Image description

নফল রোজার মধ্যে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ একটি হলো আরাফার রোজা। হাদিস শরিফে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তা বিগত এক বছর এবং আগত এক বছরের গোনাহ মিটিয়ে দেবে।’ তাই মুসলিমরা প্রতিবছর আরাফা দিবসে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে রোজাটি রাখার চেষ্টা করেন।

তবে, বাংলাদেশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা এবং আরাফার রোজা পালনের সঠিক সময় নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ মানুষের মাঝে বিভিন্ন মতভেদ দেখা যায়। কেউ মনে করেন, সৌদি আরবে হাজিরা যেদিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করেন সেদিনই রোজা রাখতে হবে; আবার কেউ বলেন নিজ দেশের চাঁদ দেখার তারিখ অনুযায়ী ৯ জিলহজে রোজা পালন করা উচিত। এই অস্পষ্টতা দূর করতে দেশের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি স্কলাররা কোরআন ও হাদিসের আলোকে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন।

 

তাদের মতে, আরাফার রোজার বিধান মূলত তারিখের (৯ জিলহজ) সাথে সম্পৃক্ত, যা নিজ নিজ দেশে চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল। তাই যে দেশে যখন ৯ জিলহজ হবে, তখন রোজাটি রাখতে হবে। ‘আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থানের সময়ের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না।’

 

বাংলাদেশের আকাশে যেদিন চাঁদ দেখা গেছে, সে হিসেব অনুযায়ী আজ (মঙ্গলবার, ২৬ মে) অষ্টম জিলহজ, অতএব এটা কোনোভাবেই আরাফার দিন হতে পারে না

দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম ও জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেক সম্প্রতি তার এক জুমার বয়ানে বলেন, ‘আরাফার দিনের এই রোজার সুন্নত বিধানটি মূলত হাজিদের ছাড়া বাকি সাধারণ মুসলমানদের জন্য। আর এই রোজার সময়কালকে আরাফার ময়দানে হাজিদের অবস্থানের সময়ের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। এই রোজার সম্পর্ক মূলত তারিখের (৯ জিলহজের) সাথে। নিজ নিজ দেশে যখন ৯ জিলহজ, তখনই এই রোজা রাখতে হবে।’

 

জামিয়া কুরআনিয়া আরাবয়া লালবাগ, ঢাকার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী কালবেলাকে বলেন, ‘সমগ্র উম্মাহ এ বিষয়ে একমত যে, আরাফার দিন হলো ৯ জিলহজ। আর ৯ জিলহজ নির্ধারিত হয় চাঁদ দেখার ভিত্তিতে। সুতরাং আরাফার রোজাও চাঁদের হিসাব অনুযায়ী ৯ জিলহজই পালন করতে হবে। বাংলাদেশের আকাশে যেদিন চাঁদ দেখা গেছে, সে হিসেব অনুযায়ী আজ (মঙ্গলবার, ২৬ মে) অষ্টম জিলহজ, অতএব এটা কোনোভাবেই আরাফার দিন হতে পারে না।’

জিলহজ মাসের প্রথম দশকের ইবাদতের গুরুত্ব ও ফজিলত যেহেতু অত্যধিক, সেহেতু কেউ চাইলে পুরো নয় দিনই রোজা রাখতে পারে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘তবে যদি এই রোজা (আরাফার) সরাসরি আরাফায় অবস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতো, তাহলে যারা আরাফায় অবস্থান করছেন তাদের জন্যও এ রোজা সুন্নত হতো। অথচ শরিয়তে হাজিদের জন্য আরাফার দিনে রোজা রাখা সুন্নত নয়। বরং এ রোজার ফজিলত মূলত যারা হাজি নয়, তাদের জন্য বর্ণিত হয়েছে। অতএব, বহু আগে মীমাংসিত একটি বিষয় নিয়ে নতুন করে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা অনভিপ্রেত। যারা এ নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করছে, তারা হয়তো বিষয়টি সম্পর্কে অজ্ঞ, নতুবা এর পেছনে তাদের বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।’

বিষয়টি নিয়ে একই সুরে কথা বলেছেন ইসলামি স্কলার মুফতি রেজাউল করীম আবরার, শামসুদ্দোহা আশরাফি এবং জিয়াউল উলুম মাদ্রাসা, ধামরাই-এর প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদিস মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ।

যদি কেউ বাংলাদেশে ৮ই জিলহজ রোজা রাখেন, তবে কোরবানি বা ঈদের (১০ই জিলহজ) আগে মাঝে একদিনের (৯ই জিলহজ) গ্যাপ পড়ে যায়, যা শরিয়তের নিয়মের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ

মুফতি রেজাউল করীম আবরার কালবেলাকে বলেন, ‘হাদিস অনুযায়ী আরাফার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল দুটি: একটি হলো রোজা রাখা এবং অন্যটি হলো ফজরের নামাজ থেকে তাকবিরে তাশরিক শুরু করা। মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বার বর্ণনা অনুযায়ী হজরত আলী (রা.), ইবনে মাসউদ (রা.) এবং হজরত ওমর (রা.)-সহ অনেক সাহাবি আরাফার দিন সকাল থেকে তাকবিরে তাশরিক পড়তেন। যারা সৌদি আরবের সাথে মিলিয়ে রোজা রাখতে চান, তারা রোজাটি সৌদি আরবের সাথে মিলিয়ে রাখলেও তাকবিরে তাশরিক কিন্তু বাংলাদেশের ৯ই জিলহজ থেকেই শুরু করেন।’

মুফতি আবরার প্রশ্ন তোলেন, ‘একই দিনের দুই আমল কেন দুই দেশের সময় অনুযায়ী করা হবে? শরিয়ত কি নিজের ইচ্ছামতো পালন করার বিষয়?’

