রাজধানীর আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক ওয়ার্ডে মারা যাওয়া ছয় নবজাতকের সবাই সুস্থ ছিল। দুর্ঘটনাজনিত কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ। তাদের ভাষ্য, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা ছয় নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাদের এনআইসিইউতে নেওয়া হয়।
সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে শিশুগুলোর মৃত্যু হয় বলে দাবি কর্তৃপক্ষে। তবে স্বজনরা অভিযোগ করছেন, রাতে ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত চিকিৎসাকর্মী ছিলেন না। প্রয়োজনের তুলনায় এসিও কম ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে তাদের অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ জন্য কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকে দায়ী করেন তারা।
মঙ্গলবার (২৬ মে) মধ্যরাতের পর একে একে শিশুগুলো মারা যায়। এ বিষয়ে বুধবার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের মহাপরিচালক (হসপিটালস অ্যান্ড নার্সিং) অধ্যাপক ডা. নাহিদা ইয়াসমিন বলেন, যে ওয়ার্ডের এ ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ১১ জন মা ও ছয় শিশু ছিল। তাদের বয়স এক থেকে দুই দিন। সিজারের পর নিয়মিতভাবে ওয়ার্ডটি মা ও নবজাতকদের রাখা হয়।
তিনি বলেন, ওয়ার্ডটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় অনেক রোগী বা স্বজন অতিরিক্ত ঠাণ্ডার অভিযোগে এসি বন্ধ রাখতে বলেন। রাত ৩টার পর দুটি শিশু অসুস্থ বোধ করলে তাদের নিউ নেটাল আইসিইউতে নেয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, শিশুরা ভালো আছে।এরপর তাদের ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, ভোর ৬টার পর নার্স ও মায়েরা দেখতে পান, শিশুদের অবস্থা আবার খারাপ হচ্ছে। এরপর ছয় নবজাতককেই নিউ নেটাল আইসিইউতে নেয়া হয়েছিল। সেখানে দুই শিশুকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। বাকি চারজনকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রাখা হলেও তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্বজনরা বলছেন, মধ্যরাতে হঠাৎ করেই শিশুগুলো কান্না ও চিৎকার শুরু করে। এরপর অনেকের বমি হয়। ভেতরে এসি বন্ধ ছিল। গরমে সবাই আরও কষ্ট পাচ্ছিল। এসির গ্যাসে এক শিশুর স্বজনও অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। ভেতরে অনেক রোগী থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় এসি কম বলে তারা অভিযোগ করেন।
তাদের ভাষ্য, প্রায় সব শিশুর শারীরিক অবস্থা ভালো ছিল। আগের রাতেও তাদের কোলে নিয়েছেন। মায়ের দুই পান করিয়েছেন। ভোর হওয়ার আগেই সবাই একে একে মারা যায়। তাদের দাবি, ভেতরে অন্তত ১৫ শিশু ছিল। এরমধ্যে কয়েকজনকে বাঁচানো গেছে।
যদিও পুলিশ বলছে, তারা প্রাথমিকভাবে ৬ শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এরপর বিস্তারিত বলা যাবে। ঘটনাস্থলে ক্রাইম সিন ইউনিটসহ গোয়েন্দারাও আছেন।
আরও পড়ুন:
সরেজমিনে গিয়ে কয়েকজন স্বজনকে মৃত শিশু কোলে নিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। কয়েকজন তাদের অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে বাইরে বসে ছিলেন। ঘটনাস্থলে থানা পুলিশসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন। বুধবার (২৭ মে) সকালে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বিষয়টি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
মারা যাওয়া এক শিশুর চাচা বলেন, ‘রাতেও আমরা বাচ্চাটিকে কোলে নিয়েছি, মা দুধ পান করিয়েছে। রাত ১২টার দিকে চিল্লাচিল্লি শুরু হয়, নার্সরা দৌঁড়াদৌড়ি শুরু করে। কোন বাচ্চার স্বজন সারা রাত ঘুমাতে পারেনি। সকাল হতে হতে শিশুগুলো প্রাণ হারিয়েছে।
আরেক স্বজনের ভাষ্য, তাদের বাচ্চার ঈদের দিন সকালে রিলিজ হওয়ার কথা ছিল। সে জন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন তারা। এরইমধ্যে তার মৃত্যুর খবরে হাসপাতালে ছুঁটে আসেন। বাচ্চাটির জন্ম হয় চারদিন আগে বলে জানান তিনি। এক স্বজন দাবি করেন, তাদের ধারণা অন্তত ১১ থেকে ১২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
পুলিশের ডিসি শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা খবর পেয়েছি, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে শিশুদের মৃত্যু আসলে কী কারণ, তা আমরা এখনো জানি না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ছয় শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে তারা নিশ্চিত হয়েছেন।