রাজশাহীর বিভিন্ন পশুহাটে নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ জন্য অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতাদের দেওয়া রশিদে আদায় করা টাকার পরিমাণও উল্লেখ করা হচ্ছে না। এতে কোরবানির পশু কিনতে আসা সাধারণ মানুষ আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
রাজশাহীর সিটি হাট থেকে সোমবার (২৫ মে) ৯০ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কেনেন গোলাম মোর্তজা। গরুটি কিনতে তাকে হাসিল দিতে হয়েছে এক হাজার টাকা। ইজারাদারের লোকজন রশিদ দিলেও সেখানে টাকার অঙ্ক লেখা ছিল না। তার অভিযোগ, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে এভাবেই অতিরিক্ত হাসিল আদায় করা হচ্ছে।
গোলাম মোর্তজা বলেন, সব হাটেই অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে। কিন্তু অতিরিক্ত নিলেও তা হাসিলে লেখা থাকে। সিটি হাটে হাসিলে টাকার পরিমাণই লেখা হচ্ছে না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু সিটি হাট নয়, রাজশাহীর অন্যান্য পশুহাটেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটা পশুহাটেও রশিদে টাকার অঙ্ক উল্লেখ না করে অতিরিক্ত হাসিল আদায় করা হচ্ছে। সেখানে গরুর জন্য এক হাজার টাকা এবং ছাগল-ভেড়ার জন্য ৬০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। অথচ নওহাটা পৌর কর্তৃপক্ষ গরুর জন্য ৫০০ টাকা ও ছাগল-ভেড়ার জন্য ৩০০ টাকা হাসিল নির্ধারণ করেছে।
অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সোমবার (২৫ মে) নওহাটা পশুহাটের ইজারাদারকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইবনুল আবেদীন।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন পরিচালিত সিটি হাটে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার গবাদিপশু কেনাবেচা হচ্ছে। করপোরেশন গরু ও মহিষের জন্য ৭০০ টাকা এবং ছাগলের জন্য ৫০০ টাকা হাসিল নির্ধারণ করে দিয়েছে।
কিন্তু বাস্তবে গরুর ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা এবং ছাগলের ক্ষেত্রে ৬০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়টি আড়াল করতেই অনেক রশিদে টাকার পরিমাণ লেখা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে সিটি হাটের ইজারাদারদের একজন শওকত আলী বলেন, সিটি করপোরেশন নির্ধারিত হারের চেয়ে আমরা ১০০ টাকা বেশি নিচ্ছি। হাটে গত দুই দিনে প্রায় ২০০ গাড়ি মাটি ফেলতে হয়েছে। দুই ট্রাক বাঁশ-খুঁটিও পুঁতেছি। করপোরেশন এসব কাজ করেনি। আমরা নিজেরা খরচ করেছি। সেই খরচ তুলতেই কিছু বেশি নেওয়া হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, রশিদে টাকার পরিমাণ লেখা হচ্ছে। কিন্তু কোনও কোনও মহুরি (আদায়কারী) লিখতে ভুলে যাচ্ছে। কার কাছে এটা হচ্ছে জানতে পারলে তাকে কাজেই রাখা হবে না।
সিটি হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বে রয়েছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের সচিব সোহেল রানা। তবে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
অন্যদিকে, নওহাটা পশুহাটের রশিদে টাকার অংক না লেখার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজশাহীর পাখিপ্রেমী হাসনাত রনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এমন একটি রশিদের ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘খাজনা বা হাসিলের রশিদ পাবেন। রশিদে সব কিছু লেখা থাকবে। শুধু কত টাকা আদায় করা হলো সেটা লেখা থাকবে না। এই টাকার ভাগ কোথায় কোথায় যায়? এ দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে বলে আশা করেন?’
নওহাটা পশুহাটের ইজারাদার আফজাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে আকবর আলী নামের এক ব্যক্তি ফোন রিসিভ করেন। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নওহাটা পৌরসভার প্রশাসক ইবনুল আবেদীন বলেন, নওহাটা পশুহাটে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ইজারাদারকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। পবার কোনও হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায় করতে দেওয়া হবে না।
এদিকে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ঝলমলিয়া পশুর হাটে ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত হাসিল ( টোল) আদায় করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে পুঠিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শিবু দাশ।
সোমবার হাট চলাকালীন এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানকালে দায়িত্বরত কর্মকর্তা শিবু দাশ হাটের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখেন এবং হাসিল আদায়ের মূল রশিদ বই পরীক্ষা করেন। একই সঙ্গে হাটে আসা দূর-দূরান্তের পশু ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে কিনা-সে বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
অভিযান শেষে হাট ইজারাদার ও টোল আদায়কারীদের কঠোরভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, সরকারি নির্ধারিত হারের চেয়ে এক টাকাও বেশি হাসিল আদায় করা যাবে না। যদি কোনও ক্রেতার কাছ থেকে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে জরিমানাসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সাধারণ ক্রেতারা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা জানান, নিয়মিত এমন তদারকি থাকলে হাটে এসে সাধারণ মানুষ হয়রানি ও অতিরিক্ত খরচের হাত থেকে রক্ষা পাবে। জনস্বার্থে এই ধরনের অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।