তিনি জানান, পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ‘ওয়াতর’ বা বেজোড় দিনের কসম খেয়েছেন। মুসনাদে আহমদের বর্ণনা অনুযায়ী, এই বেজোড় দিন হলো ৯ই জিলহজ বা আরাফার দিন। এখন কেউ যদি সৌদি আরবের সাথে মেলানোর জন্য বাংলাদেশে ৮ই জিলহজ রোজা রাখেন, তবে তিনি মূলত একটি ‘জোড়’ (শাফাউ) দিনে রোজা রাখছেন, যা কোরআনের এই ইঙ্গিতের পরিপন্থি।

আবরারের ভাষ্য, ‘ইসলামি বিধান অনুযায়ী, ইয়াওমে আরাফা বা আরাফার দিনের ঠিক পরের দিনই হলো ইয়াওমুন্নাহার বা কোরবানির দিন। যদি কেউ বাংলাদেশে ৮ই জিলহজ রোজা রাখেন, তবে কোরবানি বা ঈদের (১০ই জিলহজ) আগে মাঝে একদিনের (৯ই জিলহজ) গ্যাপ পড়ে যায়, যা শরিয়তের নিয়মের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।’

রাসুলুল্লাহ (সা.) যেভাবে ইয়াওমে আরাফার রোজার কথা বলেছেন, ঠিক একইভাবে ইয়াওমে আশুরার (১০ই মহররম) রোজার কথাও বলেছেন। মুফতি আবরার যুক্তি দেন যে, ‘আমরা যদি আশুরার রোজা সৌদি আরবের সাথে না মিলিয়ে আমাদের দেশের চাঁদের তারিখ অনুযায়ী ১০ই মহররম পালন করি, তবে আরাফার রোজার ক্ষেত্রে কেন ভিন্ন নিয়ম হবে?’

তার মতে, ‘আরাফার রোজা মূলত ৯ই জিলহজের রোজা। তাই বিভ্রান্তি এড়িয়ে বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ দেখা অনুযায়ী যখন ৯ই জিলহজ হবে (এ বছর বুধবার, ২৭ মে), সেদিনই রোজা রাখা এবং ওইদিন ফজর থেকেই তাকবিরে তাশরিক শুরু করা উচিত।’

মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফি কালবেলাকে বলেন, ‘‘আরাফার রোজা আমরা কবে রাখব, বাংলাদেশি হিসাবে রাখব নাকি মক্কায় হাজিরা যখন আরাফায় অবস্থান করেন তখন রাখব’— এই বিষয়টি পরিষ্কার হতে চাইলে আমাদের সামনে আরাফার দিনের পরিচয় থাকা লাগবে। আর হাদিস অনুযায়ী আরাফার দিনের পরিচয় হলো, যে দিন জিলহজ মাসের নবম দিন, সেই দিন।’’

তিনি বলেন, ‘‘এখন আমরা এই তারিখ নির্ধারণ করব কীভাবে? এ বিষয়ে কোরআনের স্পষ্ট বক্তব্য হলো, যখন তোমরা মাস দেখবে তখন রোজা রাখবে (সুরা বাকারা: ১৮৫)। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন, ‘লোকেরা আপনাকে জিজ্ঞেস করবে নবচন্দ্র সম্পর্কে। আপনি বলুন এই চাঁদ মানুষের জন্য সময় নির্ধারণী এবং হজের সময় নির্ধারণী।’’

মুফতি শামসুদ্দোহা জানান, এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরে ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তায়ালা নবচন্দ্রকে মুসলমানদের জন্য রোজার সময় নির্ধারণী, ইফতারের সময় নির্ধারণী, মহিলাদের ইদ্দত এবং মানুষের ঋণ আদায়ের সময় নির্ধারণী হিসেবে।’

সবশেষ তিনি বলেন, ‘এই ব্যাখ্যা থেকে আমরা পরিষ্কার হয়ে গেলাম যে, আমাদের যেসব ইবাদত চাঁদের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলো আদায়ের ক্ষেত্রে আমাদের মাপকাটি হবে চাঁদ দেখা বা না দেখার ওপর। তাই এ ক্ষেত্রে কোনো শহর বা রাষ্ট্র আমাদের জন্য মাপকাটি নয়। অতএব আয়াতে কারিমা এবং হাদিসের আলোকে স্পষ্ট প্রমাণিত যে, আরাফার রোজা রাখতে হবে আমরা যখন চাঁদ দেখব, তখনকার সময় অনুযায়ী। অর্থাৎ আমাদের দেশে যখন ৯ জিলহজ হবে তখন।’

মুফতি রেজাউল হক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ কালবেলাকে বলেন, ‘ইয়াওমুল আরাফা অর্থাৎ ৯ জুলহিজ্জার রোজা পালন করলে আল্লাহ তাআলা পূর্বাপর দুই বছরের গোনাহ মাফ করে দেবেন মর্মে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তবে, এ রোজা আরাফার ময়দানে অবস্থানরত হাজিরা ব্যতিত সকল মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য।’

এখন বাংলাদেশে ৯ জিলহজ কবে তা চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘চলতি বছর আমাদের বাংলাদেশে ৯ জুলহিজ্জা ২৭ মে বুধবার। তাই কেউ আরাফার রোজা রাখতে চাইলে বুধবারে রাখতে হবে।’

ইসলামি স্কলারদের এই সম্মিলিত ব্যাখ্যা থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে অবস্থানরত মুসলমানদের জন্য বাংলাদেশের আকাশে চাঁদ দেখার ভিত্তিতে নির্ধারিত ৯ জিলহজ তারিখেই আরাফার রোজা পালন করা শরিয়তসম্মত বিধান।