্ত রং করা বা অপরিপক্ব লিচু স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
সচেতনভাবে লিচু নির্বাচন করলে যেমন সুস্বাদু ফলের স্বাদ উপভোগ করা যাবে, তেমনি পোকামাকড় আক্রান্ত বা রাসায়নিকযুক্ত ফল থেকে স্বাস্থ্যঝুঁকিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে। রাজশাহীর বিখ্যাত লিচুর সুনাম ধরে রাখতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ক্রেতা সবার সচেতনতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।